আমি শাওনের ব্যাপারে বায়াসড: ইশা

|

ছিলেন আইনের ছাত্রী, হয়ে গেলেন অভিনেত্রী। আদালতের বারান্দার চেয়ে সিনেমার সেট বেশি আকর্ষণ করেছে তাকে। তাতে মন্দ কী! স্টার জলসার সিরিয়াল দিয়ে শুরু; অতঃপর প্রথম চলচ্চিত্র ‘প্রজাপতি বিস্কুট’-এর ‘শাওন’ চরিত্র দিয়েই বাজিমাত। বোদ্ধাদের রায়ে পেলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার (নারী) পুরস্কার। এরপর একে একে ‘সোয়েটার’ ছবির ‘টুকু’, ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ ও ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’-এর ‘ঝিনুক’। প্রত্যেকটি চরিত্রই যেন ইশার জন্য রূপালি এক পথ তৈরি করেছে। যমুনা নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানালেন এ পথেই এগিয়ে যেতে চান। জানালেন আরও কিছু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোয়াহা ফারুক।

  • শুরুটা কীভাবে করা যায়?
    – আপনিই বলুন।
  • আগে সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেই। আমি বিনোদন নিয়ে কাজ করি না। সিরিয়াস বিষয়ে কাজ করে অভ্যস্ত। তাই কোনো প্রশ্ন বেখাপ্পা মনে হলে বলবেন।
    – নিশ্চয়ই।
  • প্রথম প্রশ্ন, আপনাকে প্রথম চোখে পড়েছে ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ সিনেমাটি দেখে। মধ্যবিত্ত গৃহবধূ শাওনের চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছিলেন। এই কাজটা কি স্ক্রিপ্ট দেখেই নেয়া?
    – প্রজাপতি বিস্কুট আমার প্রথম সিনেমা। আমি স্ক্রিপ্ট পরে শুনেছি। অনিন্দ্য চ্যাটার্জির ফিল্ম বলে কাজটা করবো ভেবে নিয়েছিলাম। দ্বিতীয়ত, স্ক্রিপ্ট শোনার পর আরো ডিটারমাইন্ড হয়ে গেছিলাম যে এই কাজটা আমাকে করতেই হবে।
  • পরিচালকের সাথে আগে থেকেই আলাপ ছিল? প্রথম কাজ পাওয়ার সূত্র কী? কেনো তার মনে হলো আপনাকেই কাস্ট করা দরকার?
    – হা হা। তা না, অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে চেনেন না এরকম বাঙালি কমই আছেন। বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর সদস্য, এবং ওনার প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ সেটাও নাম করেছে। ওনাকে পার্সোনালি চিনতাম না। আগে থেকে আলাপ ছিল না। টেলিভিশনে আমি একটি মেগা সিরিয়ালে কাজ করেছি। সেখানে দেখেই উনি আমাকে ফোন করেছিলেন। যদিও ওনার সাথে আমার প্রথম কাজ একটি টিভিসি (বিজ্ঞাপণ)। পরে শুনেছি, শাওন হিসেবে আমাকে ভেবেছেন উনি এবং সেটিরই স্ক্রিন টেস্ট ছিল ওই টিভিসিটি।
    আমার প্রথম কাজ টেলিভিশনে, স্টার জলসায় ‘ঝাঁঝ লবঙ্গে ফুল’ নামের একটি মেগা সিরিয়াল। তারপর প্রজাপতি বিস্কুট।
  • তারমানে অনিন্দ্যই আপনাকে আবিষ্কার করে নিয়েছেন, অন্তত বড় পর্দার কথা যদি বলি?
    – একদমই।
  • তারপর? আপনাদের চুক্তিপত্র স্বাক্ষর হলো? নাকি ইনফরমালি শুরু হয়ে গেলো?
    -তারপর, প্রোডিউসার শিবপ্রসাদ মুখার্জি এবং নন্দিতা রয়ের সাথে মিটিং এবং অবশ্যই কনট্রাক্ট। আনঅফিসিয়ালি হওয়ার তো কথা নয়।
  • বেশ। তারমানে আপনি পুরোমাত্রায় পেশাদার পরিবেশ পেয়েছেন?
    – একেবারেই।
  • তারপর আমরা যেখানে ছিলাম, প্রজাপতি বিস্কুটের শাওন; আপনার সাথে কতটুকু মেলে শাওনের?
