সন্তানের ঘরে ঠাঁই নাই, বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যুর অপেক্ষায় ১৭ বাবা-মা

|

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা
দরিদ্র-অসহায় ও সন্তানের অবহেলা-অপমানের শিকার হয়ে পরপারের অপেক্ষায় ১৭ জন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনের শেষ আশ্রয় হয়েছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের ১২ তরুণের প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা ‘বৃদ্ধা সেবা বৃদ্ধাশ্রমে’।

বৃদ্ধা সেবা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো একসময় জীবনের সবটুকু শ্রম আর ঘানি টেনেছেন পুরো পরিবারের জন্য। অথচ বার্ধক্য, রোগাক্রান্ত আর স্বজন বিচ্ছিন্ন হয়ে এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এখন শুধুই নিঃসঙ্গতা।

বৃদ্ধাশ্রমের বসবাস করছেন গোবিন্দগঞ্জের তরুণীপাড়ার পাকিাজা বেওয়া। বয়সের ভাঝ ও ক্লান্তির ছাপে এখন বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ৭১ বছরের এই বৃদ্ধা। নিজের সর্ম্পকে পাকিজা বেওয়া বলেন, ‘স্বামীর ছোট ব্যবসার আয়ে চলতো সংসার। একমাত্র ছেলে সন্তান রয়েছে সংসারে। সেই সন্তানকে কোলে পিঠে লালন-পালন করে বড় করেছেন। প্রিয় সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় করেছেন কঠোর পরিশ্রম। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে সন্তানের মুখে তুলে দিয়েছেন খাবার। কিসে হবে সন্তানের কল্যাণ সে চিন্তায় রাতকে দিন, আর দিনকে করছেন রাত। অথচ স্বামী মারা যাওয়ার সেই সন্তানের অবহেলায় বোঝা হয়েছেন এখন। একমাত্র ছেলে ও ছেলের বউ তাকে তাড়িয়ে দেয়ায় বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়েছে। নিজের দু:খের কথা বলতেই বারবার কান্নায় মুর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি’।

পাকিজা বেওয়ার মতো সন্তানের ঘরে ঠাঁই হয়নি আরেক বৃদ্ধা পলাশবাড়ীর হরিনামারীর মেহেরুণ নেছার। দুই ছেলে-এক মেয়ে নিয়ে সংসার ছিলো সাজানো। মেয়ের বিয়ে হওয়ায় থাকেন স্বামীর বাড়িতে। দুই ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করে আলাদা সংসারে থাকেন। দু’ বেলার খাবার আর নিজের বাড়িতে জায়গা না হওয়ায় মনের দুঃখে আত্মহত্যা করতে চেয়েও পায়নি মেহেরুণ নেছা। স্থানীয় লোকজন তাকে রেখে যায় বৃদ্ধাশ্রমে। গত সাত মাস ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকলেও খোঁজ নেয়নি ছেলে মেয়েরা। জীবন সন্ধিক্ষনের মহুর্তে নিঃসঙ্গতায় তবুও ভালোই আছেন তিনি’।

শুধু পাকিজা আর মেহেরুণ নেছাই নয়, তাদের মতো ১৭ জন মানুষের আশ্রয়স্থল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে কলেজ ছাত্রদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা ‘বৃদ্ধা সেবা বৃদ্ধাশ্রমে’। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেয়া ১৭ জনের কেউ দরিদ্র-অসহায়, কেউ কেউ ভূমিহীন আবার কেউবা সন্তানের অবহেলা-অপমাণের শিকার হয়েছেন। আশ্রয় নেয়া বাবা-মার হয়তো বুক ভেঙে আসে, কিন্তু কোন ক্ষোভ হয়না তাদের। বুকের মধ্যে শত হাহাকার থাকলেও বোঝা ও বোঝানোর কোন জায়গা নেই তাদের। তবুও দুঃখ মনেই পুষে ভালোই আছেন বৃদ্ধাশ্রমের এই মানুষগুলো’।

বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেয়া মজিরন বেওয়া বলেন, নিজ বাড়ি থাকলেও সেখানে ঠাঁই হয়নি তার। ছেলেরা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিছেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় নানা কষ্টে রাতদিন কেটেছে তার। শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে তার। নিজের দুই পায়েও হাটাচলা করতে পারেননা। বৃদ্ধাশ্রমে এখন চলাফেরা করতে হয় অন্যের সাহায্যে নিয়ে। জীবনে কষ্ট হলেও এখন শান্তিতে আছেন বৃদ্ধাশ্রমে’।

শারীরিক প্রতিবন্ধী বাদশা মিয়া বলেন, ‘স্ত্রী-সন্তান, নিজ বাড়ি, আবাদি জমি সবেই ছিলো। কিন্তু নিজের অসুস্থতায় এক সময় শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। চিকিৎসা চালাতে গিয়ে সব বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছি। তিন ছেলে-এক মেয়ে থাকলেও তারা এখন বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন। শারীরিক অক্ষমতা ও উপার্জন করতে না পারায় ছেলেরা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। ফলে শেষ জীবনে শেষ ঠিকানা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। তবে ছেলে-মেয়ে ও স্বজন ছাড়াই বৃদ্ধাশ্রমেই এখন ভালো আছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বৃদ্ধাশ্রমেই থাকতে চান তিনি’।

গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের বোয়ালিয়া শীববাড়ী মোড়ে এলাকার ১২ জন তরুণ নিজেদের দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা থেকে ২০১৭ সালে গড়ে তোলেন বৃদ্ধাশ্রমটি। এরপর থেকে বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনা করে আসছেন তারা। ১২ জন তরুণের মধ্যে অধিকাংশই কলেজছাত্র।

বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটির সভাপতি আপেল মাহমুদ জানায়, প্রথমে একজন হলেও দিনদিন বৃদ্ধাশ্রমে বাড়ছে অসহায় মানুষের সংখ্যা। নিজেদের চাঁদা ও সামান্য সংগ্রহ করা টাকায় টাকায় চলে বৃদ্ধাশ্রমটি। গত এক বছর ধরে এসব মানুষকে তিনবেলা খাবার, দেখাশুনা ও তাদের চিকিৎসা চালিয়ে আসছেন। এছাড়া এসব মানুষকে অক্ষর জ্ঞানসহ নামাজ ও কোরআন পড়ানো হয় নিয়মিত। বর্তমানে বাড়ী ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও তাদের কাপড়সহ সবমিলে প্রতিমাসে খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এমন অবস্থায় তাদের খরচ চালাতে হিমশিমে পড়েছেন তারা’।

ব্রদ্ধাশ্রম পরিচালনার কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘অর্থের অভাবে বৃদ্ধাশ্রমটি বন্ধ হয়ে পড়লে অসহায়-নির্যাতিত মানুষগুলোর কোথাও ঠাই হবেনা। আবারও তাদের পথের ধারেই কাটবে দিন। তাই এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সমাজের সম্পদশালী মানুষ ও সরকারকে সহযোগিতা চেয়েছেন তারা। সকলের সহযোগিতায় আরও অনেক দরিদ্র-অসহায় মানুষকে বৃদ্ধাশ্রমের ছায়াতলে এনে সেবা করতে চান’।

তরুণদের পাশপাশি এ উদ্যোগে নিজ থেকে এগিয়ে এসে বৃদ্ধ মানুষগুলোর সেবা যত্ন করে আসছেন মলি রানী এক নারী। তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেয়া মানুষদের খাবার, গোসলসহ তাদের দেখাশুনে করেন। তবে পারিশ্রমিক তেমন পাননা। তবে তাদের সেবা করতেই তার ভালো লাগে’।

বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত অক্ষরজ্ঞান, কোরআন ও নামাজ শেখানোর দায়িত্বে রয়েছেন রুমি নামে এক কলেজ ছাত্রী। রুমি বলেন, ‘এই অসহায় মানুষগুলোকে জীবনের শেষ সময়ে তিনি অক্ষরজ্ঞান, কোরআন পড়ানো, নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন। তবে এসব করেন শুধুই নিজের মানবিকতা আর নৈতিকতাবোধ থেকেই’।

বৃদ্ধাশ্রমের জন্য যে বাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছে তার মালিক স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আতিকুর রহমান মাষ্টার। তিনি বলেন, ‘একসময় তার বাড়িতে একটি স্কুল ছিলো। কিন্তু তরুণদের বৃদ্ধাশ্রমের উদ্যোগ দেখে তিনি তাদের পুরো বাড়িটি দিয়েছেন। বাড়িটি ভাড়াতে অনেক টাকা হলেও বৃদ্ধাশ্রমের জন্য শুধু মাসিক ৫ হাজার টাকা নিচ্ছেন। তবে যতদিন তারা এখানে থাকতে চান, ততদিন বাড়িটি ব্যবহার করতে পারবেন’।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও ও সহকারী কমিশনার ভূমি রাফিউল আলম বলেন, ‘সমাজের যুবকরা দিনদিন অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সেই সমাজের যুবক-ছাত্রদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা ‘বৃদ্ধাশ্রম’ সত্যিই মানবসেবার দৃষ্টান্ত। এরআগেও বৃদ্ধাশ্রমের জন্য সহযোগিতা করা হয়েছে। তাদের বৃদ্ধাশ্রমের জন্য আবারও সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।

তবে নিজের বাড়ী, আর প্রিয় সন্তান-নাতীদের কাছে না পেয়ে নিঃসঙ্গতায় বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হচ্ছে  অসহায় এই মানুষগুলোকে। তাই সন্তানদের মঙ্গল কামনার সাথে দিবারাত্রি প্রহর গুনেন কবে আসবেন আদরের সন্তান তাদের ফিরিয়ে নিতে।









Leave a reply