প্র্যাকটিসের জন্য হনুমাকে পিচ বানিয়ে দিয়েছিলেন তার মা

|

জাতীয় দলে প্রায় আড়াই বছর আগে সুযোগ পেলেও ঠিক সেভাবে নিজের জাত চেনাতে পারেননি হনুমা বিহারী। শুধুই একটি ভালো সুযোগের অপেক্ষায় থাকা হনুমা সিডনি টেস্টই বেছে নিয়েছিলেন নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে। সে প্রমাণ তিনি দিয়েছেন, সাথে দেশকে বাঁচিয়েছেন হারের লজ্জা থেকে।

অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের সামনে ব্যাট হাতে কঠিন এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হনুমা। অজিদের সিডনি জয় শুধুই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যখন। ঠিক তখনই ১৬৩ বলে ২৩ রানের যে ইনিংসটি খেলেছেন হনুমা সেটি সেঞ্চুরি বা ডাবল সেঞ্চুরির চাইতেও অনেক বড় অর্জন। এর অন্যতম কারণ এই ইনিংসটিই হতাশ করেছে অস্ট্রেলিয়ানদের, আর সম্মান বাঁচিয়েছে ভারতীয়দের। আর আলোকিত হয়েছে টেস্ট ক্রিকেট।

১৯৯৩ সালের ১৩ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়ায় জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেটারের পুরো নাম গড়ে হনুমা বিহারী। খুব সাধারণ ঘরে জন্ম নেওয়া হনুমা মাত্র ১২ বছর বয়সে হারিয়েছিলেন বাবাকে। খুব সাধারণ চাকরি করা বাবার অবর্তমানে সংসারের হাল ধরতে কাজ শুরু করেন তার মা বিজয়লক্ষ্মী। হায়দ্রাবাদে একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি নিয়ে জীবন যুদ্ধ শুরু করেন মা। মাত্র চার বছর বয়সে ক্রিকেটে হাতে খড়ি হয় হনুমার। বলতে গেলে আজকে যে তার অবস্থান সেটির জন্য একাই লড়াই করেছেন হনুমার মা বিজয়লক্ষ্মী। অল্প বয়সেই ছেলের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন হনুমার বাবা। তার অকালপ্রয়াণে যাতে ছেলের ক্রিকেট বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে বেশ সতর্ক ছিলেন বিজয়লক্ষ্মী। স্বামী সত্যনারায়ণের মৃত্যুর পরে তার অফিস থেকে বেশ কিছু টাকা পেয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে ছেলের ক্রিকেট অনুশীলনের জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন পিচ।

রাহুল দ্রাবিড় এবং রামকৃষ্ণণ শ্রীধরার মত প্রশিক্ষকদের কাছে ক্রিকেট শিখেছেন এই তরুণ। আর তাদের প্রশিক্ষণেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ অলরাউন্ডার হিসেবে। ২০১০ সালে হনুমার আভিষেক হয় ঘরোয়া ক্রিকেটে। ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতেন এই অলরাউন্ডার। এরপর ১০১৩ সালেই আইপিএলে নাম লিখিয়ে খেলেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ও দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে। ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের এই সদস্য জাতীয় দলে প্রবেশ করেন ২০১৮ সালে। নিজের প্রথম টেস্টে প্রতিপক্ষ ছিলও ইংল্যান্ড। ১১ টেস্টে ৩৩.৮৮ গড়ে রান করেছেন ৫৯৭। লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটে ব্যাট হাতে তার সর্বোচ্চ ইনিংস ১১১ রানের।

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও টি-টোয়েন্টিতে এখন পর্যন্ত ভারতের জার্সি গায়ে তুলতে পারেনি এই অলরাউন্ডার। ঘরোয়া ক্রিকেটে রেকর্ডের দিক থেকে সেরা হনুমার কাছে ক্রিকেট আদর্শের নাম শচীন টেন্ডুলকার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার গড় ৫৯.৪৫।

অজিদের বিপক্ষে এই সিরিজেই একেবারেই ছন্দে ছিলেন না হনুমা। তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ভারতকে বাঁচাতেই নিজেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন শুধু মাত্র দেশের মানুষ ও সম্মানের কথা চিন্তা করে। তাইতো ইনজুরিকে পাত্তা না দিয়ে ব্যাট হাতে মাঠে নেমে পড়েন এই ক্রিকটার। তার এই কীর্তি এখন জানো পুরো বিশ্ব। ব্যাট হাতে তার সাথে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভারতের আরেক স্পিনার অশ্বিন। শরীরের সর্বাঙ্গে আঘাত পেয়েও দাপটে ব্যাটিং করে গেলেন ‘বোলার’ অশ্বিন। চাপের মুখে অশ্বিন-হনুমার দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ পরাজয়ের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলো ভারতকে। ব্যাট হাতে অশ্বিন করেছেন ২৮ বলে ৩৯ রান। তাদের দুজনের এই প্রতিরোধ টেস্ট ক্রিকেটে অন্যতম লড়াইয়ের মর্যাদা পাবে যতদিন ক্রিকেট থাকবে বিশ্বে। ভারতীয় দলের অতীতের দুর্ভেদ্য ও হনুমার গুরু রাহুল দ্রাবিড়ের জন্মদিনে নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন লড়াকু মায়ের লড়াকু ছেলে।

আজকের এই পজিশনের জন্য কৃতিত্বের পুরোটুকুই দিয়েছেন মাকে। তার ভাষায় ঝড়বিধ্বস্ত জীবনের সঙ্গে লড়াই করে মা তার পাশে থেকেছেন সব সময়ই। ভারতীয় ক্রিকেটের লড়াকু তারকার মা বলছেন, হনুমা শুধুই পালন করেছেন দেশের দায়িত্ব।









Leave a reply