    – কিছুটা তো বটেই। একটু ইন্ট্রোভার্ট… নিজের মনের কথা সবসময় সবাইকে বলে বোঝাতে পারে না, তবে প্রতিবাদীও; যদিও প্রতিবাদ করার ধরন দু’জনের একেবারেই আলাদা। আসলে শাওনের মতো করে ভাবতে শিখেছিলাম। বড় পর্দার শুরু শাওন হিসেবে তাই মনের খুব কাছের চরিত্র। আমি শাওনের ব্যাপারে বায়াসড। ইশা মাঝে মাঝে শাওন হয়ে যায়।
  • আচ্ছা? শাওনও কী খানিকটা ইশা হয়ে উঠেছিলো? যদি শাওনের পরিবর্তনের দিকে তাকাই, যখন শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে সে সিঙ্গেল লাইফের দিকে হাঁটা শুরু করলো?
    – হা হা, সেটা পরিচালক, লেখকের জন্যই, তবে ইশা খুশি হয়েছিল তাতে।
  • অর্থাৎ আপনার সাথে অবদমিত শাওনের চেয়ে বোল্ড শাওন বেশি মেলে?
    – তা নয়, আমার মনে হয় শাওন নিজেকে অবদমিত ভাবেনি কখনও। তার ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে আর পাঁচটা বাঙালি মধ্যবিত্ত ফ্যামেলিতে অ্যাডজাস্ট করার কথা শেখানো হয়েছে, আমরা ধরেই নিতে পারি, শাওন সেই চেষ্টাটুকু করেছে। আমার মতে, ইশা হলেও সেটাই করতো। সুযোগ তো দিতেই হবে সম্পর্কটাকে। (সিনেমার চরিত্রের সম্পর্ক প্রসঙ্গে)।
    তবে, হ্যাঁ, আমার শাওনের সেই সাইডটা বেশি পছন্দের যেখানে তার নিজের ভাবনাটাকে সে এক্সপ্রেস করতে পারে। শ্রাবণী থেকে শাওন হয়ে ওঠার চেষ্টায়, নিজেকে কোথাও চেপে রেখেছিল, সেটা যখন ব্রেক করলো, আমি তো খুশি হবোই।
  • তো, প্রজাপতি বিস্কুট করে তো ভালো সাড়া পেয়েছিলেন?
    – হ্যাঁ, ভয় ছিল দর্শক রিঅ্যাকশন কেমন হবে। তবে নিজেদের কাজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, দর্শক গ্রহণ করেছে। এবং সমালোচকরাও। শাওন চরিত্রের জন্যই ফিল্ম ফেয়ার ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড পাওয়া। যদিও আমি বিশ্বাস করি, অ্যাওয়ার্ড দিয়ে ভালো বা খারাপ কাজ বিচার করা যায় না, তবে মোটিভেশন অবশ্যই পাওয়া যায়। তাই, শাওন আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে। আপনার ভালো লেগেছে বলেই অন্য দেশ থেকে ইন্টারভিউ করছেন, এটাই তো বড় পাওয়া।
  • এরপর কী কী কাজ করলেন?
    – প্রজাপতির বিস্কুটের পরে ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ২০১৮ সালে, এটা অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের প্রথম সিনেমা, দেখেছেন?
  • না।
    – তারপর এলো ‘সোয়েটার’, আশা করি ‘প্রেমে পড়া বারণ’ গানটি শুনেছেন, সেখানে ‘টুকু’ও আমার করা একটি আপন চরিত্র।
  • না, শুনিনি। তবে শুনে নেবো।
    – অপরাধ কিন্তু এটা। দেখতে হবে। হইচই- এ পাবেন। সোয়েটারের পর ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’ এলো। এগুলো সবই হইচই-এ পাবেন। দেখে জানাবেন, কেমন হলো।
  • আমার কাছে, আপনি শুধুই ‘শাওন’ হিসেবে পরিচিত। সেটা আগেই বলে নিয়েছি। আপনার বিজ্ঞাপন দেখেছি, তবে ততটা ভালো লাগেনি।
    – মানছি। তবে আপনি তো ইশার ইন্টারভিউ করছেন, শাওনের নয়। তাহলে অভিনেত্রী ইশার বাকি কাজগুলো তো দেখতে হবে।
  • সেটা দেখবো। আবার ইন্টারভিউ করবো। সমস্যা কী? এমন তো না আর দেবেন না?
