ইচ্ছামতো ইন্টারনেট ব্যবহারের যুগ শেষ!

|

আপনি হয়তো ফটোগ্রাফি করেন। কিম্বা ছোট একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। আপনার কাজ বা পণ্য মানুষের কাছে তুলে ধরতে একটি ওয়েবসাইট খুব দরকার। পছন্দ মতো ডোমেইন কিনে, হোস্টিং করে ওয়েবসাইটে ছবি/পণ্যের তথ্য দিয়ে রাখলেন। কিন্তু ভিজিটররা আপনার সাইটে ঢুকতেই পারে না! লোড হয় খুবই ধীর, কিংবা ‘ব্লকড’ দেখায়। অথচ সাইটের কোনো কারিগরি ত্রুটি নেই। তাহলে আপনার ওয়েসবাইটে ঢুকতে পারছে না কেন?

কারণ, আপনার কন্টেন্ট ভিজিটরকে দেখানোর অধিকার আপনার নাই। আর ভিজিটরেরও আপনার কন্টেন্ট দেখার অধিকার নাই!

হ্যাঁ, এতদিন আমরা ‘অঘোষিত’ অধিকার বলে ইন্টারনেটে যা খুশি ব্রাউজ করে দেখতে এবং দেখাতে পারতাম, বা পারছি। কিন্তু সেই অধিকার গতকাল বৃহস্পতিবার হরণ করা হয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে, খুব নিকট ভবিষ্যতে ‘স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ’ থেকে আমরা বঞ্চিত হতে যাচ্ছি।

null

কারো হস্তক্ষেপ ছাড়া ‘স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের’ সুযোগকেই বলা হয় ‘নেট নিউট্রালিটি’। এতদিন তা একটি আইন দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। সেই আইনের নাম ‘ওপেন ইন্টারনেট অর্ডার’। গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন (এফসিসি) আইনটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশনের ৫ সদস্যের মধ্যে তিন রিপাবলিকান সদস্য আইন বাতিলের পক্ষে ভোট দেন, আর দুই ডেমোক্র্যাট ভোট দেন বাতিলের বিপক্ষে। ৩-২ ভোটে জয়ী হয় ‘নেট নিউট্রালিটি’ বা ইন্টারনেটের স্বাধীনতার বিপক্ষের গ্রুপ।

‘নেট নিউট্রালিটি’ বাতিলের প্রভাব কী?

এক কথায় বলতে গেলে, আইনটি বাতিলের ফলে বড় বড় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) কোম্পানিগুলোর স্বাধীনতা অবারিত হলো, আর নানা পদ্ধতিতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা জিম্মি হলেন কোম্পানিগুলোর হাতে।

নেট নিউট্রালিটি থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সেবার সমান বিন্যাস ছিল। এর আওতায় ইন্টারনেট সেবাদাতা কোম্পানিগুলো (আইএসপি) ভোক্তাদেরকে সব ধরনের অনলাইন কনটেন্টে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য ছিল।

কিন্তু এখন তারা তাদের ইচ্ছা মতো সেবা দিতে পারবে। আপনার মালিকানাধীন ওয়েবসাইটে ভিজিটরদের ঢুকতে দেবে না, কারণ আপনি আইএসপি’কে টাকা দেন না। কিন্তু আপনার মতো কন্টেন্টের অন্য একটি ওয়েবসাইটে বেশি গতি দিয়ে ভিজিটরদের ঢুকতে দেবে, কারণ ওই ওয়েবসাইটের মালিক আইএসপি’কে টাকা দেন।

এর ফলে কম পূঁজির কিন্তু ভাল ভাল কন্টেন্ট আছে এমন ওয়েবসাইট, বা দাতব্য ওয়েবসাইটগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রয়োজনীয় জিনিস এখন যেভাবে বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাচ্ছে তা কঠিন হয়ে উঠবে।

null

নেট নিউট্রালিটি বাতিলের ফলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে আপনার ইন্টারনেট প্যাকেজের মূল্যের ওপর সেবার মান নির্ধারণ করে দিতে পারবে। যদি আপনি কম দামের প্যাকেজ কিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তাহলে আপনাকে সব সাইট প্রবেশাধিকার দেয়া হবে না। ‘বেশি দামী প্যাকেজ, ওয়েবসাইটে বেশি প্রবেশাধিকার’ এই নীতি গ্রহণ করতে তাদের কোনো বাধা থাকবে না; যেমনটি টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে ক্যাবল ব্যবসায়ীরা করে থাকেন।

