তাজমহল তিনবার, লালকেল্লা দু’বার বিক্রি করেছিলো যে প্রতারক

|

বিরাট ভারতবর্ষে দালাল-প্রতারকের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। নীরব মোদি, ললিত মোদি, বিজয় মাল্য- ভারতের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা গিলে ফেলা এসব প্রতারকের কেচ্ছা-কাহিনী সবার মুখে মুখে।

অথচ এত ‘খেয়েও’ কেউই বাবু নটবরলালকে টপকে যেতে পারেনি। আজও নটবরলাল বাবুকেই ভারতের সর্বকালের সেরা প্রতারক মনে করেন দেশটির অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

শুধু ভারতসেরা নয়, বিশ্বসেরা ১০ প্রতারকের তালিকাতেও তার নামই সবার আগে। একমাত্র কারণ তার ক্ষুরধার বুদ্ধি। যার জোরে সে বেচে দিয়েছিল তাজমহল। একবার দুবার নয়, তিন তিনবার।

লালকেল্লা বেচেছিল দু’বার। রাষ্ট্রপতির সই নকল করে বেচে দিয়েছিল লোকসভাও। বিষ্ময়ের বিষয় হল, এই ভারতসেরা ‘চোর’ই তার নিজ গ্রামে দেবতুল্য। শুধু নটবর বললে তাকে কেউ চেনে না। বলতে হয়, মিস্টার নটবরলাল। ইন্ডিয়া টুডে।
এই প্রতারকের বায়ান্নটি ছদ্মনামের মধ্যে মিস্টার নটবরলাল নামটা অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে যায়। এমনই বিখ্যাত হয়ে যায় যে নটবরলাল শব্দটা আজ হিন্দি ভাষায় প্রতারকের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঠগের জীবন নিয়েই তৈরি হয়েছিল অমিতাভ বচ্চনের সুপারহিট সিনেমা মিস্টার নটবরলাল। বিহারের সিওয়ান জেলার জিরাদাইয়ের বাঙ্গরায় ১৯১২ সালে জন্ম হয় মিথিলেশ শ্রীবাস্তবের। বাবা রঘুনাথ প্রসাদ ছিলেন রেল কর্মচারী। মেধাবী মিথিলেশ স্নাতক হয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে করতে শুরু করে লোক ঠকানো। নিজের গ্রামের এক লোকের সঙ্গে প্রথম প্রতারণা করে। সেই ব্যক্তি মিথিলেশকে শহরের ব্যাংকে ড্রাফট জমা করতে দিয়েছিলেন। জমা করার সময় ড্রাফটে ব্যক্তির সই দেখে নকল করে নেয় মিথিলেশ।

তারপর খেপে খেপে প্রায় ১০০০ টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেয়। ১৯৩০ সালের সেসময়ে ১০০০ টাকা কিন্তু কম কথা নয়। একদিন ধরা পড়ে যায় সে। বাবা পেটানোর পরে ঘর ছেড়ে মিথিলেশ পালায় কলকাতায়।

এক ব্যবসায়ীর ছেলেকে টিউশন পড়ানো শুরু করে কলকাতায় গিয়ে। সেখানে তুলোর ব্যবসায়ী শেঠকে সাড়ে চার লাখ টাকা ঠকিয়ে নেয়।

এরপর ৬৬ বছর ধরে ভারতের আট রাজ্যে পঞ্চাশটি ছদ্মনাম ব্যবহার করে প্রায় ৪০০ লোককে ঠকিয়ে কোটি টাকা উপার্জন করেছে মিথিলেশ শ্রীবাস্তব। ছদ্মবেশ ধরায় অসম্ভব পটু ছিল নটবরলাল। প্রতারণার নিত্যনতুন আইডিয়া আসতো তার মাথায়।

যেমন তুখোড় ইংরেজি বলতে পারত, তেমনই ছিল তার ব্যক্তিত্ব ও আইনের বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। এছাড়াও মানুষের সই হুবহু জাল করায় সে ছিল ওস্তাদ। একবার কারও সই দেখেই সেই সইটা নিখুঁতভাবে নকল করতে পারত। বেশির ভাগ লোককে সে ঠকিয়েছে তাদের সই জাল করে।