    – অবশ্যই দেবো। ভালো লাগবে যদি ‘সোয়েটার’ এবং গুপ্তধন সিরিজগুলো দেখেন।
  • এখন তাহলে সিনেমাতেই নিয়মিত হচ্ছেন?
    – হ্যাঁ, সিনেমা আর অবশ্যই ওয়েব সিরিজ। অনেক ভালো ভালো কনসেপ্ট নিয়ে কাজ হচ্ছে।
  • অর্থাৎ গতানুগতিক টিভি সিরিয়ালে কাজ করবেন না।
    – টিভি সিরিয়াল দিয়ে আমি শুরু করেছি। রেসপেক্ট রয়েছে কাজটার প্রতি। তাই কখনও করবো না বলতে পারছি না। তবে এখনি কোনো প্ল্যান নেই। আগামী ৫/৭ বছর তো নয়ই।
  • পুরোপুরি বাণিজ্যিক ঘরানার যেসব ছবি হয় সেখানে কাজ করবেন?
    – এটা নিয়ে আমার একটা আলাদা মত আছে। বাণিজ্যিক বলতে আমরা কী বুঝি?
  • দারুণ পয়েন্ট…
    – যে ছবি ব্যবসা করে সেই ছবি নাকি যেখানে টিপিক্যাল নাচ, গান থাকে সেই ছবি?
  • সাধারণত দ্বিতীয়টিকেই বোঝানো হয়…গতানুগতিক গল্প, নাচ-গানের ছবি ব্যবসা সফল না হলেও বাণিজ্যিক বলা হচ্ছে। আর ভিন্ন গল্প, প্যাটার্নের ছবি ব্যবসা সফল হলেও সেটিকে বাণিজ্যিক বলা হচ্ছে না।
    – আমার মনে হয় প্রথমটা… যেই ছবি বাণিজ্যিকভাবে হিট সেই ছবিতে নাচ গান থাকবে তার কোনো মানে নেই। এখন পরিবর্তনের সময়। আমি এটাই বুঝি। ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ আর ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’ ২০১৮-১৯ এর সবচেয়ে হিট। এই সিরিজের দুটো ছবিই কিন্তু বাণিজ্যিক।
  • আমি কিন্তু আমার মত আরোপ করছি না। ধারণাগুলো সামনে আনছি।
    – না না, সেটি বুঝতে পারছি। আমার মনে হয় আমাদের মাইন্ডসেট চেঞ্জ করা দরকার।
  • তাহলে আপনি কোনো ছকে আটকাতে চাচ্ছেন না…
    – না, তবে আমার মনে হয় সবটাই কনসেপ্ট অর্থাৎ স্ক্রিপ্টের ওপর নির্ভর করবে। বাণিজ্যিক হোক আর অন্যরকম হোক, গল্প যদি আমায় আকর্ষণ করে করতে আপত্তি নেই।
  • এবার ব্যক্তিগত বিষয়ে আসি, আপনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, অভিনয় নিয়েই থাকবেন?
    – দুটো জিনিস একসাথে করার মতো ট্যালেন্ট আমার সত্যি নেই। অভিনয়টা এনজয় করছি, নিজেকে এক্সপ্রেস করতে পারছি, এটা আমার প্রফেশন, প্যাশনও বটে। আপাতত শুধুই অভিনয়।
  • তাহলে আইনজীবী ইশাকে দেখা যাচ্ছে না…
    – আইন থাকলো, পরে কখনও ইচ্ছে হলে করবো। তবে সুযোগ কম। অবশ্য, অভিনেত্রী হিসেবে কখনও লইয়ার বা জাজ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকছে।
  • পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন, আপনার পরিবারে কারা আছেন?
    – বাবা, মা, ভাই।
  • আপনাকে কতটুকু ইন্সপায়ার করেন?
    – আমার ফ্যামেলি থেকেই আমিই প্রথম যে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি। আমার কাজটা আনসারটেন এটা ওনারা বোঝেন… তাই হয়তো প্রথম দিকে বুঝতে চাইতেন যে কী হচ্ছে ব্যাপারটা।
  • এখন?
