সিরাজগঞ্জে যমুনার চরে তরমুজের সমারোহ

|

গোলাম মোস্তফা রুবেল, সিরাজগঞ্জ

“ক্ষেতে-ক্ষেতে লাঙলের ধার, মুছে গেছে কতবার, কতবার ফসল কাটার সময় আসিয়া চলে গেছে কবে! শস্য ফলিয়া গেছে, তুমি কেন তবে রয়েছ দাঁড়ায়ে, একা একা! ডাইনে আর বাঁয়ে, পোড়ো জমি খড় নাড়া মাঠের ফাটল, শিশিরের জল!” রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ‘মেঠো চাঁদ’ কবিতা এখন সত্যি হয়ে ধরা পড়ছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার যমুনার কোল ঘেষা চরাঞ্চল এলাকায়।

যে জমিনে বছরের একটা সময় পর্যন্ত দিগন্তে যতোদূর চোখ যায় কেবল জল আর জল, সেই জমিনেই এখন যতোদূর চোখ যায় শুধু ধুধু বালুর চর। ফলে চরাঞ্চলের প্রতিটি এলাকা হয়ে উঠেছে ফলের আবাদ আর সবুজের এক অপূর্ব সম্মিলন। যে জমি একবার তলিয়ে যায়, ভাসিয়ে নেয় যমুনার জল। আবার সেই জমিতেই ফলানো সোনা হয়ে ওঠে এখানকার বাসিন্দাদের জীবনের পাথেয়।

এমনকি, জলের রাজ্যে এখন ফসলের জন্য হয়ে উঠেছে ফলনের রাজ্য। চরাঞ্চলে পরিবেশ-জীবন সংগ্রামের এ বৈপরীত্য, প্রকৃতির এই বদল নিয়ে চরাঞ্চল হয়ে উঠেছে মন্ত্রমুগ্ধ এক মর্ত্য। সম্প্রতি দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা যমুনার চর এখন আর বর্ষার সেই টই-টম্বুর রূপ নেই। নেই পানিতে-পানিতে ভাসমান দ্বীপ সদৃশ জনপদ। সেখানে এখন আদিগন্ত সবুজের গালিচা ও নানা জাতের ফল, যেমন-তরমুজ, বেলে, ভাঙ্গী। অগ্রহায়ণের শুরুতে এই যুমনার চরে ধান, বাদাম, তরমুজ, মিষ্টি কুমড়োর আবাদের রূপ ধুধু বালুর চরকে করে তুলেছে অনিন্দ্যসুন্দর।

জেলার চরাঞ্চল আফজালপুর, নছিমপুর, গোয়ালিয়া হোসেন, বার পাখিয়া, কাকুয়া, বেলকুচির চর সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেখানকার কৃষকরা এখন ব্যস্ত। গরমের তপ্তরোদে পিঠ পুরে গেলেও ফসল আর ফলের পরিচর্যায় সূর্য উদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত পরিশ্রম করছেন তারা। এখন চলছে ফসল ও নানা জাতের ফলের পরিচর্যা।

ভোরে শিশিরভেজা পথ মাড়িয়ে কৃষকদের ছুটছেন মাঠে। সারাদিন কাজের ফাঁকে তাদের মনে কেবলই বার বার দুশ্চিন্তায় উঁকি দিয়ে যাচ্ছে আসছে বৈশাখের শেষে নতুন জোয়ার, ভেসে যাবে সব কিছু। তার পূর্বেই সোনালী ফসল ও তরমুজ তুলে বিক্রি করতে হবে তাড়াতাড়ি।

আফজালপুর চরের বাসিন্দা আফজাল হোসেন (৪০), নছিমপুর চরের মেরাজ মিয়া (৩০), কাকুয়া চরের বাদল মিয়া (২৫), গোয়ালিয়া হোসেন চরের নছিম উদ্দিন (৪০) জানান, তারা এতো পরিশ্রম করে ধানের আবাদ ও নানা জাতের ফলের আবাদ করেও তরমুজ, বাঙী আবাদ করলেও খুব বেশি মুনাফা হয় না। তবে এবার আমাদের নতুন মাত্রা যোগ করেছি তরমুজের আবাদ। দূর দূরান্ত থেকে পাইকার না আসলেও বেলকুচি ও সিরাজগঞ্জের পাইকার আসছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় আমরা অধিক মুনাফার আসায় তরুমুজের আবাদ করেছি। ফলন হয়েছে ভাল, বিক্রিও শুরু হয়েছে।

তারা আরও জানান, বেলের মাটির তরুমুজ গুলো দেখতে কালো। আকারে ছোট এবং মাঝারি ধরণের। যদি আমরা ধানের চাইতে তরমুজে বেশি লাভ হতে পারি, তাহলে তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠব। বেলে মাটির তরমুজ গুলোর খোসা মোটা থাকায় অনেক গ্রাহকই বেশি পছন্দ করে না। কিন্তু ফরমালিন মুক্ত একমাত্র তরমুজ যমুনার চরের তরমুজ। চৈত্রের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তরমুজ পেকে যায় এবং পাইকারদের কাছে বিক্রি করি। বৈশাখের যমুনা নদীর জোয়ার আসার পূর্বেই আমাদের তরমুজ গুলো বিক্রি করে দিতে পারবো এবং ঘরে তুলে নিতে পারবো ধান এই আশা নিয়েই আছি।

নছিমপুর চরের মেরাজ মিয়া জানান, গত বৎসর তরমুজ আবাদ করে বেশ লাভ করেছি। গড় হিসাবে একটি তরমুজ পাইকারদের কাছে ৫০-৬০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। চৈত্রের প্রথমেই বেলকুচি উপজেলার প্রধান বাজার মুকুন্দগাঁতী ওয়াপদা রোডে তরমুজ আমদানি করেছে পাইকাররা। বিক্রিও হচ্ছেও ভাল।









Leave a reply