কয়েকটি ‘রোহিঙ্গা গল্প’: কুতুপালং থেকে (দ্বিতীয় কিস্তি)

|

গল্পরা আঁকিবুকি করছে প্রতিটি চোখে। শরীরের একেকটি অঙ্গ সাক্ষ্য দিচ্ছে একেকটি ঘটনার। ভয়, ক্লান্তি, ক্ষুধা, বিষাদ, অবসাদ, জখম এবং অবশেষে সীমান্ত পাড়ি দিতে পেরে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার এক নিশ্চিন্ত অনুভূতি। একটি আত্মা যেন বয়ে বেড়াচ্ছে একটি করে উপন্যাসের উপজীব্য। এত এত গল্পের মাঝে কোনটি বর্ণনার জন্য বাছাই করা যায়? কোন আশ্রয়প্রার্থীর গল্পটি বলা বেশি দরকার? কোন ঘটনাটি সবচেয়ে করুণ? উখিয়া-টেকনাফে গত কয়েকদিন কাটানো কোনো সাংবাদিকদের পক্ষে এসব প্রশ্নে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার উপায় নেই। প্রতিটি গল্পই করুণ। প্রতিটি ঘটনাই মর্মস্পর্শী। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই চোখ ভেজানো।
এমন হাজারো ঘটনার মধ্য থেকে কিছু ঘটনা সংক্ষেপে জানাচ্ছেন কদরুদ্দীন শিশির-


৫ শিশু সন্তানকে নিয়ে ১৩ দিনের পদযাত্রা

জাহারা বেগমের সাথে কথা হয়েছে ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। কান্নাভেজা কত কথা, ঘটনা। ৫ সন্তানের এই মায়ের বয়স কত হবে? তিনি জানালেন ২৫ বছর। হয়তো আরেকটু বেশি হতে পারে। মাস তারিখের হিসাব সঠিকভাবে রাখতে পারেন না বেশিরভাগ রোহিঙ্গা। যাদের সাথে কথা বলেছি একই রকম মনে হয়েছে।

জাহারা বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকেছেন ৭ সেপ্টেম্বর। বুচিডঙের বৈদ্ধপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তার ১৩ দিন আগে। হেঁটে হেঁটে আর পাহাড়ে একাধিক রাত কাটিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। একাই ২ মেয়ে আর ৩ ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে দু’টিই কোলের শিশু। সবচেয়ে বড় ছেলের বয়স ৯ বছর।

জাহারার সাথে কথা হচ্ছিল এক ‘অনুবাদকের’ সাহায্যে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা অল্প বিস্তর পড়াশোনা করেছেন, বা আগে কখনো বাংলাদেশে এসেছিলেন তাদের ভাষা বুঝা সহজ। তারাও বাংলা বুঝেন। যারা মঙডু, বুচিডঙ ইত্যাদি থানা শহর বা আকিয়াব শহর থেকে এসেছেন, তাদের সাথে মোটামুটি যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। কিন্তু একেবারে গ্রামের অশিক্ষিত মানুষের উচ্চারণ ও শব্দ বুঝতে অনুবাদকের সাহায্য নেয়া লাগে। ৫ সন্তান নিয়ে ভিন দেশে পাড়ি জমানো জাহারাও এরকম এক গ্রামীণ নারী। স্কুলের বারান্দায়ও যাননি কোনোদিন। দু’টি কোলের বাচ্চাসহ ১৩ দিন কিভাবে হাঁটলেন?’ প্রশ্ন করতেই নিজের জুতাবিহীন পায়ের দিকে ইশারা তার। কাদামাখা পায়ের একাধিক জায়গায় ফেটে থেতলে গেছে। ‘একটারে কোলে আরেকটারে ঘাড়ে নিয়ে হেঁটেছি। যখন শরীরে আর কুলায়নি, তখন ঝোপের মধ্যে অন্যদের সাথে বসে পড়েছি। আবার একটু ভাল লাগলে উঠে হাঁটতে শুরু করি।’
‘১৩ দিন খাওয়া দাওয়া করলেন কিভাবে?’ প্রশ্নটি অনুবাদক বুঝিয়ে দেয়ার পর চেহারা নীল হয়ে উঠছিল এই মায়ের। ‘আমি তো তেমন কিছুই খাই নাই। পানি খাইছি। আর মাঝে মাঝে বিস্কুট দিছে লোকজন। বাড়ি থেকে চাল নিয়ে বের হয়েছিলাম। দুই বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আর চালের ব্যাগ টানতে পারছিলাম না। সাথের একজনকে দিয়ে দেই চালগুলো। বিনিময়ে ওই লোক কিছু শুকনা খাবার দিয়েছিলেন। সেগুলো বাচ্চাদের খাইয়েছি। এর বাইরেও বাচ্চাদেরকে সাথে থাকা লোকজন খাবার দিত।’ বাংলাদেশে ঢুকে ১৩ দিন পর বাচ্চাদের নিয়ে ভাত খেয়েছেন, জানালেন জাহারা। একটি সংস্থার পক্ষ থেকে খাবার বিতরণের সময় তিনি ওই রাস্তার পাশেই ছিলেন। উঠে গিয়ে পলিথিনের প্যাকেটে করে খাবার নিয়ে এসেছিলেন সন্তান ও নিজের জন্য। এরপর রাত কেটেছে এক দোকানের বারান্দায় অন্য আরো শত মানুষের সাথে।