    – আস্তে আস্তে ওরা আমার ব্যস্ত শিডিউলের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নেন। আমিও যতটা সম্ভব ওদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, ফিল্ম রিলিজ হলে ওরা এখন হলে গিয়ে একসাথে ফিল্ম দেখেন। আমার ধারণা, বাবা-মা আমার নিরাপত্তা জান এবং চান আমি যেটা করছি সেটা যেন ভালোবেসে করি, ভালো করি। আমরা যেটুকু সফল হই, সেটা অবশ্যই বাবা মা না থাকলে হতো না, ওরা তো লাইফটাইম ইন্সপাইরেশন।
  • তাহলে তো তারা এখন কনভিন্সড?
    – হ্যাঁ। তাদের প্রত্যাশা ছিল জাজ হবো, আর প্রাপ্তি অভিনেত্রী মেয়ে, তাতে এই মুহূর্তে তাদের কোনো দুঃখ নেই।
  • ভাই কীভাবে দেখে?
    – ভাই আমার ছোটো। জব করছে, আমার মতোই ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট। মুখে খুব একটা কিছু বলে না। তবে ফিল্ম দেখে, কাজ দেখে। সাইলেন্ট সাপোর্টার আরকি।
  • আর কেউ আছে যার কথা বলতে চান?
    – আমার এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি আছে। জয়েন্ট ফ্যামেলির মতো ব্যাপারটা। মাসির পরিবার, আমরা একই বিল্ডিংয়ে থাকি। একটা বড় পরিবারের আমেজ আছে। আর স্পেশাল কারো কথা বলতে চাই না। আমার ফ্রেন্ড সার্কেল বড্ড ছোটো। তাতেই ভালো আছি। বাকিটা সময় হলে অবশ্যই জানাবো।
  • মানে আপাতত জানাতে চান না, নাকি এখনও তেমন কারো কথা বলা যাচ্ছে না?
    – আমি চাই না, এই মুহূর্তে আমার কাজ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা হোক। কাজের ওপর ফোকাসটা থাকুক। কেউ আছে কিংবা নেই, কোনোটাই বলতে চাই না।
  • কোন চরিত্র করার প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে?
    – যেকোনো ভালো সিনেমা দেখলে মনে হয় এটা আমি করলে কেমন করতাম; এরকম অনেক ক্যারেক্টার আছে যেগুলো আমি করতে চাই। কিন্তু ড্রিম ক্যারেক্টার বলে কিছু নেই।
  • কাদের কাজ ভালো লাগে কিংবা আইডলের স্থানে রাখতে চান?
    – অনেকে আছেন। বাংলা-হিন্দি-ইংলিশ মিলিয়ে। মালায়ামও। আলিয়া ভাট আমার পছন্দের অভিনেত্রী। পাওলি দাম, জয়া আহসান, দক্ষিণ ভারতের প্রভাতি, নাজরিয়া। কেট উইন্সলেট ছোটবেলার ভালোবাসা। আরও অনেকে।
  • কেট উইন্সলেট কি টাইটানিক দেখে?
    – হ্যাঁ, মোস্ট রোমান্টিক ফিল্ম। এছাড়া দ্যা রিডার দেখেছি। আমি ওনার ফ্যান।
  • ক্যাপ্রিওদের ভালো লাগেনি? মানে কোনো পুরুষ অভিনেতার কথা বললেন নাতো 
    – জানতে চাননি তো।
  • নারী পুরুষ ভেদ করিনি তো?
    – আমি শুধু মেয়েদের ভাবলাম। পুরুষদের লিস্ট একটু বড়। এখানে আবির চ্যাটার্জি, ভিকি কৌশল, রাজকুমার রাও, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি, ডি ক্যাপ্রিও। একটা সময় টম ক্রুজ। ক্রিস প্রেট। আরও অনেকে আছেন। আমি টার্কিস ফিল্ম সিরিজ দেখি, ওখানে অনেক দারুণ অভিনেতা আছেন, সাউথ ইন্ডিয়ান তো আছেনই।
  • অবসরে কিছু করেন?
    – অবসরে বই পড়া আমার সবচেয়ে পছন্দ। সিনেমাও দেখি, কাজের স্বার্থেই ইদানীং অনেক বেশি মুভি দেখতে হয়।
  • আপাতত ইন্টারভিউটি শেষ হলো। আপনাকে ধন্যবাদ।
    – আপনাকেও ধন্যবাদ।









Leave a reply