তাহলে কি চ্যালেঞ্জ জয়ে হাথুরুসিংহের শ্রীলংকাই এশিয়ার সর্বকালের সেরা?

|

গত সপ্তায় সনাথ জয়াসুরিয়ার কপি কুশাল পেরেরা যখন ডারবানে অপরাজিত ১৫৩ রানের ইনিংসটি খেললেন, শ্রীলংকা ১ উইকেটে টেস্টটি জিতল- তখন ক্রিকেট রসিক কার না মনে পড়ছিল ভিভ রিচার্ডসকে? শেষ ব্যাটসম্যান ফার্নান্দোকে নিয়ে ৭৮ রানের জুটি, যেখানে ফাস্ট বোলারটির অবদান মাত্র ৬! ১৯৮৪ সালে একটি ওয়ানডেতে ইংল্যাণ্ডের বিপক্ষে মাইকেল হোল্ডিংকে সাথে নিয়ে ১০৬ রানের শেষ উইকেট জুটি গড়েছিলেন ভিভ। যেখানে তার অবদান ছিল ৯৩, আর ম্যাচ শেষে ১৮৯*, অনেকদিন পর্যন্ত ওয়ানডেতে যা ছিল সর্বোচ্চ স্কোর। কুশাল পেরেরার ঐ একটি ইনিংসে মোমেন্টাম পেলো শ্রীলংকা; পোর্ট এলিজাবেথে ৮ উইকেটের জয়ে অবিশ্বাস্য এক সিরিজ পকেটে গেল দ্বীপ দেশটির। প্রথম এশিয়ান দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ জয়!

দুই কুশাল, দুই ফার্নান্দো, এম্বুলডেনিয়া, লাকমাল-ধানঞ্জয়া এভারেজ মানের কিছু ক্রিকেটারের এক দল হারিয়ে দিল, কাগজে-কলমে বিশ্ব ক্রিকেটে সবচে ভারসাম্যপূর্ণ দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে, তাদেরই মাটিতে! তাহলে কি এটাই এশিয়ান কোন দলের এশিয়ার বাইরে সেরা সাফল্য? আসুন খুজেঁ দেখি।

চলতি বছর ৭ জানুয়ারি সিডনি টেস্ট যেদিন ড্র হল, প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে ভারত ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতলো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। ইতিহাস গড়লেন ভিরাট কোহলি! অথচ অর্জনটিকে কেউ অবিশ্বাস্য বলেনি, কেউ হতভম্ব হয়নি! কারণ অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের দূর্বলতম দলটির বিপক্ষে ভারত সিরিজ না জিতলেই বরং অবাক হতেন অনেক ক্রিকেট পণ্ডিত! ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে বিষেন সিং বেদির ভারত ২-০’তে পিছিয়ে পড়েও মেলবোর্ন আর সিডনি টেস্ট জিতে সমতায় ফিরেছিল গাভাস্কার-চন্দ্রশেখরদের দারুণ পারফরমেন্সে। তবে শেষ টেস্ট হেরে হতাশায় পুড়েছিল ভারত। ২০০৩-০৪ মৌসুমে সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত এগিয়ে গিয়েও ১-১ এ ড্র করেছিল। ব্রিজবেনে সৌরভের দারুণ সৌরভ ছড়ানো সেঞ্চুরি আজও ক্রিকেট রসিকদের আড্ডার খোরাক। ম্যাকগ্রা-ওয়ার্নহীন অস্ট্রেলিয়ান বোলিং আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন গিলেস্পি-ম্যাকগিল। এডিলেইডে ২৩৩ রানের এক ইনিংস খেলে ক্রিকেট ভক্তের পিপাসা মিটিয়েছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। কিন্তু, ভারতের যেটুকু যা সাফল্য তা কি শক্তিধর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে?

