ডাক্তারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে কে?

|

ডা. রাফা বিনতে নূর:

ডেঙ্গুর দিনগুলোতে চিকিৎসকদের শিফটের কোনো বালাই ছিল না, কোনো ছুটি ছিল না। ছিল না কোনো বাড়তি সুবিধা, বেতন ভাতা। ঈদের ছুটিও বাতিল ছিল। যেসব ডাক্তাররা নিজের দায়িত্ব পালন করতে করতেই আক্রান্ত হয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের জাতীয় বীরের খেতাব দেওয়া হয়নি। জাতি তাদের মনে রাখেনি।

ডা. তানিয়া সুলতানা। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এম বি বি এস পাস করে শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এফসিপিএস প্রথম পার্ট পাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে কর্মরত ছিলেন। হাসপাতালে তখন প্রচুর শিশু ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হচ্ছিলো। বিনা বেতনে নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হালকা জ্বর শরীর খারাপ লাগাকে পাত্তা দেওয়ার মতো সুযোগ হয়নি। হঠাৎ একদিন অজ্ঞান হয়ে গেলে ভর্তি করানো হয় আনওয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে। ধরা পরে ডেঙ্গু। আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে তিন বছরের ছেলে সন্তানকে রেখে চলে যান না ফেরার দেশে। তাকেই বা কে মনে রেখেছে?

করোনা ইতোমধ্যে মহামারি ঘোষিত হয়েছে। অনেক দেশেই প্রার্থনালয়, স্কুল, কলেজ, অফিসসহ জনসমাগমের স্থানই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশেও ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

যা-ই হোক না কেন, স্কুল বন্ধ দিতে পারে। অফিস বন্ধ হতে পারে। বর্ডারগুলো বন্ধ হতে পারে। এমনকি মসজিদ, মন্দির সবই বন্ধ করতে পারে। কিন্তু চালু থাকবে হাসপাতালগুলো।

করোনাভাইরাসের ভয়াল আক্রমণে যারা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে কাজ করে যাচ্ছেন সেইসব চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, যাদের কাজের ক্ষেত্রটা জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক প্রতিকূলতায়ও বন্ধ করা যায় না তাদের সুরক্ষার জন্য কিছু কি করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সুরক্ষা পোশাক? প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব সরবরাহ হচ্ছে?

ঢাকার স্বনামধন্য একটি প্রাইভেট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, শুধুমাত্র নার্সদেরকে পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট দিবে, চিকিৎসককে নয়! আরেকটি হাসপাতালে শুধুমাত্র মাস্ক দিচ্ছে। এছাড়া কোনো বাড়তি ভাতা, গাউন প্রটেকশন, ওয়ার্ডে এক্সট্রা স্টেরিলাইজিং’র ব্যবস্থা নেই।

হাসপাতালগুলোতে অবাধ বিচরণ সবার। দর্শনার্থী কমানোর কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হোক। হাসপাতালগুলোতে ঢুকার সময় ও বের হওয়ার সময় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হোক। পর্যাপ্ত পরিমাণ গগলস, মাস্ক, গাউন, স্যানিটাইজার, গ্লাভস, বুট সরবরাহ করা হোক। চিকিৎসক ও সকল চিকিৎসা সেবাদানকারীদের ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হোক। করোনার প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। পাবলিক হেল্থ, ক্লিনিকাল মেডিসিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রধান করে সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের হাতে দেওয়া হোক।

সম্প্রতি ডিজি হেল্থ পপলিন কাপড় দিয়ে কীভাবে মাস্ক বানানো যায় তার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় নিজেরা স্যানিটাইজার তৈরি করেছে। কর্তৃপক্ষ চাইলে স্বল্প খরচে সবগুলো প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্টের ব্যবস্থা করতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশ ফেরত করোনা বাহকরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উপরওয়ালা রক্ষা না করলে যেন কারো সাধ্য নেই করোনাকে প্রতিহত করার। চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল যেমন কোনো সমাধান নয়, তেমনি নির্ধারিত সময়ের চাইতে বেশি সময় ধরে একজনের কাছ থেকে সার্ভিস নেওয়াটাও সঠিক নয়। সময় থাকতেই সমগ্র দেশে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হোক। চায়না, ইতালির মতো উন্নত দেশগুলো যেখানে হিমশিম খেয়ে গেছে, সেখানে সময় থাকতে থাকতে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভয়াহ বিপর্যয় নেমে আসবে।

চিকিৎসকরাও মানুষ, তারা অমর অক্ষয় নন। তারাও সংক্রমিত হন। সবাই সরে গেলেও চিকিৎসকরা তাদের দায়িত্ব পালন করে যায়। তারা জীবন বাজি রেখে দায়িত্ববোধ থেকেই চিকিৎসা দিয়ে যায়।

দেখলাম, সমন্বিতভাবে হাততালি দিয়ে চিকিৎসায় নিয়োজিত যোদ্ধাদেরকে সম্মান জানাচ্ছে সমগ্র ইতালিবাসী। অত শত আশা করি না, পার্সোনাল প্রোটেক্টটিভ ইকুইপমেন্টসর সুব্যবস্থাটা তো অন্তত করা উচিত। দিনশেষে যে ক্ষতিটা হবে, তারা নিজেরা, তাদের পরিজন বা তাদের থেকে অন্য রোগীরা যখন আক্রান্ত হবে, সেই দায়ভার আসলে কার হবে? কিসের জন্য অপেক্ষা করছি, মৃত্যুর মিছিল বইলে তবে টনক নড়বে?

লেখক: ডা. রাফা বিনতে নূর, এমবিবিএস, এমসিপিএস।









Leave a reply