অবরুদ্ধ সময়ে পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার উপায়

|

পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য

অবরুদ্ধ সময়ে ঠিক রাখতে হবে পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য

মৌলি ইসলাম:

আণুবীক্ষণিক এক ভাইরাস বদলে দিয়েছে গোটা পৃথিবীর চিত্র। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে যে অবরূদ্ধ পরিস্থিতি চলছে, তার কথা আমরা কখনো ভাবিনি। তাই, সময়টা কীভাবে কাটানো যায়, সে প্রস্তুতিও ছিল না। সবাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যু নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু, একবারও কী ভাবছেন- প্রতিদিন তিলে তিলে আপনি বা আমি মানসিকভাবে মারা যাচ্ছি। অবসাদ, হতাশা, ক্লান্তি আমাদের কুড়ে-কুড়ে খাচ্ছে!

কীভাবে মানসিক বিপর্যয় কমানো সম্ভব? পরিবারের বিভিন্ন বয়সের মানুষকে অবসাদ থেকে কিছুটা হলেও দূরে রাখার উপায় কী? এ নিয়েই এই লেখাটি।

প্রবীণ
শারীরিক অসুস্থতা বা বয়সের কথা চিন্তা করলে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে পরিবারের গুরুজনরা। আর, তাদের চলাফেরা মসজিদ বা পাড়ার অন্যান্য সমবয়সীদের সাথে আড্ডা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই অবরূদ্ধ সময়ে তারা হাটতে যেতে পারছেন না। ঘরের চার দেয়াল অসহ্য হয়ে উঠছে। কিন্তু, সেটা প্রকাশও করতে পারছেন না। আসুন, তাদের সাহায্য করি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিচের উপায়গুলো অবলম্বন করা যেতে পারে।

১. ছোট ছোট কাজে সাহায্যের জন্য বলি। এতে তারাও বুঝবেন, পরিবারে তারা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েননি।

২. গুরুজনদের মুখে তাদের সময়কার গল্প, সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনীতি, অর্থনীতি, পারিবারিক নিয়মকানুন সম্পর্কে জানতে চান। হলফ করে বলতে পারি, শিশু বা আপনাদের অভিজ্ঞতার বহরটাই বাড়বে

৩. শিশুদের তাদের সাথে খেলার জন্য বায়না ধরতে বলুন, গল্প শোনাতে বলুন। অসুস্থ না থাকলে, তারা খুশিই হবেন।

৪. নতুন গেজেট ব্যবহার শেখাতে পারেন। কীভাবে অনলাইনে খবর পড়া যায় বা দেখা যায়, সেটা দেখিয়ে দিন। তাদের নামেই ফেসবুক আইডি খুলে দিন। সবাইকে সংযুক্ত করুন।

৫. যাদের বাবা-মা দূরে থাকেন, তারা মোবাইলে খোঁজ-খবর নেয়ার মাত্রাটা বাড়িয়ে দিন। জানুন, অভিভাবক কী করছেন? তাদের শারীরিক অবস্থা কেমন?

৬. জরুরি প্রয়োজনে তাদের সাহায্য করতে পারেন, এমন মানুষগুলোর সাথেও কথা বলুন। দিনে অন্তত একবার খোঁজ নেয়ার অনুরোধ জানান।

৭. খাবার, ওষুধ, নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কী লাগবে, কী শেষ হয়ে গেলো- সেটার খোঁজ রাখুন। সেগুলো কীভাবে তাদের হাত পর্যন্ত পৌছে দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা রাখুন।

একটা কথা ভুলে যাবেন না, তাদের জন্যই আজ আপনি বা আমি এ অবস্থানে। সুতরাং, অভিভাবকদের অস্বীকার করার মানে নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা।

শিশু
১. মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, টেলিভিশন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন। এই সময়টাতেই গড়ে তুলতে পারেন ‘বই পড়ার অভ্যাস’।

২. ছবি আঁকতে দিন। সেসবের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিন। প্রশংসা করুন।

৩. প্রার্থনা, সুরা-কোরআন পড়া শেখান।

৪. গান, ছড়া, নাচ শেখান। বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখান।

৫. হ্যান্ডিক্রাফট বানাতে সাহায্য করুন। বলুন, স্কুল খুললেই বন্ধুদের সাথে দেখা হবে। তাদের ছোট গিফট বা কার্ড দিয়ে চমকে দিতে পারে- ছোট্ট শিশুটি।

