‘সন্তানদের কাছে বোঝা হয়ে মরতে চাই না’

|

জীবিত অবস্থায় সন্তানের বোঝা হয়েছি, মরার পর বোঝা হতে চাই না। আমার লাশ যেনো সন্তানের কাছে বোঝা না হয়, সে জন্য বৃদ্ধাশ্রমেই মরতে চাই। আর কবর দেয়া হোক সন্তানদের দৃষ্টিসীমা থেকে অনেক দূরে। বৃদ্ধাশ্রমেই আমরা ভালো আছি, এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই। কান্না আর অভিমানে এভাবেই বলছিলেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা নারীরা। যা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা কষ্টকর।

৮ মার্চ নারী দিবস। অন্যান্য দিনের মত হাজারো নারী যখন তাদের স্বাধীনতার জন্য জোর আওয়াজ তুলছেন তখন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা নারীরা মৃত্যু কামনা করছেন।

বৃহস্পতিবার সকালেই ছুটে যাই বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে। প্রতি বছর নারী দিবস পালন করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। চলে নানা আয়োজন। কিন্তু মনে এতোটুকু স্বস্তি নেই বৃদ্ধাশ্রমের নারীদের। হাজারো ব্যথা আর বঞ্চনা বুকে নিয়ে একা একা জীবনের শেষ দিনগুলো পার করছেন অনেক নারী।

খুব আক্ষেপ নিয়ে লীমা বলেন, নিজে না খেয়ে সন্তানকে খেতে দিতাম, অসুস্থ হলে ব্যাকুল হয়ে পড়তাম, ছটফট করতাম পাগলের মতো। বুকের ভেতরটা কেঁদে উঠতো। আমি যে গর্ভধারিনী ‘মা’! সেই মাকে সন্তান কীভাবে কষ্ট দেয়। তারা হয়তো কষ্টের বিষয়টা অনুভব করে না। আজ খাচ্ছি রুটি ভাজি, দুপুরে একটু মাছ-মাংস। কপালে যখন যা জুটছে তাই খাই।

মাধুরীর একই কথা। কি করলাম আর কাদের জন্য করলাম? প্রায় প্রতিদিনই বুকের ভেতর পাথর চাপা কষ্ট, হতাশা ও শূন্যতা নিয়ে প্রিয়জনের পথ চেয়ে বসে থাকি। কিন্তু এ পথ যেন শেষ হয় না। এখন কষ্ট ছাড়া কিছুই নেই কপালে। নারী দিবস নিয়ে মালতী কাছে জানতে চাইলে বলেন, “জীবনে নিজের কাছে পরিবারের কাছে পেটের সন্তানের কাছে আজ পরাজিত নারী আমি। আমার কি কিছু বলার থাকতে পারে? আর এ গুলো বলেই কি হবে? শুধু এটাই বলবো, সন্তানরা যে যেখানে আছে ওরা যেন ভালো থাকে, সুখে থাকে।

তারপরও খুব কষ্ট নিয়ে বললেন, ইতিহাসের পাতায় নারী দিবস উল্লেখযোগ্য দিন হয়ে থাকলেও আমাদের জন্য কোন দিন নেই। আমাদের প্রতিদিনই সমান। নারীরা সত্যি ভাল নেই। বিশ্ব, সমাজ, যুগ এগোচ্ছে। তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে নারীরা। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষের লোভ-লালসা, আর এক অদৃশ্য শক্তি মহিলাদের যেন পেছনে টেনে ধরে রেখেছে। বাধা অগ্রাহ্য করে কেউ কেউ ওপরে উঠতে পারলেও, বেশিরভাগই সেই অদৃশ্য শক্তির কাছে পরাজয় মেনে নেন।

গোটা পৃথিবীর মোট সম্পদের এক ভাগের মালিক মেয়েরা। মেয়েদের গৃহস্থালী কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনও দেয়া হয়নি। অর্থাৎ তা অর্থনৈতিক মূল্যে অদৃশ্যই থাকে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা তো বটেই এমনকি উন্নত বিশ্বের চিত্রও অনেকটা একই। কখনও শ্লীলতাহানি কখনও যৌন নির্যাতন, কখনও মেয়ে হিসেবে জন্মানোর জন্য চূড়ান্ত নিপীড়ন.সবই চলছে যুগ থেকে যুগ, শতাব্দী ধরে।

বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় ৮ মার্চ। অনেক দেশে শুধু মেয়েরাই সরকারি ছুটি পায়। কিন্তু বাংলাদেশে কোন সরকারি ছুটি নেই। সরকারের কাছে একটাই দাবী করছি ৮ মার্চ যেনো সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়। নিজেরা ছুটি না পেলেও আশা করি ভবিষৎ প্রজন্মরা যেনো সেটা পায়। তাহলে কিছুটা হলেও সম্মান আর শ্রদ্ধা দেখানো হবে।


রুবিনা ইয়াসমিন: গণমাধ্যম কর্মী









Leave a reply