চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে যতো গল্প-মিথ

|

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই হয় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ। তবে এই সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ মানুষের মধ্যে এখনও রহস্য তৈরি করে রেখেছে। নানা দেশে নানা কথা প্রচলিত এই গ্রহণ নিয়ে।

গ্রিকদের ধারণা ছিলো, সূর্যগ্রহণ হচ্ছে স্রষ্টার রাগ এবং আসন্ন মৃত্যু ও ধ্বংসের পূর্বাভাস। চীনের মানুষ মনে করতো, স্বর্গীয় ড্রাগন সূর্যকে গ্রাস করে নেওয়ার ফলে সূর্যগ্রহণ হয়। ভিয়েতনামের বাসিন্দাদের ধারণা, বিশাল আকারের একটি ব্যাঙ সূর্যকে গিলে ফেলার কারণে সূর্যগ্রহণ হয়। ইনকা সভ্যতার লোকদের বিশ্বাস ছিল যে, একটি চিতাবাঘ চাঁদকে গ্রাস করার কারণে চন্দ্রগ্রহণ হয়। চাঁদের ওপর আক্রমণ শেষ হলে সে পৃথিবীতে নেমে এসে মানুষদের ওপর আক্রমণ করবে। তাই তারা চাঁদের দিকে বর্শা তাক করে কল্পিত এই চিতাবাঘকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করতো। এমনকি আশপাশের কুকুরদের গায়ে তারা আঘাত করতো, যাতে কুকুরের আর্তচিৎকারে ঐ চিতাবাঘ ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় এবং পৃথিবীতে আর আক্রমণ না করে।

আসলে সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ কী? বিজ্ঞানীদের মতে, যখন চাঁদ পৃথিবী এবং সূর্য এর গতিপথের মাঝে এসে যায় তখন সেটাকে সূর্যগ্রহণ বলে। আর যখন পৃথিবী, সূর্য এবং চাঁদ এর গতিপথের মাঝে চলে আসে তখন সেটাকে বলে চন্দ্রগ্রহণ।

সারাবিশ্ব একবিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ আজ দেখতে পাবে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ১৩ মিনিট ৬ সেকেন্ডে শুরু হয়ে চন্দ্রগ্রহণ শেষ হবে ভোর ৫টা ৩০ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে। এসময় চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করবে। একে ব্লাড মুন বলা হয়। অনেকে চাঁদের এই লাল রংকে অশুভ মনে করেন। তবে এর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছুঁয়ে ছড়িয়ে যায়, সেই আলো আবার পৃথিবীতে আসার পথে অন্য সব রঙ হারিয়ে লাল রঙটি এসে আমাদের চোখে পৌঁছায়, কারণ এই রঙের আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি। আর এ কারণে চাঁদ অনেকটা ‘রক্তিম’ দেখায়, তাই এটাকে ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়।

চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে নানা কল্পকাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এর কোনটির বৈজ্ঞানিক সত্যতা থাকলেও বেশির ভাগই কুসংস্কার হিসেবে প্রচলিত। আসুন জেনেনি চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে প্রচলিত গল্পগুলো-

গ্রহণের সময় খাবার খাওয়া যাবে না

প্রবীণরা বলেন, গ্রহণের সময় যে কোনো ধরনের খাবার গ্রহণ করা যাবে না। এসময় খাবার খেলে বা পানি পান করলে শরীর খারাপ হয়। কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মনে করা হয়, গ্রহণের সময় একপ্রকার তেজস্ক্রিয় রশ্মির বিকিরণ ঘটে। যা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে ক্রিয়া করে খাবারকে বিষাক্ত করে ফেলে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন, খাবারকে বিষাক্ত করতে পারে এধরনের কোনো রশ্মির বিকিরণ গ্রহণের সময় হয় না। যার কারণে খাবার গ্রহণ না করার ধারণাটি ভুল। তবে সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য রশ্মি ভূপৃষ্ঠে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। যার কারণে তাপমাত্রা অনেক কমে যায়। ফলে খাবারের মধ্যে বিষাক্ত জীবাণু আক্রমণ করতে পারে। তাই ওই সময় খাবারকে ভালো ভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

গ্রহণের সময় বিধিনিষেধ না মানলে বাচ্চা ঠোঁট কাটা হয়

ভারতে প্রচলিত রয়েছে, গ্রহণের সময় গর্ভবতী নারী কোনো ধাতব বস্তু ব্যবহার করতে পারবে না। যদি ব্যবহার করে তাহলে নারীর গর্ভের বাচ্চা ঠোঁট কাটা হবে। এ ধারণা আমাদের দেশেও প্রচলিত রয়েছে। তবে মেক্সিকোতে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা পোষণ করা হয়। সেখানে গ্রহণের সময় গর্ভবতী নারীকে পেটের কাছে ধাতব বস্তু ধরে রাখতে হয় বা লাল রংয়ের অন্তর্বাস পরতে হয়। না হলে বাচ্চা ঠোঁট কাটা হবে।

এদিকে এ বক্তব্যগুলোর বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে বংশগত, পরিবেশগত বা ঔষধের প্রতিক্রিয়ায় ঠোঁট কাটা নিয়ে বাচ্চা জন্মগ্রহণ করতে পারে। এটির সঙ্গে গ্রহণের কোনো সর্ম্পক নেই।

সোজা হয়ে না ঘুমালে শিশু বিকলাঙ্গ হয়

গ্রহণের সময় গর্ভবতী মা যদি বাঁকা হয়ে শুয়ে থাকে তাহলে শিশু বিকলাঙ্গ হবে বলে ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই। এছাড়া দীর্ঘসময় গর্ভবতী মা একভাবে শুয়ে থাকলে কষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তাই একজন গর্ভবতী মহিলা অন্য সময়ে যেভাবে চলাচল করেন বা শুয়ে থাকেন, গ্রহণের সময়েও ঠিক সেভাবেই চলতে পারবেন।

গ্রহণের পর গোসল করে অশুভ শক্তি দূর করে ফেলতে হবে

অনেকের ধারণা, গ্রহণ অশুভ শক্তি দ্বারা হয়ে থাকে। তাই গ্রহণের পর গোসল করে অশুভ শক্তি দূর করে ফেলতে হবে। কিন্তু গ্রহণ হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক বিষয়। এর সঙ্গে শুভ বা অশুভয়ের কোনো পার্থক্য নেই। তাই গোসল করে অশুভ শক্তি দূর করার ধারণা একটি কুসংস্কার।









Leave a reply