বিউটি অফ ডেভিল (পর্ব ৩)

|

হোসাইন শাহীদ
চোখে ভাসছে কাশ্মীর। সেখান থেকে লাদাখ আরো ৬শ কিলোমিটার। এখনো যে বাংলাদেশেই। যাওয়ার পথে মাগুরায় এক হোটেলে দুপুরের খাবার সেরে বিকালে পৌঁছে গেলাম বেনাপোল। আমারা সবাই প্রথমবারের মতো দেশের বাহিরে যাচ্ছি। ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে তেমন কোন ধারনা নেই। নামার সাথে সাথে দালালদের খপ্পরে। আর যায় কোথায় ভারতে প্রবেশের জন্য আমাদের থেকে দেখি দালালদের তাড়া বেশি। কপাল ভালো পরিচিত এক পুলিশ অফিসারের সহযোগিতায় আগে থেকেই বেনাপোলের পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে এসেছিলাম। এক পুলিশ অফিসার আসলেন সব কাজ তিনি নিজ থেকে করে দিলেন। মনে মনে দালালদের কথাই সবাই ভাবছি আর বলছি আমাদের দেশের কিভাবে উন্নতি হবে। এতো দালাল কেন সব জায়গায়? তখনতো আর জানতামনা আমাদের জন্য ভারতে কি অপেক্ষা করছে। তাহলে এখন নিজের দেশের দালালদের কাস্টমার কেয়ারের একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভের মতো ভদ্রলোকের মতো লাগতো।

পেট্রাপোল, এটি বেনাপোলের পাশে ভারতের অংশের নাম। মাহমুদের বকবকানি শুরু, দেখিস বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের ইমিগ্রেশন সেন্টারটি কতো আধুনিক ও উন্নত। সাগরের চিন্তা মিষ্টি হাসি দিয়ে ওকে অভিবাধন জানাবে। আকাশের ইচ্ছা পেট্রাপোলে ইমিগ্রেশনে এসিতে বসে আগে ঠান্ডা হবে পরে বাদ বাকি কাজ। আর আমার অবস্থা? প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে কিছু জল বিসর্জন না দিলে ঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো না। নিজ দেশের ভিতরে থাকেল এতোক্ষণে রাস্তার পাশে একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে যেতাম। কিন্তু আছি ভারতে, এমন কাজ নিশ্চই পোর্টের মানুষ ভালোভাবে নিবে না। তাই ইমিগ্রেশন প্রবেশের জন্য হালকা বেঁকে বেঁকে হাঁটছি।

আমাদের সবার ধারনাকে শচিন টেন্ডুলকারের মতো বাউন্ডারি হাকিয়ে দিলো ইমিগ্রশনের পরিবেশ। দালাল কাকে বলে কতো প্রকার কি কি উদাহরন সহ দেখছি। পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে বলে ৫শ টাকা দেন সব পার করে দিবো দাদা। দেখছি পুলিশের চোখ অন্যদিকে আর কান খাড়া এদিকে। কোন দালালের খপ্পরে না পরে হাঁটা দিলাম। এখানকার দালালদের আরো ভয়ঙ্কর রুপের বিবরণ দিবো ফেরার ঘটনা বলার সময়।

বিশাল একটি পুরনো গুদামঘরে লাইন ধরে দাঁড় করানো হলো আমাদের। এটাই নাকি ওয়েটিংরুম !!!! গুদাম ঘরের দুইপাশ খোলা, প্রবেশ মুখে একটি মাটির কলসি। যার পিপাসা লাগবে পানি খেতে কোন বাধা নেই। অবস্থা দেখে মাহমুদের দিকে সবাই তাকিয়ে আছি। দেখি সে সেলফি তুলছে। মনে হচ্ছিলো স্পিড ক্যান খেয়ে মাহমুদকে এক লাথি দিয়ে বেনাপোলে পাঠিয়ে দেই। বলি যা আবার দেখে আস আমার দেশের ইমিগ্রেশন সেন্টারটি কতো সুন্দর আধুনিক ও উন্নত।

