৯২ বছর বয়সেও শরীর-মনে তারুণ্যের রহস্য জানালেন মাহাথির

|

দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে মাহাথির মোহাম্মদের গল্প শুনে শুনে। ১৯৮১ সাল থেকে টানা ২২ বছর মালয়েশিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নিজের জাতিকে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে দাঁড়া করিয়েছেন এই মহানায়ক। ২০১৮ সালে যখন তার বয়স ৯২ বছর, তখন আবারও ফিরে এলেন মাহাথির। গল্প শোনা প্রজন্ম এখন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাবে মাহাথিরের দেশ পরিচালনা আসলে কেমন।

নির্বাচনের আগে গত মার্চ মাসে সিঙ্গাপুর ভিত্তিক দ্য স্ট্রেইট টাইমস মাহাথির মোহাম্মদের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক সুমিকো তান দীর্ঘ সময় ধরে মালয়েশিয়া ও আঞ্চলিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। ধৈর্য্য নিয়ে সেসবের উত্তর দেন কিংবদন্তী মাহাথির। তখনই বলেছিলেন, ‘আমি হার মানতে পারবো না!’

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সুমিকো হাসতে হাসতেই প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা আপনাকে এত তরুণ তরুণ লাগে কেন?! এর রহস্যটা আসলে কী?’

নারী সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন মাহাথির। তারপর বললেন, ‘এই প্রশ্নটা আমাকে অনেকেই করে থাকেন। তাদের সবাইকেই আমি বলি, ‘এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কখনো বেশি খাবেন না।’

‘একবার শরীরে চর্বি জমে গেলে আর সহজে তা কমাতে পারবেন না। আর এটা হচ্ছে আমার মায়ের উপদেশ। মা আমাকে বলেছিলেন, ‘যখন খুব ভাল ভাল খাবার সামনে আসবে, নিজেকে থামিয়ে দাও।’ এটা মানা আসলে খুবই কষ্টকর।’

পেশায় চিকিৎসক মাহাথির বলতে থাকেন, ‘পরে যখন মেডিকেলে পড়াশোনা করলাম, তখন বুঝলাম মায়ের উপদেশ আসলে কতটা মূল্যবান ছিলো। কারণ, বেশি খেলে পাকস্থলী বড় হতে থাকে। নিয়মিতভাবে বেশি খেলে সেটি আকার অনেক বড় হয়ে যায়। এক পর্যায়ে অভ্যাস এমন হবে যে, বেশি না খেলে ক্ষুধা লাগবে। এভাবে বেশি খেতে খেতে আপনার পাকস্থলীর আকার কী হবে বুঝুন!’

‘খেতে ভালো লাগে, এজন্য বেশি বেশি খাওয়া দাওয়া করা। অনেকেই এমনটি করে থাকেন। কিন্তু আমি খুবই নিয়ম মেনে চলি। শুধু এক্ষেত্রে না, আরও অনেক ক্ষেত্রে। আমার মায়ের উপদেশ মেনে চলি। অন্যদেরকেও বেশি খেতে মানা করি। সব সময় মনে রাখবেন, যখন সামনে রাখা খাবারগুলো খুবই চমৎকার, তখন দয়া করে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করেন। জানি এটা কঠিন। কিন্তু কিছুদিন চেষ্টা করলে খুব সহজেই অভ্যাস হয়ে যাবে। এক পর্যায়ে নিজের আবেগ অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে যাবেন’, বলেন মাহাথির।

হার্টের সমস্যার কারণে দুইবার বাইপাস অপারেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ৯২ বছর বয়সে নতুন করে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া এই নেতাকে। এ বিষয়ে বলতে গিয়ে একটু রসিকতার আশ্রয় নেন ‘গ্রান্ডপা’। বলেন, ‘আসলে আমি মনে করি আমি খুব বেশি টেনশন করি না। কিন্তু সমস্যা হলো আমার হার্ট আমাকে বুঝতে চায় না! তাই দুইবার অপারেশন করতে হয়েছে। তবে যাইহোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমি খুবই শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করি।’

শুধু কি শারিরীকভাবে দেখতে তরুণ লাগে তাকে? না, মানসিকভাবেও মাহাথির একজন তরুণ। সাংবাদিক সুমিকো তাই প্রশ্ন করলেন, ‘মনের দিক থেকেও তো আপনি এক জলজ্যান্ত তরুণ! কেমনে এত সজীব ও উদ্যোমে ভরপুর থাকেন সব সময়?!’

এবার আরেক হাসি দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, মেন্টালি ইয়াং! আসলে হয়েছে কী যখন তরুণ ছিলাম, অনেক বই পড়তাম। আমার মূল্যবোধ এগুলো থেকে তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশদের (মালয়েশিয়ার উপনিবেশক) নিয়ে পড়েছি, বীরত্ব ও সাহসিকতার গল্প পড়েছি, জীবনে সৎ ও সঠিক থাকার বিষয়ে পড়েছি, কিভাবে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে হয়- ওগুলো নিয়েও পড়েছি। এসব বিষয় আমার ওপর সব সময় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তরুণ ছেলেমেয়েদেরকে আমি সব সময় অনুরোধ করি, দয়া করে পড়ো। কিন্তু এখন মানুষ বই অতোটা পড়ে না। পড়লে অনেক কিছু জানা যায়। এর মাধ্যমেই আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। আমি চলতে ফিরতে অনেক কিছু দেখতে পাই। কিন্তু অন্য লোকজন তা দেখতে পায় না (কারণ তারা পড়েনি)। আমি কোথাও বেড়াতে গেলে টাকাটা উসুল হয় (কারণ আমি অনেক বেশি দেখতে পাই)!









Leave a reply