কী বার্তা নিয়ে এলো বাংলা নববর্ষ?

|

উপমা মাহবুব:

আজ পহেলা বৈশাখ। লকডাউনের কারণে গৃহবন্দী জীবন শুরু হওয়ার পর থেকে আজকেই মনটা সত্যিকার অর্থে খুব খারাপ লাগছে। এ রকম পহেলা বৈশাখ জীবনে এর আগে আর কখনো আসেনি। আজ মনে পড়ছে সেই বহু বছর আগে পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে বোমা হামলা হওয়ার ঘটনা। সারাদেশ সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবারের পহেলা বৈশাখ সেই ঘটনার আকস্মিকতাকেও হার মানিয়েছে।

পাশাপাশি আটটা বিল্ডিং-এ আমরা প্রায় চারশ পরিবার থাকি। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের দিন ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। বিশাল আয়োজন করে আমাদের এখানে মেলার আয়োজন হয়। প্রভাতফেরী, জামাকাপড়, পিঠেপুলির পশরা, বাচ্চাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাতের খাবারের আয়োজন কী থাকে না সেই মেলায়। গত বছরতো এক মাহুত হাতি নিয়ে হাজির হলেন! পহেলা বৈশাখের দিন বাসার নিচে সেই সকালে নামি, গভীর রাতে বাসায় ফিরি। অথচ আজ কোনো ঢাকের শব্দ নেই, নিচ থেকে ভেসে আসছে না শিশুদের হৈ হুল্লোড় আর বাঁশির শব্দ। পাড়া-প্রতিবেশীরা সাজগোজ করে মেলার স্টলে স্টলে ঘুরছে না। চারপাশে নিস্তব্ধতা। বাসার ভিতর বাবা-মা, স্বামী-সন্তান, ফ্রিজের মধ্যে খাবার, হাতের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধ, গল্পের বই, মোবাইল- সবই আছে। তারপরও কিছুই যেন নেই।

এতকিছুর পরও বছরের প্রথম দিন জীবনে নতুন কিছুই উপহার দেবে না তা কী হয়? তিন বছর অপেক্ষা করার পর আজ বারান্দা বাগান আলো করে ফুটেছে হলুদ চন্দ্রপ্রভা ফুল। গাছটা শুধু লকলক করে লম্বা হচ্ছিলো। কতদিন মনের দুঃখে ভেবেছি গাছটা তুলে ফেলে দেই। গাছের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা থেকে পারিনি। গাছের ডালে দুলে দুলে চন্দ্রপ্রভা যেন আমার কানে কানে বলছে, জীবনে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। অপেক্ষা করো। সামনে আবারও আলোকোজ্বল, উৎসবমুখর পহেলা বৈশাখ ফিরে আসবে। ঠিক যেমন রমনা বটমূলে বোমা হামলার পরের বছর থেকে পহেলা বৈশাখের জাঁকজমক আরও বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের অংশগ্রহণ। কোনো কালো শক্তির হুমকির কাছে তখন আমরা মাথা নোয়াইনি বরং আরও বেশিমাত্রায় উৎসবে মেতেছি। আজ পৃথিবীব্যাপী এক মহাসংকটের আঁধার নেমেছে। জানি, তার বিরুদ্ধেও শেষ পর্যন্ত জয় আমাদেরই হবে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। দাঁতে দাঁত কামড়ে ক্রান্তিকালটুকু পার করতে হবে।

আমার কন্যা গতকাল শুভ নববর্ষ লিখে পোস্টার বানিয়েছে। শাড়ি রেডি করে রেখেছে বিকেলে পরবে বলে। বাসায় থাকলেই সত্যিকার অর্থে বোঝা যায় যে শিশুরাই আমাদের জীবনের সব আনন্দের উৎস। আজ আমরা দুপুরে পান্তাভাত খেলাম। সারাদেশের হাজার হাজার মানুষ লকডাউনের পর থেকে না খেয়ে আছে। এই সংকটকালীন সময়ে এমনিতেই কারো খাবারের তালিকা বড় হওয়া উচিত নয়। তাই চিন্তা করে দেখলাম, পান্তাভাত, একটা ভর্তা আর একটু মাংস- এই আইটেম আজকের দিনে আমাদের জন্য বড় লোকের বিলাসিতা নয়, বরং এটা একই সঙ্গে পহেলা বৈশাখ পালন আর খাবারের বিষয়ে মিতব্যয়ী থাকার যুগলবন্দী সুযোগও বটে।

টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে এক চ্যানেলে এসে আটকে গেলাম। একজন ডাক্তারের সাক্ষাৎকার দেখাচ্ছে। তিনি করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। গত একমাস তিনি বাড়ি যান না। কী সুন্দর করে তিনি বললেন, এখনকার পরিস্থিতি তরুণদের জন্য দেশ ও মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সুযোগ। এ রকম অসাধারণ সুযোগ সবসময় আসে না। তিনি জানালেন খুব আনন্দের সঙ্গে তিনি সুযোগটি গ্রহণ করেছেন। ফোনে বাসার সঙ্গে কথা বলার সময় সন্তানরা তার জন্য কাঁদে। তারপরও বুকে পাথর বেঁধে তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। উনার কথা শুনে মনটা গর্বে ভরে গেলো। মনে হলো, প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ তো হাসিগানে মেতে থাকার বার্তা নিয়ে আসে। এ বছর কী সে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করার বার্তা নিয়ে এলো? আমাদের কী সে ডাক দিয়ে বলছে, এসো, দেশের মানুষকে করোনার ভয়াবহ থাবা থেকে বাঁচাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো? এ রকম সুযোগ হয়ত সারা জীবনেও আর পাবে না।

প্রতিবছর তো আমরা বৈশাখকে অনুরোধ জানাই সব দুঃখ, কষ্ট, কালিমাকে মুছে দিয়ে সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধিতে আমাদের জীবনকে ভরিয়ে দিতে। আমরা সুর তুলি, তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক। এসো এসো।’ এ বছর যেন পহেলা বৈশাখ উল্টো আমাদের ডাক দিয়ে বলছে –

দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে!
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার।।
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ-
ছিঁড়িয়াছে পাল কে ধরিবে হাল, কার আছে হিম্মত।
কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত,
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।।

আপনার প্রতি বাংলা নববর্ষ ১৪২৭- এর এই উদাত্ত আহবান আপনি শুনতে পাচ্ছেন তো? ঘরে বসে আর্থিক সহায়তা করার মাধ্যমে হোক অথবা বাহিরে বের হয়ে এসে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে হোক, দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এটাই কিন্তু শ্রেষ্ঠ সময়। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

লেখক: কলাম লেখক এবং উন্নয়নপেশাজীবী।









Leave a reply