ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্ন, ৬৮ শতাংশ শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত

|

ঢাকা শহরে বসবাসকারী ধনীদের তুলনায় দরিদ্রদের আয় অনেক কম। ফলে দেশের অন্য সব জেলার তুলনায় রাজধানীতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এখানকার ১০ শতাংশ ধনী মানুষের আয় পুরো শহরের অধিবাসীদের মোট আয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের আয় ঢাকার অধিবাসীদের মোট আয়ের ১ শতাংশের কম। ফলে এই শহরে ধনীদের আয় বেশি, দরিদ্রদের আয় কম। এ শহরের সাড়ে ৩ শতাংশ মানুষ এখনো তিন বেলা খেতে পায় না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘একনজরে ঢাকা শহরের অধিবাসীদের জীবন’ শীর্ষক গবেষণা জরিপটি বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো জুলফিকার আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। ২০১৯ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা শহরের ১২ হাজার ৪৬৮ জন মানুষের ওপর এটি করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এখনো তিন বেলা খাবার পায় না সাড়ে ৩ শতাংশ মানুষ। আর বস্তি এলাকায় তিন বেলা খাবার পায় না ১৮ শতাংশ মানুষ। ফলে সাড়ে ২১ শতাংশ মানুষ তিন বেলা খাবার পায় না। এদের জীবনযাত্রায় নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ধনী-গরিবের আয়ের বিপুল বৈষম্য প্রভাব ফেলছে রাজধানীবাসীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। রাজধানীর ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। ৬৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত। এতে দেখা যায়, ওপরের ১০ শতাংশ (বেশি আয়ের) মানুষের কাছে মোট আয়ের ৪১ শতাংশই চলে যায়। মোট আয়ের ১ শতাংশও নিচের দিকের ১০ শতাংশের মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

এমন অবস্থার মধ্যে দিয়েই আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু নগরবাসীর আয় বাড়ানো, আয় বৈষম্য কমানোর জন্য কি পদক্ষেপ নেয়া যায় সে বিষয়ে তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় বসবাসরত প্রায় দুই কোটি মানুষের মধ্যে দরিদ্র নয়, এমন নিরাপদ অবস্থানে আছে ৬৩ শতাংশ। দরিদ্র্যের হার ১৭ শতাংশ। আর ২০ শতাংশ আছে যাদের পরিবারে কোনো একটি দুর্যোগ বা সমস্যা এলেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। অর্থাৎ ৩৭ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যেকার আয় বৈষম্য কমাতে হলে দরিদ্রদের আয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা সুবিধা দিতে হবে। এর মধ্যে চিকিৎসা, গণপরিবহন, বিনোদন, নিত্যপণ্য কেনায় বিশেষ ছাড়। এসব সুবিধা দিলে তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা হলেও উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। সব দেশেই দরিদ্রদের জন্য এসব সুবিধা দেয়া হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের অধিবাসীরা নিয়মিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ কেনা বাবদ ঢাকার বাসিন্দাদের আয়ের একটা বড় অংশ খরচ করতে হচ্ছে। গড়ে শহরের অধিবাসীদের মোট মাসিক আয়ের প্রায় ৯ শতাংশ ব্যয় চিকিৎসার পেছনে। যাদের মাসিক গড় আয় মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকা, তাদের আয়ের ৬৭ শতাংশ চিকিৎসা খরচ বাবদ চলে যাচ্ছে। যাদের মাসিক আয় পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা তাদের ৩২ শতাংশই খরচ হয়ে যায় চিকিৎসায়। ঢাকার বাসিন্দাদের গড়ে জনপ্রতি মাসে চিকিৎসাবাবদ খরচ হয় সাত হাজার ৪১৭ টাকা। এর মধ্যে পরোক্ষ খরচ বা আয়ের ক্ষতি হচ্ছে চার হাজার ৩৭৪ টাকা। সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে খরচ হয় দুই হাজার ২৫০ টাকা। আয়ের বড় অংশই খরচ হচ্ছে চিকিৎসা খাতে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাসের শহর ঢাকায় ৭২ শতাংশই ভাড়া বাসায় থাকেন। সরকারি বাসায় থাকে ৬ শতাংশ মানুষ। আর নিজের কেনা বা পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাসায় বসবাস করছে ১৯ শতাংশ মানুষ। ঢাকায় গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী হয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর পরেই আছে দক্ষিণের জেলা বরিশাল। গত পাঁচ বছরে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছে ৮ শতাংশ মানুষ। ময়মনসিংহ আছে তিন নম্বরে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ১০ বছর আগে ঢাকায় অভিবাসী হওয়ার তালিকায় যে ১০টি জেলা ছিল সেখানে রংপুর জেলা ছিল না। কিন্তু পাঁচ বছরে রংপুর থেকে ৪ শতাংশ মানুষ ঢাকায় এসেছে।









Leave a reply