৬. দাদা-দাদি, নানা-নানির সাথে তাদের বন্ধুত্বটা বাড়তে দিন। ছোট ছোট কাজে বড়দের সাহায্য করতে বলুন।

৭. নিজের প্লেট, বাটি, চামচ ধুতে বলুন। টেবিল সাজাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিন।

৮. ঘরোয়া খেলার সাথে পরিচয় করান। প্রয়োজনে নিজেরা সেসব বানিয়ে দেখান, কীভাবে খেলতে হয়। এর ফলে, বিলুপ্ত প্রায় খেলার সাথে শিশুদের পরিচয় ঘটবে (উদাহরণ- বাগাডুলি, কড়ি খেলা বা কাগজ দিয়ে বানানো নানা খেলা)

ছোট্ট শিশু মানেই কৌতুহলী মন। তার প্রশ্নের সঠিক জবাব দিন। তাকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু জানান।

পুরুষ
বাসার কর্তা ব্যক্তিটি হঠাৎ করেই রাজ্যের কাজ ছাড়া, বাসায় বসে বিরক্ত হয়ে উঠতে পারেন। তাদের জন্য রয়েছে কিছু টিপস-

১. পরিবারকে সময় দেয়ার এটাই মোক্ষম সুযোগ। সেটা হাতছাড়া করবেন না। গেজেট পাশে সরিয়ে, তাদের সাথে প্রাণ খুলে গল্প করুন।

২. আপনার সন্তানের সাথে গল্প করুন, খেলা করুন।

৩. সাধ্যমতো মা, বোন, স্ত্রীকে বাসার কাজে সহযোগিতা করুন।

৪. আপনার পুরানো কোনো শখ থাকলে, সেসবের চর্চা করতে পারেন। (লেখালেখি, আঁকা, গান, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি)

৫. বাসার গুরুজনের সাথে গল্প করুন। সবসময় সমস্যা নিয়ে কথা না বলে, অন্যান্য চর্চাও করতে পারেন।

৬. শখের বশে এক/আধটা দিন রান্নাও করতে পারেন। তাতে, সবাই বেশ মজাই পাবে।

৭. মোবাইল বা ভিডিও কলে প্রবাসী আত্মীয়-স্বজন বা পুরানো বন্ধুদের সাথে কথা বলতে পারেন। তাতে, তারাও খুশি হবেন।

৮. নিয়মিত বাড়িতে নামাজ-রোজা করুন। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা সে অনুযায়ী প্রার্থনা করুন।

গৃহিণী
আপনার মনে হতেই পারে- সংসার, সন্তান লালনপালন আর রান্নাঘরেই জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেলায় নিত্য নতুন খাবারের আবদারে প্রাণ ওষ্ঠাগত। যার কারণে, মেজাজটাও হয়ে যাচ্ছে খিটখিটে। তার থেকে পরিত্রাণের উপায়টা কী?

১. ব্যক্তি মানুষটাকে সময় দিন। একান্তই নিজের জন্য সময় বেছে নিনি। এক কাপ চা হাতে দুপুর বা বিকালে বারান্দায় বসতেই পারেন।

২. গান-কবিতা শুনুন। রান্নাটা করতে করতেই না হয় গুনগুন করে দু-এক কলি গান করুন।

৩. পুরানো শখগুলোকে ঝালাই করুন। লেখালেখি, ছবি আঁকা, গান, সেলাই, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি।

৪. পরিবারের সবাই মিলে যখন আড্ডা দিবেন, সেসময় নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন। আপনারটা শুনতেও অন্যরা আগ্রহী হবে।

৫. নিজে গুছিয়ে থাকুন। অন্যরা যখন প্রশংসা করবে, তখন মন ভালো থাকবে।

৬. নিয়মিত প্রার্থনায় মনোযোগ দিন। ইয়োগা করার চেষ্টা করুন। মন শান্ত হবে।

৭. সারাদিন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটারে কী হলো….তা ভুলে গিয়ে বই পড়ুন। সিনেমা দেখুন।

কারণ, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। আপনি যদি ভালো থাকেন, ভালো থাকবে গোটা পরিবার। তারজন্য, অবশ্যই বাকি সদস্যদেরও সহযোগিতা করতে হবে।

অবরূদ্ধ সময়টা কেটে যাবে। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ ও সাবধানে থাকুন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।









Leave a reply