মাদারীপুরে চলছে শতবছরের কুম্ভমেলা

|

প্রদ্যুৎ কুমার সরকার, মাদারীপুর
মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কদমবাড়ি মহামানব শ্রী শ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রমে দেশের সর্ববৃহৎ মেলা ৫ দিনব্যাপী চলছে । এ মেলায় হাতে তৈরি গ্রামীণ সামগ্রীর বিশাল স্থান পেয়েছে । মেলায় আগত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরা গ্রামীণ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এ সকল নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেয়ে আনন্দিত। বিক্রি ভাল হওয়ায় বিক্রেতারাও খুশি । বাউল শিল্পীদের আসরসহ ১০৮ টি মন্দিরে দিনরাত চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দেশ বিদেশের লাখ লাখ ভক্তের বল হরিবল, জয় হরিবল, জয় পাগলের জয় ধ্বনিতে মুখোরিত মহামিলন স্থল। ১০৮ টি মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি শেষ হলেও মেলা চলবে ৫ দিনব্যাপী। এরমধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল শিবচরের ভক্তদের আয়োজনে আগত হাজার হাজার দর্শনার্থীদের জন্য ভক্তসেবার।

সরেজমিন একাধিক সূত্রে জানা যায়, কথিত আছে যে, সত্য যুগে দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনে যে অমৃতসুধা উঠেছিল তা চারটি কুম্ভ পাত্রে হরিদ্বার, প্রয়াগ, উজ্জয়িনী ও নাসিক এ চারটি স্থানে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে সাধুরা কুম্ভ মেলার আয়োজন করে আসছেন। ১৩৭ বছর পূূর্ব জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে ১৩ জন সাধু ১৩ কেজি চাল ও ১৩ টাকা নিয়ে রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় ভারতের কুম্ভমেলাকে অনসণ করে এ মেলার আয়োজন করেন। সেই থেকে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রমে ১৬৭ একর জায়গার উপর এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে । এক রাতের মেলা হলেও প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে চলে এ মেলা। প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে পুরো একটি এলাকার বাড়ী-ঘর, মাঠ-ঘাট ও ক্ষেত-খামারে কোন জায়গা খালি থাকে না মানুষের পদচারনায় । সমাগম ঘটে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের । সকাল থেকেই দলে দলে জয় ডংকা বাজিয়ে ও জয় হরিবল ধ্বনি করতে করতে সাধু সন্যাসী ও ভক্তবৃন্দরা বাসে, ট্রাকে, ট্রলারে, ও পদব্রজে আসতে থাকে মেলা প্রাঙ্গনে । ১৩ জৈষ্ঠ সোমবার সকাল থেকে হাজার হাজার ভক্ত আশ্রমস্থলে ডংকা, নানা ধরনের বাদ্য যন্ত্রের তালে তালে আসা শুরু করে। সকাল থেকেই ৮/৯ লাখ ভক্ত এ মেলায় অংশ নিয়ে আশ্রমের  ১০৮ টি মন্দির ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নেয়। প্রখর রোদের মাঝে বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভক্তদের ঢল নামে। দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে ভক্তরা। মানবতার জয়গান নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বসেছে বাউল শিল্পীসহ বিভিন্ন আধ্যাত্মিক শিল্পীদের আসর। মেলায় প্রায় ৫ সহস্রাধিক ছোট বড় স্টলসহ বসেছে বৈচিত্র্যময় ইভেন্ট । মেলা উপলক্ষে এ এলাকার প্রতিটি বাড়িতেই এসেছে দূর দূরান্তের আত্মীয় স্বজন। মেলার ৫ দিনে শ্রীমদ্ভগবদ গীতা পাঠ, আলোচনা সভা, ১৩ টি মন্দির গেটে দেব দেবীদের পূজা, গনেশ পাগলের পূজা, আরতি, প্রার্থনা, প্রতিমা দর্শন, ভজন সঙ্গীত, পদাবলী কীর্ত্তন, বাউল সঙ্গীত, নাটক, যজ্ঞানুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ, পবিত্র স্নান ও নর নারায়ণ সেবা অনুষ্ঠিত হয়। মেলাকে ঘিরে ৩ স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলেছে পুলিশ।

