বর্তমান প্রজন্মের কাছে অচেনা নাম ‘কবি বন্দে আলী মিয়া’

|

সনম রহমান

চর্চা আর স্মরণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছেন কবি বন্দে আলী মিয়া। বর্তমানের প্রজন্মের কাছে তিনি যেন এক অজানা নাম। শিশু সাহিত্যের নান্দনিক কবি, বিখ্যাত ময়নামতি চরের কবি বন্দে আলী মিয়ার রেখে যাওয়া কর্মগুলো যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বিলীন হতে বসেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কবির রেখে যাওয়া স্মৃৃতিগুলো সংরক্ষণ করে আগামী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দাবি পাবনাবাসীসহ কবির ভক্তদের।

তিনি শুধু কবিতা, গল্প আর শিশুতোষ ছড়াই রেখে যাননি। তিনি ছিলেন একজন বড়মাপের চিত্রশিল্পী, গান রচয়িতা,  ছিলেন রাজশাহী বেতারের একসময়ের জনপ্রিয় গল্পের দাদু।

২৭ জুন কবি বন্দে আলী মিয়ার ৩৯ তম মৃত্যুবার্ষিক। পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায় ১৯০৬ সালের ১৭ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন বন্দে আলী মিয়া। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কবি বন্দে আলী মিয়া শহরের রাধানগর মজুমদার একাডেমী (বর্তমানে আর, এম একাডেমী) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বৌ-বাজারস্থ ইন্ডিয়ান আর্ট একাডেমী থেকে চিত্রবিদ্যায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কর্মের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ ২০ বছর চাকরি করে অবশেষে তিনি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী বেতারে চাকরি করেছেন। এ সময় তিনি ‘গল্পের দাদু’ নামের একটি শিশুদের প্রোগ্রাম করতেন। কবি বন্দে আলী মিয়া ছিলেন একাধারে গীতিকার, উপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও অসংখ্য শিশুতোষ সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভাধর। তিনি রেখে গেছেন শিশুদের জন্য ১০৫টি শিশুতোষসহ ১৩৬ টি গ্রন্থ।।

এছাড়াও উপন্যাস, গান, ছড়া, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে রয়েছে তার লেখনি। শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কবি বন্দে আলী মিয়া ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যকর্মে তার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯০ সালে মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্য বইয়ে ছিলো কবির কবিতা, আজ তা আর নেই। তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের কাছে।  কবির পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লার বসতবাড়ি কবিকুঞ্জ বিলীনের পথে। ১৯৭৯ সালের ২৭ জুন ৭৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীর কাজিরহাট অঞ্চলের নিজ এই বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

তাকে কবরস্থ করা হয় নিজ গ্রাম পাবনা শহরের রাধানগরে। ১৯৮৭ সালে মরহুম আবু জাফর মুহাম্মদ মোহসিন, মরহুম শফিকুল ইসলাম শিবলী, আয়কর আইনজীবী মরহুম আব্দুল আজিজ, মোসতাফা সতেজ, কবি আব্দুল্লাহেল বাকী, সাংবাদিক আখতারুজ্জামান আখতার, মরহুম আব্দুল মজিদ দুদু, কবি ও গবেষক মজিদ মাহমুদ, সঙ্গীত ওস্তাদ শফিক উদ্দিন আহমেদ, ইসলাম হোসেন ইন্দা, মিলে প্রথম বন্দে আলী স্মরণ পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু এই পরিষদের কার্যক্রমও নেই বহুবছর। কবিকে ঘিরে নেই কোন আয়োজন।

পাবনার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বা জোটভূক্ত কোন সাংস্কৃতিক সংগঠন কবি বন্দে আলী মিয়াকে নিয়ে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, কবির সৃষ্টি সাহিত্য কর্মকে জনমানসে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে এমন নজিরও নেই।

পাবনার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক দুটি কেন্দ্র ললিত কলা কেন্দ্র ইফা এবং বনমালী ইনষ্টিটিউট বা বনমালী শিল্পকলা কখনো কবি বন্দে আলী মিয়াকে নিয়ে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেনি।

একসময়ে পাবনাবাসীর প্রত্যাশার মুখে পাবনা পৌরসভার উদ্যোগে কবি বন্দে আলীর নামে পাবনা বাইপাস সড়কের নামকরণ করা হয়, কিন্তু নাম ফলকটি এখন আর নেই। তার নামে নামকরণ করা হয় পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের নাম।

কবি বন্দে আলী মিয়া শিশু শিক্ষা নিলয় গড়ে তোলা হয় পারিবারিক উদ্যোগে। তা চলেও বেশ কিছু সময়। পরবর্তিতে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষালয়টি।

জেলার আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তরে কবি বন্দে আলী মিয়া নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার প্রতিষ্ঠা থেকে তত্বাবধায়ন করছেন সমাজসেবক ও বিদ্যোৎসাহী সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম রাঙা।