‘কেন তিনি বাড়ি ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন?’ প্রায়ই কথা বলার সময় চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল জাহারার। এই প্রশ্নটি বুঝার পর ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
রাত ১০টার পর স্বামীসন্তানসহ শুয়েছিলেন নিজের বাঁশবেতের ঘরে। হঠাৎ দরজায় ঠোকা পড়ল। সাথে ‘জাফর জাফর’ ডাক। প্রথমে দরজা না খুলে বসেছিলেন জামাই বউ। কিন্তু আগন্তুকদের কণ্ঠস্বর গরম হওয়ার সাথে সাথে দরজায় ধাক্কা শুরু হওয়ায় নিজেই খুলে দেন কপাট। ঘুরে ঢুকে সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা ৮/১০ জন লোক। জাফরকে খুঁজে বের করে মশারির নিচ থেকে। পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। বাধা দেয়ায় কপালে ঘুষি খেয়ে মাটিতে যান জাহারা। এরপর বাড়িতেই থাকেন ৫ দিন। কিন্তু পাশের গ্রামে আগুন ধরানোর খবর পেয়ে রওয়ানা দেন বাংলাদেশের পথে।
বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রাপথে খবর পেয়েছিলেন স্বামীকে মেরে ফেলেনি বর্মি আর্মি। জেলে আটকে রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঢোকার পর খবর পেয়েছেন জাফরের সাথের কয়েকজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। তারপর থেকেই কেমন জানি অশান্তি লাগছে তার। আর হয়তো বেঁচে নেই বাচ্চাদের বাবা। ‘এই খবর শুনে কালকে থেকে খুব অশান্তি লাগছে। ওরা তাকে….!’ বাকিটুকু মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেন না জাহারা। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন শাড়ির আচল মুখে গোজে। ‘এখন আমি এখানে কেমনে থাকবো এদের নিয়ে?’ কেঁদে কেঁদে বারবার এটাই তার প্রশ্ন।

কথা বলতে বলেতে কেঁদে ওঠেন জাহরা


‘পিথিবি কানছে’

৯ সেপ্টেম্বর কুতুপালং পশ্চিম হিন্দুপাড়া মন্দিরের সামনের সড়কে নেমেছি বাস থেকে। ওখানে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকশ’ মানুষ। তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের মতো তারাও পালিয়ে এসেছেন রাখাইনের যমদূতের হাত থেকে। তারা কেমন আছেন দেখতে যাবো। সড়ক থেকে মন্দিরের রাস্তায় একটু কাদা হওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা রিকশাকে ইশারা করলাম। চালক দ্রুত কাছে এসে বললেন, ‘মন্দিরে যাইবেন?’ হ্যাঁ সুচক উত্তর পেয়ে উঠে বসতে বললেন। রিকশার পেডেলে টান দিয়ে নিজের সিটে বসে চালকের স্বগোক্তি- ‘পিথিবি কানছে’। সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে গেল বাতাসে।