নেট নিউট্রালিটি না থাকায় ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ‘স্পন্সর কনটেন্ট’ (বিজ্ঞাপন) দিয়ে ভরপুর হয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। এবং সেটি যে বিজ্ঞাপন তাও আপনাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকবে না কোম্পানিগুলোর। ফলে নিজের অজান্তেই ‘ব্যবসার পণ্যে’ পরিণত হবেন ব্যবহাকারীরা।

এখন ইচ্ছা মতো যে কোনো অ্যাপস ডাউনলোড করে সুবিধা নিচ্ছি। কিন্তু নেট নিউট্রালিটি বাতিল হওয়ার কারণে অনেক অ্যাপস ফ্রি ব্যবহার করা সম্ভব নাও হতে পারে। মনে করুন, ‘সিগনাল মেসেঞ্জার চ্যাট’ অ্যাপসটি ব্যবহার করে কল করতে পছন্দ করেন, কিন্তু আপনার মোবাইল অপারেটর দেখলো, এই অ্যাপসটি এভেইলেবল রাখায় তার মুনাফা নেই। তখন তার সার্ভিসে ‘সিগনাল মেসেঞ্জার চ্যাট’ ব্লক করে দিলো। ব্যবহারকারী তখন আইনি কোনো জবাবদিহিতা চাওয়ার কোনো অধিকার নেই।

null

বাতিল হওয়া ‘ওপেন ইন্টারনেট অর্ডার’ আইনে স্পষ্ট করে তিনটি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিলো আইএসপি ওপর।

প্রথমত: বৈধ কন্টেন্ট প্রকাশ করে এমন কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপসকে ব্লক করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত: ইচ্ছা করে কোনো সাইটের ডাটা ট্রান্সমিশনের গতি বেশি করে দেয়া বা কোনো সাইটের গতি কমিয়ে দেয়ার মাধ্যমে বৈষম্য করা যাবে না।

তৃতীয়ত: আর্থিক সুবিধা নেয়ার মাধ্যমেও কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি গ্রাহককে ডাটা ট্রান্সমিশনের গতিতে কম-বেশি দিয়ে বৈষম্য করা যাবে না।

এখন এগুলোর সবই করতে পারবে সার্ভিস প্রোভাইডাররা! কোনো আইনি বাধা নেই তাদের সামনে।

নেপথ্যে কারা?

নেট নিউট্রালিটি বাতিলের পেছনে কারা থাকতে পারে এতক্ষণে তা স্পষ্ট হয়েছে- আইএসপি কোম্পানিগুলো। আর কোম্পানিগুলোর হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এফসিসি’র চেয়ারম্যান অজিত পাই।

null

ভারতীয় বংশোদ্ভুত এই মার্কিনী দীর্ঘদিন ধরে এই নেট নিউট্রালিটির সমালোচক। তার দাবি, এই আইনি বাধ্যবাধকতা ‘উদ্ভাবনে বাধা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। গত এপ্রিল মাসে পাই বলেছিলেন, ‘আপনি কোনো কিছুকে যত নিয়ন্ত্রণ করতে যাবেন, তা থেকে তত কম লাভবান হবেন। এটা অর্থনীতির মৌলিক শিক্ষা।’

অদ্ভুত বৈপরিত্য হচ্ছে- আইনের মাধ্যমে ‘নেট নিউট্রালিটি’ তৈরি করে ইন্টারনেটকে আইএসপিগুলোর ‘নিয়ন্ত্রণমুক্ত’ রাখার সরকারি উদ্যোগ অজিত পাইয়ের কাছে ‘নিয়ন্ত্রণ আরোপ’ এবং তা ‘উদ্ভাবনে’ বাধা বলে মনে হয়! কিন্তু ‘কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ’ হটিয়ে ‘গ্রাহকের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করতে চান, এবং এটা ‘উদ্ভাবনে সহায়ক’!









Leave a reply