এনআরসি তালিকা প্রকাশ: আসামে আমরা যেমন আছি

|

রুহুল কুদ্দুস

অবশেষে রাজ্যে ঠানঠান উত্তেজনা আর উৎকন্ঠার সকল অবসান ঘটিয়ে আজ বহুল আকাঙ্খিত ভারতীয় নাগরিকত্ব নথিভুক্তকরন নথীর ২য় ধাপের খসড়া প্রকাশিত হল।

রাজ্যের ৩ কোটি ২৯লক্ষ ৯১ হাজার ৩৮৪ জন আবেদনকারীদের মধ্যে খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ৮৩ হাজার ৬৭৭ জনের নাম, যা মোট আবেদনের ৮২.৩৭ %। বাদ পড়েছেন ৪০ লক্ষ ৭ হাজার ৭০৭ জন।

এরমধ্যে করিমগঞ্জ জেলার ১৩ লক্ষ ২৪ হাজার ৯৬ জন আবেদনকারীর মধ্যে ১২ লক্ষ ১১ হাজার ৯৮৭, অর্থাৎ ৯১.৫১% জনের নাম চুড়ান্ত খসড়ায় এসেছে। বাদ পড়েছেন ১ লক্ষ ১২ হাজার ১০৯ জন।

বৈধ-অবৈধভাবে বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন ১৯৭১ এর পর বাংলাদেশ থেকে আসামে আসা, ভুল কাগজপত্র জমাকারী, বিবাহিত মহিলা, অন্য রাজ্যে জন্মগ্রহণ করা মানুষজন ইত্যাদি। এছাড়া অনেকের নাম বাদ পড়েছে এনআরসি তালিকা প্রণয়নে কর্মরত কর্তাদের হীনমন্যতা ও উদাসীনতার কারণে। বাঙালি যাদের নাম এসেছে তালিকায় তাদের বেশির ভাগের নাম ভুলভাবে এসেছে। এবং অনেকের ধারণা, এটি অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের এক ধরনের ষড়যন্ত্র।

গতকাল রাত থেকে সবারই একটা চিন্তা ছিল- আমার নাম আসবে তো? কারণ এরই মধ্যে বিভিন্নভাবে গুজব ছড়িয়েছে। আমার নিজেরও টেনশন হচ্ছিল, কারণ প্রথম তালিকায় আমাদের ৬ জনের পরিবারে শুধু ছোট ভাইয়ের নাম এসেছিল। এবারে সবার নাম এসেছে। আগেরবার না আসার কারণ ছিল, ছোট ভাই ছাড়া বাকী সবাই পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলাম। পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ সময়মত রিপোর্ট পাঠায়নি। তাই ১ম খসড়ায় বঞ্চিত ছিলাম।

আজ সকাল ১০টায় প্রতিটি NSK কেন্দ্রে ছিল ভীড়। তবে কোথাও তেমন অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। সন্ধ্যায় যখন এই লেখাটি লিখছি তখন পর্যন্ত কোনো অঘটনের খবর পাওয়া যায়নি। কড়াকড়ি ছিল সর্বত্র।

রাজনৈতিক ফেরীওয়ালারা বিভিন্নভাবে উস্কানি দিয়ে নিজেদের আগাম ভোটের বাক্সগুলো করায়ত্ব করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দল ছিল বিজেপি। তারা চেয়েছিল কোনো ভাবে দাঙ্গা বাঁধিয়ে খসড়া প্রকাশকে আটকানো বা ক্ষমতার দিনগুলো কাটানো। তাই বিধায়ক শিলাদিত্যের মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিধায়কদের দিয়ে এনআরসি প্রক্রিয়া ও মুসলমানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করানো রীতিমত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। বিগত সরকারে আমলেও কৌশলে কংগ্রেস একই কাজ করেছিল। এবারও সবকটি রাজনৈতিক দল ঘোলাজলে মাছ ধরতে ব্যস্ত। তার একমাত্র কারণ, ‌’এনআরসি’ ও ‘বাংলাদেশি’ দুটো শব্দ সকল রাজনৈতিক দলের ভোট ব্যাংকের মুল উৎস।

এসব কারণে এনআরসি সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা শংকিত হয়ে সুপ্রীম কোর্টের দারস্থ হলে কেন্দ্র-রাজ্যের সহযোগীতায় বিশাল সংখ্যক শান্তিবাহিনী মজুত করা হয়। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, রাজ্য সরকারে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মুসলিম অধ্যুষিত ৭টি জেলাকে অতি স্পর্শকাতর হিসাবে চিহ্নিত করে কড়া প্রহরাসহ অনির্দিষ্টকালীন জরুরি অবস্থা জারি করে খসড়া প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন।

নাগরিকত্ব বিষয়টি সুপ্রীমকোর্টের তত্ত্বাবধানে থাকায় জনগণের মনে ইতিবাচক আশা ছিল। রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকলে আজ ভাষিক বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কী যে দুর্দশা ঘটতো তা ভারতের, বিশেষ করে আসামের রাজনৈতিক পরিস্তিতি দেখে বুঝে নিতে কারো অসুবিধা হওয়ার নয়। ইতিমধ্যে বিজেপি সরকারে ধর্মের ভিত্তিতে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী-২০১৬’ শীর্ষক বিল দিয়ে আসামী-বাঙালি, হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন ঘটিয়ে গোটা রাজ্য উত্তাল করে তুলেছিল যা এখনো বিরাজমান। নাগরিকত্ব বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে তাদের এখতিয়ারে নয় বলেই বাঁচা গেলো।

শান্তি-শৃংখলার রক্ষার জন্য বিগত সপ্তাহ প্রশাসনিক কর্তাদের রাতের ঘুম উবে গিয়েছিল। ১ম দফার খসড়া প্রকাশের সময়ও গুজবে ভরপুর থাকলেও কাজের সময় কোন ধরনের অশান্তি বিরাজ করেনি। আজও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। সুপ্রীমকোর্ট ও প্রতীক হাজেলার আশ্বাসবাণীতে বঞ্চিতদের অনেকেই ভরসা রেখেছিলেন। এক মাসের মধ্যেই পুনরায় ভারতীয় নাগরিকরা বৈধ কাগজপত্রসহ আবেদন করতে পারবে। অবৈধ আশ্রিতদের ভাগ্য রাজনৈতিক মারপ্যাচের সুতোয় ঝুলছে।

বিগত দিনে আসামের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকে ‘বাংলাদেশি’ বলে সরকারি-বেসরকারিভাবে হেনস্থা করা হতো। এমনকি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা জানমালের ক্ষতির শিকার হতো। এমন কোন জায়গা নেই যে, সংখ্যালঘুদের হেনস্থা বা ট্রল করা হতো না। অথচ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাংলাদেশ থেকে ভারতে বসবাস করতে আসার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এনআরসি খসড়া প্রকাশের সাথে সাথে এখানকার সংখ্যালঘুদের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে। কারণ আজ থেকে ‘মুসলমান’ মানেই বাংলাদেশি এই অপবাদ নিয়ে আর বাস করতে হবেনা।

লেখক: আসামের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা করিমগঞ্জের বাসিন্দা।









Leave a reply