বেড়েই চলেছে খেলাপি ঋণ

|

খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই বেড়েছে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

জুন শেষে অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায়। আর অবলোপনসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগের বছরের জুন পর্যন্ত অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ ছিল ৯০ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

ফলে ১ বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, টাকা না দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে।

এছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলের প্রজ্ঞাপনও আদায়ের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগে খেলাপিরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।

যে কারণে বাড়ছে খেলাপির পরিমাণ। জানা গেছে, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিমালায় আনা হয় পরিবর্তন। কমানো হয় অবলোপনের সময়সীমা। ঋণ পুনঃতফসিলে জারি করা হয় নতুন প্রজ্ঞাপন। মাত্র ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়েই ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয়া হয় খেলাপিদের।

এত সুবিধার পরও না কমে বরং বেড়েই চলেছে খেলাপি ঋণ। জুন শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ কোটিতে। শেষ ৩ মাসেই বেড়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। আর ৬ মাসে বেড়েছে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শতাংশের হিসাবে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়লেও সরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে। এতে শতকরা হিসাবে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কমেছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যা জুনে হয়েছে ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

প্রতিবছর জুন ও ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে যায়। শতকরা হারের পাশাপাশি পরিমাণগত হিসাবেও কমে খেলাপি ঋণ; কিন্তু এবার জুন প্রান্তিকে শতকরা হিসাবে খেলাপি ঋণ কমলেও পরিমাণগত হিসাবে বেড়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এত কারচুপি করার পরও খেলাপি ঋণ কমেনি।

অর্থাৎ খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুনঃতফসিলের নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। তারপরও যখন খেলাপি ঋণ কমেনি, এতে বোঝা যায়, সুযোগ-সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানো যাবে না।

বরং এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে আশকারা পেয়ে খেলাপিরা আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এর মানে খেলাপি ঋণের কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যাপারে যে সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত, সেটা আসলে হচ্ছে না। উল্টো ঋণখেলাপিদের ছাড় দিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।

ঋণ অবলোপনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৩ বছর করা হয়েছে। ঋণ শ্রেণীকরণের সময়সীমায়ও ছাড় দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা করা হয়েছে। আসলে এসব সুবিধা দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

৪ আগস্ট বেসরকারি ৪০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন- জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে আসবে। কিন্তু জুন প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুই-ই বেড়েছে।

মার্চ শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। জুন শেষে এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা বা ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ, মার্চ শেষে যা ছিল ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমে হয়েছে ২ হাজার ৫৭ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ সময়ে বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে তাদের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দিয়েছিলেন, নতুন করে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না। এজন্য তিনি ঋণখেলাপিদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা ও ছাড়ের পথ তৈরি করেন। তারপরও জানুয়ারি থেকে মার্চ- এ ৩ মাসে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায় খেলাপি ঋণ।

মার্চ শেষে প্রথমবার অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ ১ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন বাদে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর বাইরে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে আরও ৪০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এটি যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।

আগের প্রান্তিক মার্চ পর্যন্ত অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ফলে মার্চ থেকে জুন- এ ৩ মাসে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। সে হিসাবে ৬ মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৭ সালের পুরো সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ে পুনঃতফসিলের বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তাতে খুব একটা সাড়া মেলেনি এখনও। উল্টো টাকা আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানান ব্যাংকাররা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সম্প্রতি যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার সবই খেলাপিদের পক্ষে। যে কারণে ঋণ পরিশোধ না করতেই তারা বেশি উৎসাহিত হচ্ছে। তাদের মতে, খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করা ছাড়া খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।

রোববার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ মুহূর্তে খেলাপি ঋণ কমার সুযোগ নেই। কারণ ঋণখেলাপি কমাতে যে এক্সিট প্লান দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হয়নি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর জন্যই এক্সিট প্লান করেছিলাম। এখন সেটি আদালতে বিচারাধীন আছে। আর আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে না। আশা করি, খুব শিগগির এর সুরাহা হবে। আর ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের এক্সিট প্লান কার্যকর হলে একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়বে না আমি বলেছি, একই সঙ্গে আমি একটি এক্সিট প্লানও প্রণয়ন করেছি। কিন্তু সেটি কার্যকর করতে পরিনি। যে কারণে খেলাপি ঋণ কমেনি। আপনি কি মনে করেন এক্সিট প্লান বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণ কমবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, অবশ্য সেটি মনে করি।









Leave a reply