যেভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বন্যাদুর্গত বাংলাদেশ

|

আজীবন লালিত স্বপ্ন নিজের একটি প্রাইভেটকার কিনবেন। সে লক্ষ্য টাকাও জমিয়েছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা মেহেদি চৌধুরী। আর ক’দিন পরেই কেনার কথা একটি নতুন নিশান সিলফি মডেলের কার। সব প্রস্তুতি শেষ। এমন সময় মিয়ানমারের রাখাইনে শুরু হল স্মরণকালের ভয়াবহ জাতিগত নিধন অভিযান। রোহিঙ্গাদেরকে হত্যা আর বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দিতে শুরু করলো মিয়ানমার সরকার। পালিয়ে আসা নারী-শিশুদের স্রোত সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের কক্সবাজারে।

গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমে অসহায় নারী ও শিশুদের কষ্টের খবর-ছবি দেখে আর স্বাভাবিক থাকতে পারলেন না মেহেদী। নিজের স্বপ্নের গাড়ি কেনার জন্য জমানো ৭ লাখ টাকার পুরোটা নিয়ে চলে গেলেন কক্সবাজারে। খাবার আর তাবু কিনে বিলিয়ে দিলেন রোহিঙ্গাদের মধ্যে।

মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা’কে মেহেদী বলছিলেন, ‘গাড়ি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আমার জমানো হয়ে গিয়েছিল। তখনই দেখলাম টাকাছাড়া, খাবারছাড়া আশ্রয়হীন মানুষ এসে সীমান্তে ভিড় করার মর্মান্তিক সব ছবি। এরপরই সিদ্ধান্ত নিলাম জমানো টাকাগুলো তাদের জন্য ব্যয় করবো। যদি আমার কাছে এর দ্বিগুণ টাকাও জমানো থাকতো সেগুলোও দিয়ে দিতাম।’

গত তিন সপ্তাহে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিরাট সংখ্যক এই মানুষের জন্য যে খাবার প্রয়োজন তা কোনো কর্তৃপক্ষীয় সূত্র থেকে আসেনি ২৫ আগস্ট সংকট শুরুর পর প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত। এ সময়টিতে রোহিঙ্গাদের একচেটিয়া সাহায্য করে গেছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।

বর্তমানে চতুর্থ সপ্তাহে পা দেয়ার পরও সরকারি বা বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলোর দেয়া ত্রাণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়; যদিও অনেক সংস্থা এবং দেশ সাহায্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা এখনো প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে।

নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সহমর্মিতার কথা তুলে ধরে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তারা এমন এক সময় (রোহিঙ্গাদের) সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন যখন স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশ নিজেই কঠিন সময় পার করছে। সম্প্রতি দেশটির তিনভাগের একভাগ এলাকা বন্যায় তলিয়ে গিয়ে ৭৫ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এছাড়া ২২০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি এবং মাথাপিছু ১৩০০ ডলার আয়ের এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ।’

টেকনাফের জাম্মুখালী গ্রামের কৃষক আবু হায়েদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই কৃষক আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাড়ির উঠানে ৮টি রোহিঙ্গা পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছেন। প্রতিদিন তিন বেলা খাবার-পানীয়ের ব্যবস্থাও করছেন তিনি।

আবু হায়েদ বলেন, ‘আমি আমি একজন মানুষ, তাই তাদের আশ্রয় দিয়েছি। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এরা অসহায়, ঘুমানোর জায়গাটুকুও নেই। আমি একজন দরিদ্র কৃষক। তাদেরকে ক্যাম্পে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনো সহায়তা পাচ্ছি না। এভাবে খুব বেশি দিন চলতে পারবো বলে মনে হয় না।’

/কিউএস









Leave a reply