আমার সাথে কথা বলছেন না দেখে প্রথমে পাত্তা দেইনি- কী বলছেন আর কেনই বা বলছেন। কিন্তু পর মুহুর্তে মনে হল তিনি আমাকে হিসেবে চিনতে পেরেছেন। এবং বুঝেছেন আমি পালিয়ে আসা মানুষদের খবর নিতেই মন্দিরে যাচ্ছি। হাতে বড় একটা ডায়েরি দেখে হয়তো সাংবাদিক হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
‘পৃথিবী কানছে কেন, চাচা?’ উনি মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, ‘সেটা তো বাবা আপনেরা ভাল জানেন আমাদের থেকে! আমি আপনারে চিনছি। রোহিঙ্গাদের দেখতে আসছেন না? বাবারে বাচ্চাগুলার দিকে তাকাইলে পেট পোড়ায়। সহ্য করতে পারি না। আমার ঘরেও দুইটা মাইয়া ফুয়া আছে।’ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন রিকশা চালক। ‘আপনার নামটা জানতে পারি?’ ‘বাসু বড়ুয়া। আমার বাড়ি ওই যে দেখছেন সাদা দেয়াল দেয়া মন্দির ওইটার পাশে।’ কিছু দূরের একটি সাদা দেয়াল ঘেরা ভবন দেখিয়ে বললেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী এই লোকটি। বাসু বড়ুয়ার ব্যাটারি চালিত রিকশায় চড়ে এরপর চলতে থাকে একের পর জায়গায় যাওয়া। গ্রামীণ রাস্তায় শা শা করে চলে রিকশা আর কানে বাজতে থাকে দু’টি বাক্য- ‘পিথিবী কানছে’, ‘বাচ্চাগুলার দিকে তাকাইলে পেট পোড়ায়’।

তিন ঘণ্টা সময় ছিলাম বাসু বড়ুয়ার রিকশায়। এর মধ্যে রাস্তায় তিনবার রিকশা থামালেন। বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে থাকা দুই মাকে দিলেন ১০টাকা করে। শেষের একজনকে দিলে ৫ টাকার একটি নোট।

মুরগীর খামারে মানুষের বাস

কুতুপালং পশ্চিম হিন্দুপাড়া মন্দিরের সামনেই বাসু বড়ুয়া রিকশা থামালেন। কয়েক কদম এগিয়ে পাশের বাড়িতে ঢুকলাম। বাড়ির মুখেই মুরগী পালার একটি শেড। যদিও ওখানে এখন মুরগীরা থাকছে না। থাকছেন ৫১২ জন আদম সন্তান। নারী-শিশু-বৃদ্ধ। পুরুষরাও রাতের বেলা আশ্রয় নিচ্ছে এক কোনায়। তারা সবাই পালিয়ে এসেছেন রাখাইন থেকে।

অস্থায়ী ওই শরনার্থী শিবিরের সার্বক্ষণিক দেখভাল করা সুজন শর্মার সাথে কথা হল। উখিয়া ডিগ্রি কলেজের ছাত্র তিনি। মন্দির কমিটির দেয়া দায়িত্ব পালন করছেন সেখানে। তিনি ডেকে নিয়ে এলেন চিত্তরঞ্জন পালকে। ৫৫ বছর বয়সী চিত্তরঞ্জনের বাড়ি মঙডুর চিকনছড়িয়ায়। দেশ ছাড়ার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা জানালেন তিনি।

খামারে এসে আশ্রয় নেয়া ৫১২ জন এসেছেন মঙডুর পাশাপাশি ৬টি পাড়া থেকে- চিকনছড়িয়া, ফাকিরাবাজার, সাহেববাজার, রিক্কাপাড়া, বলিবাজার ও মৌলভীবাজার। ‘আমাদের এলাকার মুসলিম ছেলেরা মিলে একদিন রাতে পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালায়। পুলিশ মারা গেছে। অনেক পুলিশ পালিয়ে গেছে। তখন থেকে তিন চার দিন ওরা (মুসলিম ছেলেরা) এলাকা ঘিরে রাখে। আমার বাড়ি চিকনছড়িয়া। আমাদেরকে কয়েকজন এসে বলে, তোমরা বাড়ি থেকে বের হবে না। তোমাদের সাথে আমাদের কোনো সমস্যা নাই। সরকারের সাথে বোঝাপড়া আছে। এখন ঘরে থাকবা তোমরা।’ চিত্তরণঞ্জ বলছেন তার পালিয়ে আসার ঘটনা।
‘তিন চার দিন এভাবে বন্দী থাকার পর আমরা বললাম, তোমরা এভাবে বন্দী করে রাখলে খাবো কী? ঘরে চাল-ডাল শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিগাটের আনতে দোকানে যাইতে পারি না। আমাদেরকে ছেড়ে দাও। কিন্তু তারা কিছু বলে না। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম তাদের বড় নেতার সাথে দেখা করে বলবো। যখন ওই ছেলেদেরকে বললাম তোমাদের নেতাদের কাছে যাবো আমরা। তারপর তিনজন জুনিয়র নেতা আমাদের পাড়ায় আসে। তারা বলে আরো কয়েকদিন এভাবে থাকতে হবে। সরকারের সাথে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কোথাও কাউকে যেতে দেয়া হবে না।’

