কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া প্রয়োজন?

|

ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন:

গত মার্চ থেকে সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ। করোনা প্রতিরোধে সেটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং জনস্বাস্থ্য গবেষক হিসেবে সেসময় সোচ্চার ছিলাম। মার্চের শুরুর দিকে সন্তানদের স্কুলের ম্যানেজমেন্টকে অনুধাবন করাতে সক্ষম হয়েছিলাম কোভিডের  বিষয়টি। ঢাকার সেই প্রাইভেটস্কুল স্টুডেন্টদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সম্ভবত প্রথমে স্কুল বন্ধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে।

করোনার শুরুতে মানুষ অত্যন্ত আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। এ কারণে দেখা গেছে লাশ ফেলে রাখতে, সন্তানরা চলে গেছে বাবা-মাকে রেখে। গ্রাম থেকে কোভিড রোগী সন্দেহে পরিবারকে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সবার মধ্যে একধরনের মৃত্যুর আতঙ্ক জেঁকে বসেছিল। সঙ্গত কারণে লোকজন কিছুদিন ঘরে অবস্থান করে। গত ঈদুল ফিতর থেকে বড় রকমের পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়।

গুগলের মোবিলিটি ডাটা অনুযায়ী দেখা যায় মানুষের বাইরে চলাফেরা করোনার শুরুর আগে যেমনটি ছিল বর্তমানে সে অবস্থায় চলে এসেছে (ছবিতে দেখুন, খেয়াল করুন শুরু এবং শেষের দিকে যাতাযাতের অবস্থা বা ট্রেন্ড)।

মাসভিত্তিক মানুষের সক্রিয়তার গ্রাফ (করোনার লকডাউন শুরু থেকে জানুযারি পর্যন্ত) বিভিন্ন ধরনের মুভমেন্ট বা সক্রিয়তা  (অফিস, বাজারঘাট, বিনোদন সংক্রান্ত) চিত্র ফুটে উঠেছে। স্মার্টফোনের উপর ভিত্তি করে গুগল বিশ্বব্যাপী মোবিলিটি ডাটা সংগ্রহ করে।

মানুষের মেলামেশা, বাইরে যাওয়া, বাজারে যাওয়া বন্ধ নেই। ছবির সবুজ লাইনটি হচ্ছে ঘরে আবদ্ধ থাকা মানুষের মোবিলিটি বা সক্রিয়তা। সব কিছু স্বাভাবিক লেভেলে এসেছে বলে সেইলাইনটি ক্রমাশ অবনমিত হয়েছে।

করোনা আক্রান্ত অন্যান্য দেশগুলো কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিচ্ছে?

করোনা মাহামারি নিয়ে যে সমস্ত দেশ আলোচনায় এসেছে যেমন- ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলসহ অনেক দেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এসব দেশ পর্যাক্রমিক (ফেইজ বাই ফেইজ) খুলে দিচ্ছে। অনলাইন সার্চ করলে সহজে এসব তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশেরও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে।

দেশে অনলাইনের শিক্ষা কি ঠিকমত চলছে?

ঢাকার অনেক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান (বিশেষ করে বেসরকারি) অনলাইনের সিস্টেম প্রায় রপ্ত করে ফেলেছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে অনলাইনে ঠিকমত ক্লাস হচ্ছে না বিভিন্ন সমস্যার কারণে। তাছাড়া গ্রাম পর্যায়ে তেমন কার্যক্রম নেই। এতে শিক্ষকরাও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। শিক্ষার্থীরাও বখাটেপণারদিকে ঝুঁকে পড়ছে, হতাশাগ্রস্ত হয়েওপড়ছে। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম না থাকার কারণে অনেক বেসরকারি স্কুল (বিশেষ করে কিন্টার্গার্টেন লেভেলে) বন্ধ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ঠিকমত বেতন পাচ্ছেন না; অনেকের জব চলে গেছে। অনেক স্কুল চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের প্রায় ৭০ ভাগ গ্রামাঞ্চলে বাস করে। তাদের অবস্থা বা মনোভাব পত্রিকায় বা সোস্যাল মিডিয়াতে তেমন পাওয়া যায় না। দেশের এই বড় অংশকে বঞ্চিত করে পলিসি গ্রহণ করা কি ঠিক হবে?

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান কেন খুলে দেয়া প্রয়োজন?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধরাখার মূলকারনের কারণ ছিল পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদেরকে করোনা থেকে রক্ষা করা, কেননা করোনা তাদের ওপর প্রভাব মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের লোকজন চাকুরির তাগিদে, বাজারে, বেড়াতে, সালাত আদায় করতে মসজিদে যাচ্ছে। মাদ্রাসাগুলোতেও রীতিমত ক্লাস হচ্ছে। গুগলের মোবিলিটি ডাটা হচ্ছে যার প্রমাণ। করোনার ভয়ে একসময় হাসপাতালগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা আগের মত অবস্থায় ফিরে এসেছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র করোনা পূর্ববর্তীর সময়কার মত জনাকীর্ণ। অর্থাৎ সবকিছু প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আমরা কি কিছু অর্জন করতে পারবো? এতে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত কি হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে না? দেশের বড় একটি অংশ কি বঞ্চিত হচ্ছে না? গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে যারা পড়াশুনায় ফিরতে পারবে না। যদিও নির্দিষ্ট বয়সের আগে বিয়ে হওয়ার কথা নয়, কিন্তু তা অহরহ হচ্ছে যেমনটি দুর্নীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক স্টুডেন্ট গার্মেন্টস, কৃষিকাজ এবং ব্যবসায় জড়িত হওয়ার কারণে পড়াশুনায় তারা আর ফিরবে না। দেশে পলিসি হওয়া উচিত তথ্য-ভিত্তিক, ইমোশনের ভিত্তিতে নয়। তাই সবকিছু বিবেচনায় আনা সময়ের দাবি।

স্কুলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে পর্যায়ক্রমিকভাবে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রথমে ঢাকার বাইরের স্কুলগুলো সর্বাগ্রে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

লেখক: গণস্বাস্থ্য গবেষক, নির্বাহী পরিচালক, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। সহকারী অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।









Leave a reply