নজর কেড়েছে শিবচরের ভক্তদের দেয়া ভক্তসেবা
এবারের শত বছরের রাজৈরের ঐতিহ্যবাহী গনেশ পাগলের মেলায় ভক্তদের সবচেয়ে নজর কেড়েছে শিবচরের ভক্তবৃন্দদের উদ্যোগে আয়োজিত ভক্তসেবা। শিবচর পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সহায়তায় অনুষ্ঠিত এ ভক্তসেবা চলে দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। একই সাথে চলে বাউল সঙ্গীত। প্রায় ৩৫ হাজার ভক্তদের মাঝে ভূনা খিচুরি বিতরণ করা হয়। বিনামূল্যে খাবার পেয়ে ভক্তরা আয়োজকদের সাধুবাদ জানান।

মেলায় আগত দর্শনার্থী সবিতা রানী বলেন, একমাত্র এই কুম্ভ মেলায় আসলেই বাঁশ, বেত, ও মাটির তৈরি বিভিন্ন সাংসারিক জিনিসপত্র পাওয়া যায়। তাই প্রতিবছর এই মেলায় এসে এসব জিনিস কেনাকাটা করি। দামও খুব বেশি নয়।

আরেক দর্শনার্থী সুমন সাহা বলেন, আমাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যর প্রায় সব কিছুই মিলে গনেশ পাগলের এই কুম্ভ মেলায়। এখানে হুক্কা, বাঁশের কুলা, ফুলের ডালা, বেতের চাল মাপার সের, মাটির বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। আমি হুক্কা ও চাল মাপার সের কিনেছি ।

দর্শনার্থী কিশোর রাহাত হোসেন বলেন, এই মেলায় বায়োস্কপ, সাপের খেলা, নাগরদোলাসহ বিভিন্ন হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যর সমারোহ ঘটে। মেলায় এসে নাগরদোলায় চড়েছি। খুব ভাল লাগছে।

ব্যবসায়ী অনিল দাস বলেন, আমি বেত দিয়ে চাল মাপার সের, দাড়িপালাসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে মেলায় বিক্রি করি। চাল মাপার সের হচ্ছে লক্ষ্মী। এই সের যে ঘরে থাকবে সেই ঘরে সর্বদা লক্ষ্মী বিরাজ করবেই।

রাজৈর গনেশ পাগল সেবাশ্রমের সেবায়েত অতুল ব্রক্ষ্মচারী বলেন, এই গনেশ পাগলের সেবাশ্রমে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও সুন্দরভাবে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখানে ১০৮ টি মন্দিরের কাজ চলছে। লাখ লাখ ভক্তদের উপস্থিতিতে এক মিলন মেলায় রুপ নিয়েছে মেলা প্রাঙ্গন।

রাজৈর গনেশ পাগল সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক প্রনব কুমার বিশ্বাস বলেন, এই মেলায় আগত সকল ভক্তদের নিরাপত্তায় প্রশাসন ও কমিটির পক্ষ থেকে সকল ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। মেলার মূল আকর্ষণ হারিয়ে যাওয়া দেশীয় ঐতিহ্যর বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী। মেলায় দূর দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীরা সুন্দরভাবে ব্যবসা করছে। মেলায় প্রায় ৮-১০ লাখ ভক্তবৃন্দ জড়ো হয়েছিল।

রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদ বলেন, কুম্ভমেলাকে ঘিরে কদমবাড়ী মেলা এলাকায় বিপুল পরিমান পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার জন্য পুলিশ প্রশাসন সজাগ রয়েছে।









Leave a reply