চিত্তরঞ্জনকে কথা বলতে দেখে এসে যোগ দেন রবীন্দ্র রুদ্র নামে আরেকজন। তার বয়স জানালেন পঞ্চাশ। রুদ্র বলতে শুরু করলেন, ‘নেতারা আমাদের পাড়ায় যেদিন এসেছিলেন ওই রাতেই আমাদের এক মুসলিম বন্ধু এসে বললো, তোমার পারলে পালিয়ে যাওয়া। এখানে হামলা হতে পারে। আমরাও ভয়ের মধ্যে ছিলাম। তার কথায় ভয় বেড়ে গেল। তার মধ্যেই খবর পেলাম পাশের ফকিরাবাজারে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। তখন মুসলিম ছেলেরা চলে যায়। পরদিন সকালেই আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেই।’

চিত্তরঞ্জন ও রুদ্র দু’জনেরই ধারণা, ফকিরাবাজারে হিন্দুপাড়ায় হামলায় মুসলিম যুবকরা জড়িত থাকতে পারে।
ফকিরাবাজারে কী ঘটেছিল জানতে চাইলে ওই পাড়ার বাসিন্দা বীনা শীল প্রথমে কথা বলতে চাইলেন না। কলেজছাত্র সুজন শর্মা জানালেন, আসার পর থেকে তেমন কারো সাথে কথা বলেন না বীনা। ২২ বছরের এই তরুণীর দুটি ছেলেমেয়ে আছে। তারা আসতে পেরেছে মায়ের সাথে। কিন্তু আসতে পারেন নি বীনার মা, ছোট ভাই, ভাসুর, তার স্ত্রী ও সন্তানেরা কেউই। সবাইকে হত্যা করা হয়েছে।

এক পর্যায়ে বীনার শিশু সন্তানদের ছবি তুলতে লাগলে তাদের কাছে এসে দাঁড়ান মা। এরপর কিছু কথা বলেছেন সেদিনের ঘটনা নিয়ে। ‘আমাদের পাড়ায় মুখোশ পরে কিছু লোক হামলা চালায়। তাদের হাতে কিরিচ-দা ছিল, কারো হাতে বন্দুকও ছিল। যাকে সামনে পেয়েছে মেরেছে।’

সন্তানের ছবি তুলতে গেলে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান বীনা শীল

‘কতজনকে মেরেছে?’ জবাবে বীনা জানালেন, ‘ফকিরাবাজারে ২৭টি হিন্দু পরিবার ছিল। ওইসব পরিবারে মোট সদস্য ছিল ১২০ জনের মতো। আমরা ১৬ জন পালিয়ে এসেছি। সঠিক সংখ্যা জানিনা। তবে বেশিরভাগকেই ওরা খুন করেছে।’ বলতে বলতে বাচ্চাদেরকে জড়িয়ে ধরে গম্ভীর হয়ে গেলেন বীনা শীল। বীনার স্বামী মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। মন্দিরের পাশের মুরগীর খামারে দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তার।
সুজন শর্মা জানালেন, ৫১২ জনের মধ্যে কিছু সংখ্যক আশপাশের বাড়িঘরে থাকছেন। বেশিরভাগই আছেন খামারে। ব্যক্তিগত সহায়তায় চলছে তাদের খাবার। ছোট বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আরো ৭টি হিন্দু পরিবার বালুখালীর ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সাথে আছেন বলে মন্দির কর্তৃপক্ষ খবর পেয়েছে। তাদেরকেও এই খামারে নিয়ে আসা হবে।


