জমজ সন্তানদের একজনকে পেটে রেখেই সেলাই!

|

আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে অন্তঃসত্ত্বা খাদিজার পেটে জোড়া সন্তানের কথা উল্লেখ ছিলো। কিন্তু সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় একটি শিশুকে বের করার পর, অন্যটিকে ‘টিউমার’ ভেবে মাতৃগর্ভ রেখেই সেলাই করে দেন স্থানীয় ক্লিনিকের ডাক্তাররা। আর এভাবে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত হল একটি নবাগত শিশু। জমজ সন্তানের মা হতে পারলেন না খাদিজা। উল্টো নিজের জীবন নিয়েই ঝুঁকিতে আছেন তিনি।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে ‘লাইফ ডিজিটাল হাসপাতাল’ নামের ক্লিনিকে ঘটেছে চিকিৎসকদের অদক্ষতা ও চরম অবহেলার এ ঘটনা।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় খাদিজা এখন ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। সেখানে চিকিৎসা চলছে তার।

বুধবার ঢাকা মেডিকেলের প্রসূতি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ৩৫ দিনের শিশু আদিবা নানুর কোলে ঘুমাচ্ছে অবিরাম। একই সময়ে আলোর মুখ দেখার কথা ছিলো তার আরেক ভাইয়ের। শিশুটির নামও ঠিক করেছিলো পরিবার। কিন্তু আদিবার ভাইটি বোনের সাথে পৃথিবীতে আসতে পারেনি।

খাদিজার মা আমেনা জানান, আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে তার মেয়ের পেটে জোড়া সন্তানের কথাই উল্লেখ ছিলো। কিন্তু অস্ত্রোপচারে একটি শিশুকে বের করার পর, অন্যটিকে টিউমার ভেবে মাতৃগর্ভ রেখেই সেলাই করে দেন স্থানীয় ক্লিনিকের ডাক্তারা। এরপর খাদিজার শারিরীক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালের চিকিৎসকরা খাদিজার স্বজনদের বলেছিলেন, তার পেটে টিউমার আছে।

গত মাসের ওই ঘটনার এক মাস পর খাদিজাকে আরেক ক্লিনিকে নিয়ে গেলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে চিকিৎসক জানান, খাদিজার পেটে টিউমার নয়, আরেকটি মৃত বাচ্চা আছে। গত শনিবার এ ঘটনা ধরা পড়লে ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালের অভিযুক্তরা। ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই গত রোববার গোপনে ওই প্রসূতিকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় এরই মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। ক্লিনিকের অভিযুক্ত দুই চিকিৎসকের একজন ডা. হোসনেয়ারা বেগম মালিগাঁও সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এরই মধ্যে তাঁকে কারণ দর্শানো (শোকজ) নোটিশ দেয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থলে গেলে লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালের লোকজন সটকে পড়ে। যথাযথ অনুমোদন না থাকায় সিলগালা করে দেয়া হয় হাসপাতালটি।

আমেনা বেগম জানান, তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। এক বছর আগে একই উপজেলার দুলালাপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের ওমানপ্রবাসী আবদুল আউয়ালের সঙ্গে খাদিজার বিয়ে হয়। বিয়ের পর খাদিজা অন্তঃসত্ত্বা হলে গত সেপ্টেম্বর মাসে তাকে পাশের দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরের লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার সিজার করতে বলেন।

আমেনা জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ওই ক্লিনিকে ডা. হোসনেয়ারা ও ডা. মঞ্জুরুল ইসলাম খাদিজার অস্ত্রোপচার করেন। তখন একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন খাদিজা। প্রসূতিকে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বের করার পরও তার পেট ফোলা দেখে স্বজনরা ডা. হোসনেয়ারার কাছে জানতে চান। তখন ওই চিকিৎসক জানান, খাদিজার পেটে একটি টিউমার আছে। সুস্থ হওয়ার পর ঢাকা নিয়ে অস্ত্রোপচার করতে বলেন ডা. হোসনেয়ারা। পরে খাদিজা জানতে চাইলেও একই কথা বলেন ওই চিকিৎসক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত করে অভিযোগের সতত্যা পেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

কুমিল্লা মেডেকেল কলেজ সাবেক অধ্যক্ষ ডা. অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এমন আনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

 









Leave a reply