মহামারির ছায়া মাড়িয়ে বিজয়ের ৫০

|

অঙ্কন- প্রমিতি লেখা।

মহামারির কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন গোটা বিশ্ব; ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা এশিয়া- প্রকম্পিত স্বজন হারানোর আর্তনাদে; তবু এরই মাঝে আজকের দিনটি গৌরবময় এক আবহে পার করবে বাংলাদেশ। কারণ আজ মহান বিজয় দিবস। কোটি মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংগ্রামের বিনিময়ে এ দিনটি বিজয়ের পরম আনন্দ নিয়ে এসেছিল বাঙালির জন্য, বাংলাদেশের জন্য। সেই গৌরব আরও তীব্র মাত্রা পায় যখন তথাকথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ৫০ বছরে পদার্পণের উল্লাসে মাতে বাংলাদেশ।

বিজয় দিবস গোটা জাতিসত্তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাসের সেই পাটাতনে, যেখানে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাকহানাদার বাহিনী। এদিনে ইতিহাসের সেই ক্ষণকে স্মরণ করে এ ভূমির মানুষ যে মাহেন্দ্রক্ষণে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। অসংখ্য অতৃপ্তি, অপ্রাপ্তির বেদনা ছাপিয়ে বিজয়ের এক অবর্ণনীয় সুখানুভূতিকে চর্চা করছে বাংলাদেশের মানুষ।

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা অকুতোভয় বীর সন্তানদের গভীর বেদনা ও পরম শ্রদ্ধায় আজ স্মরণ করছে জাতি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সম্ভ্রম হারানো নারীদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের মানুষ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের ভাষণ আর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জাগরণী গানে মুখর হবে পাড়া-মহল্লা, গলি থেকে রাজপথ।

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের মুক্তির সংগ্রাম ও একাত্তর সালের ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথ বেয়ে এসেছে বাঙালির বিজয়। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানে ১৯৪৭ সালেই বাঙালির ওপর প্রথম আঘাত এসেছিল। রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন পাকিস্তানি শাসকেরা। ১৯৫২ সালে বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে বাংলার বীর সন্তানেরা মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধিকারের চেতনার যে স্ফুরণ ঘটেছিল, কালক্রমে তা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্য, যার কাছে যা আছে, তা-ই নিয়ে সবাইকে প্রস্তুত থাকার জন্য বলেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে একাত্তর সালের ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশ।

সুখের সাথে মিলেমিশে থাকে বেদনা। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। সেই ক্ষত বয়ে বেড়ানো পরিবারগুলোকে আজ আনত মস্তকে শ্রদ্ধা জানাবে জাতি। শ্রদ্ধা জানাবে স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রতি।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে আমরা বহু প্রতীক্ষিত বিজয় অর্জন করি। বিজয়ের এই আনন্দঘন মুহূর্তে আমি দেশবাসী ও প্রবাসে বসবাসরত সকল বাংলাদেশিকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন। মহাকালের ইতিহাসে স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। এ অর্জন আমাদের এনে দিয়েছে একটি সার্বভৌম দেশ, স্বাধীন জাতিসত্তা, পবিত্র সংবিধান, নিজস্ব মানচিত্র ও লাল-সবুজ পতাকা। তবে তা একদিনে অর্জিত হয়নি। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৫০-তম মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আমি দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সেইসব দেশ ও ব্যক্তিবর্গের প্রতি যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহায়তা দিয়েছেন। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা, ত্রিশ লাখ শহীদ, সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোন এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের-কে, যাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

এদিকে, মহান বিজয় দিবসে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি জানানো হয় রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা। ভোর ৬টা ৩৪ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রথমে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন করেন- প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। এছাড়া, তিন বাহিনী প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর জনসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ঢল নামে সর্বস্তরের মানুষের।









Leave a reply