যাত্রাপথে জন্ম নেয়া বাচ্চাকে নিয়ে মসজিদে রোকেয়া বেগম

৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। স্থান কুতুপালং পশ্চিমপাড়া মসজিদ। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের সাথেই মসজিদটির অবস্থান। মাগরিবের নামাজ কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে। মুষলধারে বৃষ্টি নামছে। মুসল্লিদের অনেকে হাতে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন ঝমঝম করে পড়া বৃষ্টি ছাতায় ধরবে না। তাই অপক্ষো করছেন একটু কমলে বের হবেন। এমন সময় এক মহিলা এসে হুড়হুড় করে ঢুকে পড়লেন মসজিদে। কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। মসজিদে ঢোকার আগের দৃশ্যটা এরকম- মহিলা তার ডান হাত দিয়ে বুকে চিৎ করে আকঁড়ে ধরে আছেন ছোট্ট একটি শিশুকে। বাম কাঁখে ঝুলে আছে দেড় থেকে দুই বছরের আরেক শিশু। ছোট একটা বস্তা ঝুলিয়েছেন পিটের দিকে। চার বছরের মতো বয়সের আরেকটি বাচ্চা বোরকায় ধরে আছে তার। পেছনে একটি গোলাপি রংয়ের ব্যানিটি ব্যাগ মাথায় নিয়ে হাঁটছে বছর ছয়েকের একটি ছেলে। কোলের ছোট্ট শিশুটির চোখমুখে মোটামোটা বৃষ্টির ফোটাগুলো সরাসরি পড়ছিল। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল মিনিট পনেরো আগে। এ পুরোটা সময় হাঁটছিলেন একটু আশ্রয়ের জন্য। পাশের বাজারের দোকানগুলোর বারান্দায় জায়গা নেই। আবার সারাদিনের টুপটুপ বৃষ্টিতে কাদায় ভরে গেছে অনেক বারান্দা। শিশুদের নিয়ে সেখানে রাত কাটাবার মতো নয়। হঠাৎ মসজিদ দেখে এসে ঢুকেছেন তাতে। একজন নারী কাউকে কিছু না বলে সোজা এসে মসজিদে ঢুকে যাবেন- বাংলাদেশের গ্রামীন এলাকায় এটা প্রায় অসম্ভব দৃশ্য। কিন্তু চার সন্তানের এই মা’কে মুসল্লিরা সাদরে গ্রহণ করলেন। তার এগিয়ে আসা দেখে কয়েকজন যুবক মুসল্লিও এগিয়ে গেলেন হাত পেতে। বাচ্চাগুলোকে ধরতে চাচ্ছেন তারা। কাঁধের বস্তাটিতে ধরে নামাতে সাহায্য করছেন কেউ। ইমাম সাহেব এগিয়ে এলেন পাশেই তার কক্ষ থেকে একটা লুঙ্গি নিয়ে। ছোট্ট শিশুটাকে সেই লুঙ্গিতে মুড়িয়ে মহিলাকে নিয়ে গেলেন বারান্দা এক কোনায়।

সেখানে বোরকা খুলে, বস্তা থেকে কয়েকটি কাপড় বের করে ছোট বাচ্চাগুলোর কাপড় বদলে দিলেন মা। জানালেন তার নাম রোকেয়া বেগম। ছোট শিশুটির জন্ম হয়েছে ১৪ দিন হল। তিনি ১৭ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন বাংলাদেশের উদ্দেশে। যাত্রাপথে জন্ম হয় শিশুটির। এক সপ্তাহ ধরে একটি দোকানের বারান্দায় কাটিয়েছেন। আজ আর সেখানে থাকতে দেয়নি। তাই নতুন আশ্রয়ের খোঁজে হাঁটছিলেন।

বাংলাদেশে আসার পথে জন্ম নেই রোকেয়া বেগমের কোলের সন্তানটি

রোকেয়া বাংলা কথাবার্তা কিছুই বুঝেন না। ইমাম সাহেবের সহায়তায় কথা হল তার সাথে। জানালেন, ১৭ দিন আগে হঠাৎ বাইরে থেকে এসে তার স্বামী বললেন, ‘তুমি সীমান্ত পার হয়ে যাও। আমি এখন পালিয়ে যাচ্ছি। আমি বাংলাদেশে আসবো।’ স্বামী কোথায় যাচ্ছেন, কেনো পালাচ্ছেন জিজ্ঞেস করেও কিছুই জানতে পারেননি রোকেয়া। এরপর তার নিজের এলাকা তমব্রুর লোকজন সবাই বাংলাদেশে আসতে শুরু করলে তিনিও তিন বাচ্চাকে নিয়ে রওয়ানা দেন। পথে আরেক বাচ্চার মা হন রোকেয়া।
বাংলাদেশ আসার পথে কিম্বা আসার পর গত ২৫ আগস্টের পর অনেক নারী সন্তান জন্ম দিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের সাথে গত তিন দিনে কথা হয়েছে তারা এরকম অন্তত ৫টি ঘটনার তথ্য দিয়েছেন। তিনজন মহিলার সাথে আমার দেখা হয়েছে। কুতুপালংয়ে ডক্টর্স উইদাউট বর্ডারের পরিচালিত চিকিৎসা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা মিডিয়া পরিচালক সাজ্জাদ হোসাইনের জানিয়েছেন, ২৫ আগস্টের পর এখানে এসে জন্ম নেয়া শিশুদের বিষয়ে তাদের কাছে সার্বিক কোনো তথ্য নেই। তবে ৩/৪টি ঘটনা চিকিৎসা শিবিরেই হয়েছে গত কয়েকদিনে। এর বাইরেও অনেকে থাকতে পারে।

(চলবে…)









Leave a reply