জল বিসর্জন দিতে হবে। দাঁড়িয়ে থাকা এক কর্মকর্তার কাছে বাথরুম কোথায় জানতে চাইলাম। বললো দাদা এখানে বাথরুম নেই। তবে তিনি আমাকে খুব সহযোগিতা করলেন গুদাম ঘরের একটি কোনা দেখিয়ে দিয়ে বললেন ঐখানে সেরে আসেন। জলধারার দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি জীবনে এখানে আর আসবোনা।

আকঞ্জি আছে বিপদে। ভারত যাত্রার সময় আমাদের সবাইকে সে বলেছিলো সবাই ছোট খাটো লাগেজ নিবা। বড় লাগেজ নিলে বিপদে পরতে হবে। এখন দেখি সে নিজেই বিশাল এক ল্যাগেজ নিয়ে এসেছে। চাইলে সেটাতে ঢুকিয়ে আকঞ্জিকেই কুরিয়ার করে কাশ্মীর থেকে কণ্যাকুমারী পাঠানো যাবে। আকাশের হাতে সরকারি পাসপোর্ট। তার ভাবসাবই আলাদা। বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার পাসপোর্টে ভিসা নাই। আমারটা অনারিয়াম ভিসা। এটা কর্মকর্তারা মনে হয় বুঝবেনা। তাদেরকে বোঝাতে হবে বিষয়টা। গরমে মাথার ঘাম পায়ে পরছে, বাজে ভেপসা গন্ধ। এক কর্মকর্তাকে বললাম, দাদা এতো গরম এখানে ফ্যানের ব্যাবস্থা করেন না কেন। তিনি হেসে উত্তর দিলেন, দাদা আপনি চল্লিশ মিনিট থাকতে পাচ্ছেন না আর আমি সকাল থকে এখানে ডিউটি করছি। বুঝলাম বাজে ভেপসা গন্ধের উৎসটা কি।

আস্তে আস্তে ইমিগ্রেশন টেবিলের কাছাকাছি চলে এসেছি। ছয় থেকে সাতটি ডেস্ক হবে। আমি যে টেবিলের সামনে লাইনে আছি সেখানে কম্পিউটারের পিছনে একজন অতি চিন্তিত অবস্থায় বসে আছেন। আর কিছুক্ষণ পরপর কম্পিউটারের মনিটরের দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছেন আর বোতাম চাপছেন মনে হচ্ছে নিবিড় গবেষণায় ব্যস্ত তিনি। পরে বুঝলাম কম্পিউটার ঠিক মতো কাজ করছে না। যন্ত্রটি ঠিক করার চেষ্টায় আছেন তিনি।

ইমিগ্রেশন শেষ করে বের হয়েই দেখি ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সাইনবোর্ড টানানো মানি চেঞ্জার । মাহমুদের বক্তব্য এখানেই ডলারকে রুপি বানাতে হবে। অন্য জায়গায় জাল নোট দেয়ার রেকর্ড আছে। কাজ শেষে বাসে উঠলাম সবাই। শ্যামলি পরিবহন ছুঁটছে ভারতের গ্রামের বুক চিরে। দেখছি আর ভাবছি একটি সীমান্ত রেখা কিভাবে পরিবেশ ও মানুষ বদলে দেয়। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে ।

কলকাতা শহরে যখন পৌঁছেছি তখন রাত সাড়ে নয়টা। আমরা সবাই দেখছি রাতের কোলকাতা। বাস আমাদের পৌঁছে দিলো মার্কোস্ট্রিট। নানা রকম গল্প শুনতাম কোলকাতার মানুষের। যে এরা খুব মিতব্যায়ী। দুইশ গ্রাম বেগুন, দুই পিস ইলিশের টুকরা এখানে বিক্রি হয়। মানুষ কেনে!