বর্তমান ভারতের বড় বড় ধনকুবেররা পেরে ওঠেননি নটবরের সঙ্গে। সমাজসেবী বা বিশিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সেক্রেটারি বা কোনো বড় দলের নেতা সেজে বড় অংকের চাঁদা বা ডোনেশন নিয়ে আসতো টাটা বিড়লা এবং ধীরুভাই আম্বানিদের কাছ থেকে। নিখুঁত নথি ও অসামান্য বাকপটু হওয়ায় তারা সন্দেহই করেননি। বহুদিন ধরে অর্থ দিয়ে গেছেন নটবরলালকে। নিজেকে সবসময় কোনো কেন্দ্রীয় স্তরের নেতা বা মন্ত্রীর সেক্রেটারি দেখাত।

সেরকম সাজ পোশাক ও জাল সরকারি কাগজপত্র স্ট্যাম্প সবসময় সঙ্গে রাখত। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নারায়ণ দত্ত তিওয়ারির সেক্রেটারি সেজে দিল্লির এক নামকরা ঘড়ির দোকানে যায় নটবরলাল। মালিককে বলে প্রধানমন্ত্রী ভারতে সফররত বিদেশি অতিথিদের ৯০টি দামি ঘড়ি উপহার দেবেন। সেই জন্য ঘড়ি কিনতে তাকে পাঠিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী।

অশোকস্তম্ভের ছাপ মারা সরকারি প্যাডে মন্ত্রীর সই করা চিঠি দেখে দোকানদার ৯০টি ঘড়ি নিয়ে নর্থ ব্লকে অর্থমন্ত্রীর দফতরের সামনে যায়। সেখানে ঘড়ি ডেলিভারি নিয়ে সরকারি ড্রাফট দেয় প্রতারক নটবরলাল। ড্রাফট ভাঙাতে গিয়ে দোকানদার বোঝেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। ততক্ষণে পাখি হাওয়া।

আইনজীবী হওয়ায় জমিজমার কাগজপত্রের খুঁটিনাটি জানত নটবরলাল। তাজমহলের মালিকানা তার, এই মর্মে প্রয়োজনীয় সব কাগজ ও সরকারি নথি জোগাড় করে সে তিনবার তাজমহল বেচে দিয়েছিল বিদেশিদের কাছে। শুধু তাজমহল নয় লালকেল্লাও বেচে দিয়েছিল দু’বার। এছাড়াও প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের সই নকল করে সরকারি নির্দেশ জারি করে ও প্রয়োজনীয় নিখুঁত নথিপত্র দেখিয়ে বেচে দিয়েছিল লোকসভা ভবনও। পুলিশ ও আদালতের কাছে থাকা মামলার নথি দেখলে বোঝা যাবে এসব অভিযোগ একবর্ণ মিথ্যে নয়।

কীভাবে ঠকাও লোকদের? কানপুর আদালতে জজসাহেবের মুখ থেকে এই প্রশ্ন শুনে জজের কাছ থেকে এক টাকা চেয়েছিল নটবরলাল। টাকা নিয়ে পকেটে পুরে নিয়ে নটবরলাল উত্তর দিয়েছিল, ‘আমি লোকেদের কাছে চাই, এভাবেই লোক আমাকে দিয়ে দেয়।

আমি কাউকে বন্দুক দেখিয়ে বা মারধর করে লুট করিনি। দেড়শ’টি মামলায় আমার বিরুদ্ধে আক্রমণ বা আঘাত করার অভিযোগ নেই। আমি চেয়েছি ওরা দিয়েছে।

ভারত সরকার চাইলে আমার বুদ্ধি ধার নিতে পারে। বিদেশিদের কাছে ভারতের ধার মিটিয়ে দেব আমি।’ বলাবাহুল্য, এক টাকা সে আর জজসাহেবকে ফেরত দেয়নি।

নটবরলাল তখন লখনৌ জেলে বন্দি। কয়েক মাস পর পর স্ত্রীর চিঠি আসে কিন্তু দেড় বছর ধরে সে কোনো চিঠির উত্তর দেয় না। আট নম্বর চিঠিটি নিয়ে এসে জেলার নটবরলালকে বলেছিলেন, এ চিঠির উত্তর তোমায় দিতেই হব