এবার আসুন পাকিস্তান প্রসঙ্গে! ১৯৭৯ সালে মেলবোর্ন টেস্ট ৭১ রানে জিতে সিরিজে এগিয়ে গিয়েছিল মুশতাক মোহাম্মদের পাকিস্তান। রডনি হগ আর অ্যালান হাস্টের দুর্দান্ত ফাস্ট বোলিং মোকাবেলা করে দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছিলেন মজিদ খান। ব্যাট হাতে জহির আব্বাস আর জাভেদ মিয়াদাঁদের মত নির্ভরতা ছিল পাকিস্তানের। বল হাতে ইমরান খান-সরফরাজ নেওয়াজ আগুনে তীরন্দাজ! অথচ ওয়াকায় ইমরান-সরফরাজ ছায়া হয়ে থাকলেন অ্যালান হাস্টের। ৯ উইকেট নিলেন ভদ্রলোক, বৃথা গেল জাভেদ মিয়াদাঁদ আর আসিফ ইকবালের দারুণ দু’টি সেঞ্চুরি! পাকিস্তান হারালো অস্ট্রেলিয়া জয়ের সেরা সুযোগ।

শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ ঐ মহাদেশে জয়হীন; সুতরাং সিরিজ জয়ের প্রশ্নই ওঠেনি!

১৯৭১ সালে প্রতাপশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৫ টেস্টের সিরিজে ১-০’তে হারিয়েছিল সফরকারী ভারত। পোর্ট অব স্পেইনে দিলীপ সারদেশাইয়ের ১১২ রানের ইনিংস এগিয়ে দেয় ভারতকে। স্পিন সহায়ক উইকেটে ভেল্কি দেখিয়েছিলেন বেদি-প্রসন্ন-ভেংকটরাঘবন ত্রয়ী। স্যার ক্লাইভ লয়েডের দলে ছিলেন রোহান কানহাই, স্যার গ্যারি সোবার্সের মত সর্বকালের সেরারা। কিন্তু, ভারতীয় দলটির দিকে তাকান! যাদের নাম বলেছি তাদের সাথে যোগ করুন সুনীল গাভাস্কারকে। অসাধারণ দুটি দলের লড়াই।

তবে সেরা সময়ের উইন্ডিজকে হারানোর অভিজ্ঞতা হয়নি পাকিস্তানের। ১৯৮৮ সালে ইমরান-আকরাম-কাদিররা এগিয়ে যেয়েও সিরিজ জিততে পারেননি। ব্রিজটাউনে বিধ্বংসী বোলিং করেছিলেন ম্যালকম মার্শাল, নিয়েছিলেন ৯ উইকেট। ২ উইকেটে হারা ঐ ম্যাচটি নিদেন পক্ষে ড্র করতে পারলেও, সেরা টেস্ট সিরিজ জয় হয়ে থাকতো ইমরানের ক্যারিয়ারে। সম্ভবত এশিয়ার বাইরে কোন এশিয়ান দেশের সেরা অর্জনও! কেন বলছি? কারণ ক্যারিবিয়ান দলটিতে ছিলেন- ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হেইন্স, ম্যালকম মার্শাল, কার্টলি অ্যামব্রোস, কোর্টনি ওয়ালশ, জেফরি ডুজন।

শ্রীলংকা না পারলেও, ক্যারিবিয়ান সফরে টেস্ট সিরিজ জয়ের অভিজ্ঞতা আছে বাংলাদেশের। তবে সেটি জমিদারি পতনের পর নির্বাসিত জমিদারের ছাপড়া ঘরে আতিথ্য পাওয়ার মত, ২০০৯-১০ মৌসুমে ভাঙ্গাচোরা এক দলের বিপক্ষে।