তবে বাস থেকে নামার পর আমারা সবাই একটা ধাক্কা খেলাম। দেখি রাস্তার পাশে একটি লেটেস্ট মডেলের লেমবার্গিন কার দাঁড়িয়ে আছে। ভো করে ছুটে গেলো একটা অডি জিপ। এসব দেখে অকঞ্জির চোখ কপালে। বার বার দেখছে আর কি সব বিরবির করে বলছে। আমার আর সাগরের পেটে তখন ইদুর দৌড়াচ্ছে । খেতে হবে, তার আগে হোটেল ঠিক করতে হবে। রাতে থেকে পরের দিন সকালে বিমানে কোলকাতা থেকে উড়াল দিবো দিল্লী। কোলকাতায় বাস থেকে নামার পর আমাদের ঘিরে রেখেছে একদল দালাল। তারা আমাদের হোটেল ঠিক করে দিতে চায়। নাছোর বান্দা। এদের ধৈর্য দেখে আকাশ রীতিমতো বিরক্ত। আর সাগরের কোন বিকারই নেই। এই ভ্রমণে সাগরের মতো নশ্চিন্ত ও সুবিধাভোগি আর কেও নেই। কোন কিছুতেই তার কোন দায়িত্ব নেই। চিল মুডে সবসময়। ঠিক করলাম টাকা বাঁচাতে হবে। রাতে হোটেলে উঠবো না। খেয়েদেয়ে এয়ারপোর্টে চলে যাবো। সেখানে এসিতে ফাইভস্টার হোটেলের স্বাদ নিবো। মার্কোস্ট্রিটে নবাব নামে এক হোটেলে খেয়ে নিলাম আমরা। মেনু পরোটা আর গরুর মাংসের চাপ। গরুর মাংসের স্বাদ একেবারে ভিন্ন। যেখানে যে জিনিস নিয়ে বিতর্ক থাকে সেই জিনিসের স্বাদ অন্যরকম হবে এটাই স্বাভাবিক। সাগর আর মাহমুদ মোবাইলের সিম কিনে নিলো।

দামাদামি করতে ওস্তাদ মাহমুদ, মার্কোস্ট্রিট থেকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার টেক্সি ভাড়া কারার দায়িত্ব তার উপর। আকঞ্জির পরামর্শ উভার বা ওলে থেকে গাড়ি নেয়া যেতে পারে। তবে আকাশের ইচ্ছা হলুদ এম্বাসিডর। সৈয়দ সাহেবের মর্জি না মেনে পারা যায়। শেষে হলুদ এম্বাসির দেখা শুরু হলো, লোক আমরা পাঁচজন সাথে মালামাল দুইটি টেক্সি লাগবেই। একটি টেক্সি মাহমুদ ঠিক করলো তিনশ রুপি দিয়ে। টেক্সি ড্রাইভার খুবই আন্তরিক, বললো দাদা সবাই এক সাথে উঠে পরেন সমস্যা নাই। ডিকিতে লাগেজ তোলা হচ্ছে কোনভাবেই ধরেনা। শেষে ডিকির কাভারটা হা করে রেখে গামছা দিয়ে টানটান করে বাঁধা হলো। গাদাগাদি করে ৫ জন। আমাদের নিয়ে ছুটছে টেক্সি। আমাদের সবার জন্যই অপরিচিত এই শহর। আমি একটি ব্যাগ কোলে নিয়ে চালকের পাশে বসেছি। পিছনে বাকি চারজন। এয়ারপোর্টে যেতে বেশি সময় লাগলোনা। রাত তখন বারোটা। আমাদের ফ্লাইট পরের দিন সকাল সাড়ে আটটায়। গেটে আটকে দিয়ে নিরাপত্তায় থাকা একজন নারী সদস্য কঠিন মুখে জানান দিলো আপনারা এয়ারপোর্টের ভিতরে ভোরের আগে প্রবেশ করতে পারবেন না। আমাদের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পরলো। কোথায় যাবো কি করবো এতো রাতে। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছি। সবাই নিরাপত্তায় থাকা নারী অফিসারকে বোঝাতে ব্যর্থ। এবার আমার পালা, এতোরাতে সবার শেষ ভরসা আমি। যে করেই হোক ব্যবস্থা একটা করতেই হবে। ইনোসেন্ট একটা ভাব নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললাম।
(চলবে)









Leave a reply