কবিতা-প্রবন্ধে গালিবের দুই

|

শূন্য দশকের আন্যতম শক্তিশালী কবি সোহেল হাসান গালিব। এবার বইমেলায় মিলবে তার দুটি বই। একটি কবিতার অন্যটি প্রবন্ধের। তিমিরে তারানা শীর্ষক কবিতাগ্রন্থটিতে সাম্প্রতিক সময়ে লেখা বেশ কিছু কবিতা স্থান দিয়েছেন কবি। বইটি প্রকাশ করেছে অগ্রদূত এন্ড কোং। একই প্রকাশনী থেকে আসছে ‘বাদ মাগরিব’। এই গ্রন্থটি ভাষা ও ভাষার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক মানসিকতার উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন গালিব।

একই মেলায় দুটি দই, লেখক হিসেবে তাই যথেষ্ট খুশি সোহেল হাসান গালিব। কবি মাত্রই সংবেদনশিল মানুষ; ভাষা নিয়ে কারবার। গালিবের কাব্যভাষায় নতুন পালক যোগ করেছে তিমিরে তারানা। এই বইটির তাৎক্ষণিক পাঠ প্রতিক্রিয়ায় শূন্য দশকের আরেক কবি রাশেদুজ্জামান বলেছেন- ‘সুরের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে অর্থহীনতার প্রবাহ দিয়ে অর্থকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া আছে তারানায়। গালিব তারানার পটভূমি হিসাবে নিয়েছেন অন্ধকারকে, মানে শূন্যকে—যার মধ্যে কিছু নেই, কিন্তু সবই আছে একসঙ্গে। গ্রন্থনামের মধ্যে তাই বিপুল স্বাধীনতা ব্যবহারের ইঙ্গিত আছে। শুধু শব্দ বা অনুষঙ্গই নয়, বিচিত্র চিন্তাকেও মিলিয়ে দিয়েছেন গালিব। ফুল তাই পেট্রোলিয়ামের সুবাস ছড়িয়ে দোলেই না শুধু, পাঠকের অনুমানকেও নস্যাৎ করে চলে। গালিব ছন্দের আঁটো কাঠামোতে যেমন নিজেকে প্রসারিত করেছেন, তেমনি ছন্দের মুক্ত পদক্ষেপেও পরিসীমা বাড়িয়ে নিয়েছেন—প্রবাহ কখনই স্বচ্ছলতা হারায় নি। এ জন্যই তারানা, যেখানে অপার স্বাধীনতা ও ছক গড়ার খেলা চলমান—অর্থকে সঙ্গে নিয়েছেন, চিন্তাকেও; কিন্তু প্রয়োজনে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে পথের পাশে ছেড়ে আসতে কসুর করেন নি। তারপরও বলব, কবি এ কবিতাগুলোতে উদ্ধত নন, কিংবা নন দুর্বিনীত; বরং নিজের দিকে মর্মের পানে তাকিয়েছেন নম্র গভীর চোখে, যেন কিছুটা অভিমানাহত। এখানেই কবি ও কবিতার বিজয়, পাঠকেরও।’

 

যমুনা’র পাঠকদের জন্য তিমিরে তারানা তিনটি কবিতা তুলে দেয়া হলো।

 


যোজনগন্ধা


.
মৎস্যগন্ধা থেকে যোজনগন্ধা
একটি উত্তাল সঙ্গমের ব্যবধান।

যত নিঃশব্দেই জ্বলে উঠুক, সুগন্ধমাত্র
সতীত্বমোচনের অপূর্ব কটাক্ষ—
সাক্ষী যমুনাজল, টালমাটাল
জীবনের খেয়া।

তবু কোন পুরুষ নির্বাচিত করে বেশ্যাকে
তার পুত্রের জননী বলে?

সম্ভবত পরাশর জানে।

১৯ ক্যারট গোল্ডের এই পঙ্‌ক্তির ভেতর
কত ভরি পুরুষতন্ত্র লুকানো
তা মীমাংসার আগে আমাদের জানা দরকার
সম্ভোগের আহ্বান থেকে
পিতাডাকের দূরত্ব ক’ নটিকেল?

সূর্যগ্রহণ যদি দেখতেই হয়
নেপচুনে গিয়ে দেখব।
কিন্তু এও সত্য, দেখা মানে দূরবিন,
দৃশ্য মানেই ক্যামেরা।

স্বীকার করা ভালো, লেন্সের ভিতর দিয়ে
যাকে অনুসরণ করে এতদূর এসেছি
সে তোমার নিয়তি নয়,
তার নাম বিস্মৃতি।

 


সানাই


.
সমকামীদের বিয়েতে কি দেনমোহরের ব্যবস্থা থাকবে?

সুবহে সাদিকের সামান্য পর
এই প্রশ্ন আমাকে করেছিল পেয়ারা গাছের ডালে বসা
এক দোয়েল পাখি

পাখিটিকে খুবই চিন্তিত মনে হলো
মনে হলো সারারাত ঘুমায় নি সে

অথচ আমি তাকে কিছু ভাবনা ধার দিতে চেয়েছিলাম

এই যেমন আমাদের ভারতীয়তা, এই যেমন প্রমিত ভাষা
ইসলামি জঙ্গিবাদ ও খ্রিস্টানি মিডিয়া-সন্ত্রাস

কিংবা মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র
ভিশন টুয়েন্টি…

অথচ সেহেরির সময় থেকে
সে কেবলই পেয়ারার পাতা চিবুচ্ছে

আর অপেক্ষায় আছে

ভোর হলেই কখন ঢুকে পড়বে
পৃথিবী নামক বিবাহমণ্ডপে

আমিও তাই আজানের পর থেকে
ইউটিউবের মিউজিক টানেলে বসে একা
বাজিয়ে চলেছি

বিসমিল্লাহ খানের সানাই


আত্মা


.
কবরের ’পর দিয়ে হেঁটে হেঁটে কেউ যদি ফের চলে আসে
ভোরবেলা নগ্নপায়, সেই ভয় চুপিচুপি জ্বলে রত্নদীপে
আমার সমস্ত রাত্রি।

রাত্রি কি নিঃসঙ্গ এক বাদুড়ের নাম,
হৃদয়, মৃতের মুশায়েরা?

পাতালে সুড়ঙ্গ আছে, চাতালে ময়ূরশয্যা।

সুড়ঙ্গের এই শেষ মাথায় এসেই জানলাম,
অসমাপ্ত পৃথিবীর পথ।

বুঝেছি, নিষ্কৃতি নয়,
ছাতিম গাছের নিচে বসে, তুমি হে মৌনী, সেদিন
নিষ্ক্রান্তিই চেয়েছিল তবে!

কার থেকে? প্রেম আর প্রত্যাশার ফাঁকগুলো আজ
দাও যদি ভরিয়ে, গলিয়ে দেহমোম

আমি তবে সে তাড়নাপুষ্প হয়ে ফুটি।

 









Leave a reply