‘একটি বল একটি গ্রাম, ফুটবলের নগরী কুড়িগ্রাম’

|

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজের বঞ্চিত আর ঝড়ে পড়া শিশু-কিশোরদের নিয়ে গড়ে ওঠেছে কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুল। এই স্কুলের মাধ্যমে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়া শিশুরা ফিরেছেন লেখাপড়ায় এবং অস্বচ্ছল পরিবারগুলোকেও করা হচ্ছে আর্থিক সহযোগিতা। ফুটবলার তৈরি করে দেশের বিভিন্ন ক্লাবে খেলোয়াড় পাঠিয়ে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সমাজে শিশু শ্রম বন্ধ, মাদক মুক্ত, সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ মুক্ত করতে ঝড়ে পড়া শিশুদের পড়াশুনায় ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ফুটবলে ভাল মানের খেলোয়াড় পাঠানোর লক্ষ্যে ‘একটি বল একটি গ্রাম ফুটবলের নগরী কুড়িগ্রাম’ শ্লোগানে নিজ উদ্যোগে ২০১৩ সালে কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ ফুটবল বিপ্লবী জালাল হোসেন লাইজু।

অর্থ আর নিজস্ব জায়গা না থাকায় অস্থায়ীভাবে বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের একটি কক্ষে। এই স্কুলে খেলতে আসা কিশোর, যুবকরা বই, খাতা-কলমসহ পড়ালেখার খরচও পাচ্ছেন। এমন নানান সহযোগিতার কারণে বাড়ছে খেলোয়াড়ের সংখ্যা। প্রতিদিন বিকেলে কলেজ মাঠে চলে প্রশিক্ষণার্থীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ। এছাড়াও প্রশিক্ষণার্থীদের জার্সি, বুটসহ খেলার সরঞ্জামাদিও দেয়া হয়ে থাকে বিনামূল্যে।

ভবিষ্যতে ধরলা নদীর পারে নিজ জমিতে স্কুল স্থানান্তর করে আবাসিক/অনাবাসিক ব্যবস্থা করে জেলার গ্রাম থেকে মেধাবী ফুটবলারের খোঁজ করা এবং জাতীয় দলে উন্নত মানের খেলোয়াড় পাঠিয়ে দারিদ্রপীড়িত উত্তরের এই জনপদকে এগিয়ে নেবার লক্ষ্যেই কাজ করছেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা।

প্রতিষ্ঠাতা লাইজু একাধারে ক্রীড়ালেখক, গবেষক ও প্রশিক্ষক। শহরের দাদামোড় এলাকার চল্লিশ দশকের মাঠ কাপানো খেলোয়াড় এবং রাজনীতিবিদ মরহুম পনির উদ্দিনের ছেলে তিনি। ছিলেন আশির দশকে জেলা টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়ন। কারমাইকেল কলেজে অনার্স পড়ার সময় ভলিবল ও ফুটবল খেলে সাফল্য দেখান এই খেলাপ্রেমী ব্যক্তি। রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে একাউন্টিংয়ে মাস্টার্স করে পাড়ি দেন ঢাকায়। এসময় তিনি একটি পোশাক কারখানার বড় কর্মকর্তার পদে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মরত অবস্থায় তিনি ক্রীড়া জগৎসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে পরিচিয় ঘটে দেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকের সাথে। ফুটবল সাপোটার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন অনেক দিন। এক পর্যায়ে ঘরের টানে ছুটে আসেন নিজ মাতৃভূমিতে। এলাকার ক্রীড়াঙ্গনে কিছু অবদান রাখার পরিকল্পনা নেন। ঝিমিয়ে পড়া ফুটবলকে চাঙ্গা করতে চালু করেন কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুল। এই স্কুলের মাধ্যমে ফুটবল প্রশিক্ষণ চলছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং ইউনিয়নের বিভিন্ন বয়সের প্রায় সহস্রাধিক খেলোয়াড় আছে এই স্কুলে। শতাধিক খেলোয়াড় প্রতিদিন নিয়মিত ফুটবল প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কলেজ মাঠে।

এই স্কুলের অধীনে স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়মিত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তুহিন,মাহিন,নোমি নোমান এবং মাঝে মধ্যে জাতীয় প্রশিক্ষক স্বপন দাষ, আশিষ ইকবাল রাব্বি এসেও প্রশিক্ষণ দেন। ইতোমধ্যে এই স্কুল থেকে ৬ জন খেলোয়াড় বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ পেয়েছেন। ২০১৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হবার পাশাপাশি ২০১৮ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা খেলোয়াড় উপাধিও লাভ করে এই স্কুলের প্রশিক্ষণার্থীরা। এছাড়াও বসুন্ধরা কিংস ক্লাবেও খেলার সুযোগ পেয়েছে এখানকার খেলোয়াড়।

স্কুলের প্রশিক্ষণার্থী হৃদয় জানান, আমি রংপুর বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা খেলোয়াড় হই। পরবর্তিতে রংপুর বিভাগের হয়ে ঢাকায় খেলতে গিয়ে চ্যাম্পিয়ন হই। আমি এই স্কুলে বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ পেয়ে আজ এতদূর আসতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আমি জাতীয় টিমে খেলতে চাই।

ক্ষুদে খেলোয়াড় সাব্বির জানান, আমার এক সময় অভাবের কারণে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে লাইজু স্যার আমাকে নিয়ে এসে পড়ালেখার খরচসহ পরিবারে আর্থিক সহযোগিতা করেন। এতে করে আমি লেখাপড়ার সাথে খেলোয়াড় হবার সুযোগও পাচ্ছি।

গ্রামীণ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ফুটবলের প্রতি জেলার ঐতিহ্য এবং দেশের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে লাইজুর এই স্কুলটি বড় ভূমিকা রাখবে।

কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুলের প্রশিক্ষক তুহিন বলেন, প্রতিদিন শতাধিক শিক্ষার্থীদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাশ্রমে প্রশিক্ষকের কাজ করছেন তিনি। খেলোয়াড়দের পাচিং,রিসিভ,গোলকিপিংসহ ডিফেন্ডার,স্ট্রাইকার তৈরি করতে সব ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। তবে সরঞ্জামাদী কম থাকায় কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সরকার বা বৃত্তবানদের সহযোগিতা পেলে দেশের বাইরেও খেলোয়াড় পাঠানোর স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জালাল হোসেন লাইজু জানান, সমাজে শিশু শ্রম বন্ধ, মাদক মুক্ত, সন্ত্রাস-জঙ্গী মুক্ত সমাজ এবং ঝড়ে পড়া শিশুসহ হরিজন সম্প্রাদায়ের শিশু/কিশোরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ার এবং দেশের ফুটবল খেলার মান উন্নয়ন করার লক্ষেই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বপ্ন দেখছেন একসময় কুড়িগ্রাম জেলা হবে ফুটবল খেলোয়াড় তৈরির কারখানা।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি এ্যড. আহসান হাবীব নীলু জানান, জালাল হোসেন লাইজু একজন খেলাপ্রেমী মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জেলার ফুটবলকে এগিয়ে নেবার জন্য কাজ করছেন।
টিবিজেড/









Leave a reply