নটবরের স্ত্রী চিঠিতে লিখেছেন, তিনি জমি চাষ করবেন কিন্তু পয়সা নেই। উত্তরে নটবরলাল লিখেছিল, জমির একজায়গায় একফুট নিচে প্রচুর সোনা লুকানো আছে, সেখান থেকে কিছু নিয়ে আপাতত কাজ চালাতে। ক’দিন পরেই জেল থেকে বেরিয়ে ঘরে ফিরে বাকি ব্যবস্থা সে করে দেবে। দ্য ওয়াল।

চিঠি নটবরের স্ত্রীর কাছে যাওয়ার আগেই পুলিশ গ্রামে চলে গিয়েছিল সোনা উদ্ধারে। কয়েকশ’ লোক লাগিয়ে পুরো জমি খুঁড়ে ফেলেও সোনা মেলেনি। কয়েক মাস বাদে জেলে নটবরের স্ত্রীর চিঠি এলো, তাতে লেখা পুলিশরা ক্ষেত চষে দিয়ে যাওয়ার ফলে ফসল এবার খুব ভালো হয়েছে।

রাগে অগ্নিশর্মা জেলার নটবরের সেলে এসে চেঁচামেচি করতে থাকলে নটবরলাল বলেছিল, আপনি জোর করেছিলেন তাই চিঠি লিখেছিলাম। এই জন্যই স্ত্রীর চিঠির উত্তর দিতাম না।

৬৬ বছর ধরে প্রতারণা চালিয়ে মোট নয়বার গ্রেফতার হয়েছিল নটবরলাল। জেলে মোট কাটিয়েছিল ২০ বছর। তার নামে আট রাজ্যে দেড়শ’র বেশি প্রতারণার মামলা করা হয়েছিল। মাত্র প্রথম ১৪টি কেসের রায়েই নটবরলালের ১১৩ বছরের জেল হয়েছিল। তবে নয়বারই জেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল নটবরলাল। ১৯৯৬ সালে যখন শেষবারের মতো গ্রেফতার হয় নটবরলাল, সেই সময়ে তার বয়স ছিল ৮৪ বছর।

কানপুর জেলে চলার ক্ষমতা হারানো নটবরলালের সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল হুইল চেয়ার। তাকে দিল্লির এইমস-এ ভর্তি করার নির্দেশ দেন আদালত। কানপুর থেকে ট্রেনে করে নটবরলালকে দিল্লিতে নিয়ে এসে ট্রেন থেকে নামিয়ে আবার হুইল চেয়ারে বসানো হয়। জেল পুলিশরা রেল পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পেছন ঘুরে দেখে হুইল চেয়ার ফাঁকা। নটবরলাল উধাও। দিনটি ছিল ১৯৯৬ সালের ২৪ জুন। সেই শেষবারের মতো তাকে দেখতে পেয়েছিল পুলিশ। তারপর আর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আজও বাঙ্গরা গ্রামের অধিবাসীরা তাকে ভগবান মানে। তাকে শুধু ‘নটবরলাল’ বলা যাবে না। বলতে হবে ‘মিস্টার নটবরলাল’ বা ‘মিথিলেশ বাবু’। গ্রামের লোকেরা আজও বলেন, গরিবদের লুটে যারা বড়লোক হয়েছিল, তাদের লুটে মিথিলেশ বাবু সেই টাকা আবার গরিবদের ফিরিয়ে দিত।

আশির দশকে তিনটি গাড়ির কনভয় নিয়ে শেষবার গ্রামে গিয়েছিল নটবরলাল। শামিয়ানা টাঙিয়ে সারা গ্রামের জন্য বিশাল ভূরিভোজের ব্যবস্থা করেছিল। খাওয়ার পর গ্রামবাসীদের প্রত্যেককে একশ’ করে টাকা দিয়েছিল। পুলিশ জানতেই পারেনি।

২০০৯ সালে নটবরলালের উকিল আদালতে জানান, জুলাই মাসের ২৫ তারিখে নটবরলাল মারা গেছে। কিন্তু নটবরলালের ভাই গঙ্গাপ্রসাদ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, দিল্লি স্টেশন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরে, ওই বছরই নটবরলাল রাঁচিতে মারা গেছে। নিজের মৃত্যুর ওপরও নিজের স্টাইলেই রহস্যের পর্দা বিছিয়ে গেছে প্রতারক নটবরলাল।









Leave a reply