সু চি’র ভাষণে মিথ্যাচার

|

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন শুরুর প্রায় এক মাস পর মুখ খুলেছেন অং সান সুচি। দীর্ঘ নীরবতার পর শান্তিতে নোবেলজয়ী কী বলেন-সেদিকে নজর ছিল সারা বিশ্বের। অবশ্য, আধ ঘন্টার বেশি সময়ের ভাষণে হতাশ হতে হয়েছে মানবাধিকার কর্মীদের। বহুল প্রত্যাশিত ভাষণে সুচি এড়িয়ে গেছেন রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনা। একটি শব্দও বলেননি সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ি নিয়ে।

কী বলেননি বাদ দিয়ে যাওয়া যাক কী বলেছেন সে-প্রসঙ্গে। আন্তর্জাতিক অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে অনেক ভুল আর মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা। অনেক কথা-ই স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, ভুল তথ্যের কারণেই সুচি-সুলভ আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল ভাষণে। এমনকি স্বভাববিরুদ্ধভাবে কয়েকবার তোতলাতেও দেখা গেছে তাকে।

ভাষণে যত অসঙ্গতি:

১. ‘মানুষ কেন পালাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখবো আমরা’

জাতিসংঘ মহাসচিব নিজে রাখাইনের ঘটনাকে অভিহিত করেছেন’ জাতিগত নিধন’ হিসেবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে, নজিরবিহীন নিপীড়নের। সারা দুনিয়া জানলেও সুচি জানেন না, কী কারণে রাখাইন ছেড়ে পালাচ্ছে মুসলিম রোহিঙ্গারা। কিছুদিন আগে অবশ্য তিনি নিজেই বলেছেন, রাখাইনের সমস্যা নতুন নয়। ‘পুরনো’ এ সমস্যার ব্যাপারে কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনেও সুস্পষ্ট বক্তব্য আছে। যাতে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব প্রদানে অস্বীকৃতি ও সেনা নিপীড়নই রোহিঙ্গাদের মূল সমস্যা।

২. ‘আন্তর্জাতিক তদন্তকে ভয় পায় না মিয়ানমার’

বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতিতেই এ মিথ্যা দাবি করেছেন সুচি। বলেছেন, চাইলে রাখাইন পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে পারে যে কেউ। অথচ ‘যে কেউ’ তো দূরের কথা, জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলকেও রাখাইনে ঢুকতে দেয়নি মিয়ানমার; যেতে দেয়া হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে। এমনকি ত্রাণ নিয়ে যেতেও বাধা দেয়া হয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে। মিয়ানমারে কর্মরত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাংবাদিকদেরও প্রবেশাধিকার নেই রাখাইনে। মাঝেমধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাংবাদিকদের রাখাইনে নেয়া হলেও নিয়ন্ত্রিত থাকে চলাফেরা।

৩. ‘রাখাইনের বেশিরভাগ মুসলিম গ্রামই সহিংসতার বাইরে।’

সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ধারণা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ। এরই মধ্যে, বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ৪ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। গেলো সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি হিসেবেই ভষ্মীভূত হয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের ১৭৬টি গ্রাম। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, পুড়ে যাওয়া গ্রামের সংখ্যা ২১৪টি। আতঙ্কে জনমানবশূণ্য হয়ে গেছে আরও অনেক গ্রাম।

৪. ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পায় রাখাইনের সবাই’।

রাখাইন রাজ্যের জনসংখ্যা ৩১ লাখ। এর মধ্যে ১০ লাখই রোহিঙ্গা। যাদের বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠি মনে করে জাতিসংঘ। নিজ দেশে শরণার্থী হওয়া এ জনগোষ্ঠির অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা নেই, নেই অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপনের প্রমাণ দিয়ে আসছে মানবাধিকার কর্মীরা। আনান কমিশনের প্রতিবেদনেও তুলে ধরা হয়েছে, বৈষম্যের চিত্র।

৫. ‘রোহিঙ্গা’ শুধুই জঙ্গি!

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ভাষণ হলেও ৩০ মিনিটে মাত্র একবার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন সুচি। যদিও সেটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে বোঝাতে নয়। রাখাইন সংকটের জন্য ‘আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’কে দোষারোপের সময়ই কেবল ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় সুচির মুখে।

ইব্রাহিম বিন হারুন: সাংবাদিক









Leave a reply