এবার আসি টেস্ট ক্রিকেটের আরেক কুলীন ইংল্যান্ডের মাটিতে। ঐ দেশের মাটিতে দু’বার সিরিজ জিতেছে ভারত। ১৯৮৬ সালে ২-০ আর ২০০৭ সালে ১-০ ব্যবধানে। ৮৬’তে গ্রাহাম গুচ, ডেভিড গাওয়ার, মাইক গ্যাটিংয়ের ইংল্যাণ্ড দারুণ এক দল ছিল। গাভাস্কারের শেষ ইংল্যাণ্ড সফরকে স্মরণীয় করে রাখার দায়িত্ব নেন কপিল দেব নিজেই। ২০০৭ সালে পিটারসেন-কুক-স্ট্রাউস-অ্যান্ডারসন সমৃদ্ধ ইংল্যাণ্ডের বিপক্ষে ভারতের সিরিজ জয়টিকেও খাটো করে দেখার উপায় নেই! কারণ ভারতীয় ক্রিকেটের দারুণ সুসময়ে সবশেষ ৩ সিরিজে ইংল্যাণ্ডের মাটিতে হেরে এসেছে ৪-০, ৩-১ ও ৪-১ ব্যবধানে। আর তাই শচীন-সৌরভ-দ্রাবিড়-কুম্বলে-জহির-ধোনি জামানায় এটাই ছিল সেরা সাফল্য।

তবে ইংল্যাণ্ডের মাটিতে সাফল্যের বিচারে ভারতকে পেছনে ফেলেছে পাকিস্তান! ১৯৮৭, ১৯৯২ আর ১৯৯৬ টানা ৩ বার সফরে এসে সিরিজ বিজয়ের হাসি ছিল ইমরান খান, জাভেদ মিয়াদাঁদ আর ওয়াসিম আকরামের দলের। ১-০, ২-১ ও ২-০ ফল ছিল পাকিস্তানের অনুকুলে। ইমরান-ওয়াসিম-ওয়াকারের পেস আর রিভার্স সুইং সিরিজগুলোর ব্যবধান গড়ে দিয়েছিল।

শ্রীলংকাও সেখানে দুটি সিরিজ জিতেছে, ১৯৯৮ সালে একমাত্র টেস্টে কেনিংটন ওভালে জয়াসুরিয়ার ডাবল আর ম্যাডম্যাক্স ডি সিলভার সেঞ্চুরির ম্যাচে আলো কেড়ে নিয়েছিলেন মুরালিধরন ১৬ উইকেট শিকার করে। ২০১৪ সালে ২ টেস্টের সিরিজ শ্রীলংকা জেতে ১-০ ব্যবধানে। অ্যান্ডারসন-ব্রডের মত পেসার, কুক-রুট-বেলের মত ব্যাটসম্যান থাকার পরও অ্যাঞ্জেলা ম্যাথুস হেডিংলি’তে ১৬০ রানের এক ইনিংস খেলে অনভিজ্ঞ এক দল নিয়ে চমকে দিয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকে।

সেই ঘটনার সাড়ে চার বছরের মাথায় এবার যা করলো আরো অনভিজ্ঞ শ্রীলংকা, সেটি হয়ত রুপকথাতেই সম্ভব! যে দলটি আগের ২ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে খাবি খেয়ে এসেছে ৩টি পরাজয় আর একটি ড্র নিয়ে। সেই দলটির কাছে আর কীইবা প্রত্যাশা করার আছে, যখন ভারত-পাকিস্তান দু’ দেশই এই কদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ২-১ ও ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ হেরে এসেছে? ক্রিকেট বিধাতা আসলে মুচকি হেসেছেন আর বুঝিয়ে দিলেন- দেখরে ক্রিকেট বিশ্ব, সমস্যার অতলান্তে হাবুডুবু খাওয়া একটি ক্রিকেট দেশ কি করতে পারে! যদি থাকে চান্দিকা হাথুরুসিংহের মত একজন অসাধারণ কোচ, আর যদি থাকে একঝাঁক সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার! সাংগাকারা-জয়াবর্ধনেরা যে কয়েক বছর ধরে বলে আসছিলেন শ্রীলংকার অসাধারণ এক প্রজন্ম দুয়ারে, বিষয়টি তাহলে অমূলক ছিল না! শ্রীলংকান ক্রিকেট যতই দুষিত হোক না কেন, বাংলাদেশে ২৬ হাজার ডলার মাইনে পাওয়া কোচকে ৪০ হাজার ডলার মাসিক বেতনে দেশে ফিরিয়ে তাহলে ভুল করেনি, কি বলেন?

মানজুর মোর্শেদ
বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন









Leave a reply