যে কারণে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়

|

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ সরকারের মানবিক সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করে আসছে। তবে কিছু বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও সংস্থা রোহিঙ্গাদেরকে শরণার্থী শিবিরের বাইরে চলাচল করতে না দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। জাপান ভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান, পদক্ষেপ ইত্যাদি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেছেন, কেন সব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠাঁই দেয়া সম্ভব নয়।

সজীব ওয়াজেদ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের সহায়তা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একইসাথে তাদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সম্প্রতি দুই দেশ সম্মত হয়েছে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোকে সম্প্রসারিত করা হয়েছে, নতুন করে অনেক ক্যাম্প বানানো হয়েছে। সরকার রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ঠিক মতো ত্রাণ বিতরণের জন্য নিবন্ধন করছে। বাংলাদেশের এসব উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশ সফরে আসা পোপ ফ্রান্সিসসহ বিশ্বনেতারা।’

‘এত কিছু করার পরও রোহিঙ্গাদের চলাচল শরণার্থী শিবিরের মধ্যে সীমিত রাখা ও তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ না দেয়ায় অনেকে বাংলাদেশের সমালোচনা করছেন। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দিতে না পারা এবং শিবিরের বাইরে যেতে না দেয়া- কোনোটিই রোহিঙ্গাদের প্রতি সরকারের আন্তরিকতার অভাবের কারণে করা হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়েই এই নীতি নেওয়া হয়েছে’, লিখেছেন সজীব ওয়াজেদ।

তিনি লিখেছেন, ‘রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। আইএস ও আল কায়েদার সঙ্গে আরসার যোগসূত্র থাকলেও তারা তা অস্বীকার করে এবং রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছে বলে দাবি করে থাকে। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের স্রোতের সঙ্গে সশস্ত্র আরসা সদস্যরাও ঢুকে পড়েছে। এতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরগুলো উগ্রবাদের চারণভূমি হয়ে উঠতে পারে। এটাই বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য শঙ্কার বিষয়।’

বাংলাদেশে আরসার উপস্থিতি বাড়ছে এবং ক্যাম্পে থাকা তরুণদেরকে দলে ভেড়ানো আশঙ্কা রয়েছে- সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন তথ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সজীব ওয়াজেদ লিখেছেন, ‘এ কারণেই রোহিঙ্গাদের স্বাধীনভাবে সারাদেশে চলাচল করতে দিতে পারে না বাংলাদেশ। মিয়ানমার সীমান্তে কিংবা বাংলাদেশের ভেতরেই সন্ত্রাসী হামলার জন্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে না— সেই নিশ্চয়তা তো সরকার দিতে পারে না।’

তিনি লিখেছেন, ‘এর আগে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে শরণার্থীর মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে স্থায়ীভাবে আশ্রয় দিলে তা এক ধাক্কায় দেশের জনসংখ্যা এক শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। এই সংখ্যাকে খুব বড় মনে না হলেও একই ধরনের জনসংখ্যার স্রোত অনেক দেশেই অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা অর্থনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তরে বসবাস করছেন, যেটা বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।’

প্রধানমন্ত্রী পুত্র লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের জিডিপি ৭ শতাংশ হলেও আমরা ধনী দেশ নই। এই দেশের পক্ষে রোহিঙ্গাদের স্বল্পমেয়াদে সহায়তা করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দিলে তা দেশের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে যে অগ্রগতি দেখিয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হবে।’

বর্তমান আইনেও অভিবাসী বা শরণার্থীদেরকে নাগরিকত্ব দেয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে সজীব ওয়াজেদ লিখেছেন, ‘রোহিঙ্গা ছাড়া বাংলাদেশে আর কেউই অভিবাসী হিসেবে আসতে চায় না। ফলে উন্নত দেশগুলোতে অভিবাসনের জন্য যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা বাংলাদেশের নেই। তাছাড়া বাবা-মা বাংলাদেশি না হলে কিংবা বাংলাদেশি কাউকে বিয়ে না করলে এখানে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে জন্ম নিলেও নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে, অভিবাসী কিংবা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কোনও আইনি সুযোগ নেই।’









Leave a reply