পাবনা পৌরসভার উদ্যোগে শহরের রাধানগরে নির্মাণাধীন মার্কেটের নামকরণ করা হচ্ছে তারই নামে। কবি বন্দে আলী মিয়ার বাড়ি যেহেতু রাধানগারে সেহেতু তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে পাবনা পৌরসভা গ্রহণ করেছে এই উদ্যোগ। তবে জেলাবাসীর অনেকেই মনে করেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার বা যে কোন একটি ভবনের নাম কবি বন্দে আলী মিয়ার নামে নামকরণ করা হোক।

বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জাতীয়ভাবে স্থানীয় প্রশাসনিক উদ্যোগে পালিত হয়েছিলো কবি বন্দে আলী মিয়ার মৃত্যুবার্ষিক। তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলামসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেনি পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে পালিত কর্মসূচি গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিলো দেশব্যাপী। এই একবারই এভাবে পালিত হয় কবির মৃত্যুবার্ষিক। যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম।

কিন্তু পাবনার মানুষের প্রত্যাশা প্রতি বছর কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকটি প্রশাসনিকভাবে সরকারি উদ্যোগে পালিত হোক। কারণ কবি ছিলের এজেলার একজন গুণিমানুষ। এটা তার প্রাপ্তি হওয়া উচিত।

কবি বন্দে আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আমিরুল ইসলাম রাঙা বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য কবি বন্দে আলী মিয়াকে আমরা যথাযথভাবে মূল্যায়ণ করতে পারিনি। সরকারী উদ্যোগে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিক পালন করা উচিত।

কবি বন্দে আলী মিয়া স্মরণ পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ড.মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ বলেন, কবি বন্দে আলী মিয়া যেহেতু একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন সে কারণে পাবনাতে তার নামে একটা আর্ট একাডেমি প্রতিষ্টার উদ্যোগের পাশাপাশি তার লেখা বিভিন্ন গানকে রেকর্ডিং এর মাধ্যমে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গবেষক ড. আব্দুল আলিম বলেন, কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিতাকর্ম ও শিশু সাহিত্য আজ হারিয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে বা সরকারীভাবেও কোন উদ্যোগ নেই তা সংরক্ষণের। আগামী প্রজন্মের কাছে কবির স্মৃতিগুলো তুলে ধরতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগই কবি বন্দে আলী মিয়াকে চেনে না, এটা আমাদের সকলের ব্যার্থতা।

কবি বন্দে আলীর মেয়ে আফরোজা বেগম বলেন, তার পিতা বাংলা সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। আজকে কবির লেখা, গান, আঁকানো ছবি সবই বিলীন হতে বসেছে।

এদিকে কবির মেয়ে হিসেবে সরকারের কাছে তার দাবি তার পিতার রেখে যাওয়া সৃষ্টিগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সে উদ্যোগ গ্রহণ এবং সরকারিভাবে তার পিতার জন্ম ও মৃত্যুদিন পালন হলে অনেক ভালো হবে।

কবির নাতি সাইফুল ইসলাম রিটন বলেন, আজকে কবি বন্দে আলী মিয়ার প্রাণবন্ত সৃষ্টি অনেকেই জানে না। আমরা পারিনি, কিন্তু সকলের চেষ্টায় আমাদের পারতে হবে। এর জন্য দরকার প্রশাসনের সহযোগিতা। পাবনার কোন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থেকেও কবির কথা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়না যেটিও অনেক ব্যাথিত করে ।

কবির নাতনী রওশন আফসার টুকুন বলেন, আজকে কবি বন্দে আলী মিয়া স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। জাতীয়ভাবে তিনি তো সমাদৃত হয়েছেন। কিন্তু তার পরিবারের প্রতি সরকারের নজর দেওয়া উচিত বলে দাবি তার।

তিনি বলেন, আজকে কবি বন্দে আলী মিয়ার লেখা আগে বিভিন্ন পাঠ্য বইতে ছিলো, কিন্তু এখন আর দেখা যাচ্ছে না। তার শিশু সাহিত্য শিশুদের অনেক আনন্দিত করতো। এখন আর পাঠ্য বইতে কবির লেখা থাকে না। যা তাদেরকে অনেক কষ্ট দেয়।

তিনি কবির বসত ভিটা ও মানুষের জন্য পাঠকের জন্য কবির যে সৃষ্টি তা ধরে রাখতে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রশাসন তথা সরকারের প্রতি বিনীতভাবে অনুরোধ জানান।

শিশুদের কবি, গল্প দাদু ও গ্রামের কবি বন্দে আলী মিয়ার স্মৃতি রক্ষায় সরকারি ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবী পাবনাবাসীর।









Leave a reply