গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদ খনন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

|

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা ফেরাতে ও ফেরি চলাচল সুবির্ধাতে বাহাদুরাবাদ থেকে বালাসীঘাট পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এলাকা খনন কাজ শুরু করেছে বিআইডাব্লিউটিএ। কিন্তু খনন প্রকল্প কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এলাকাবাসীর। তাদের অভিযোগ, অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করে খনন কাজ করা হচ্ছে ফসলি জমিতে। এতে জমির ভুট্ট্রা, বাদাম ও কাউনসহ বিভিন্ন ফসল নষ্টে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে কাজ করছে অন্য আরেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এ কারণে প্রকল্প নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। অনিয়ম ও দায়সারা গোছের নদ খননে উপকার তো হবেই না, বরং ক্ষতির শিকার হচ্ছেন নদী পাড়ের মানুষরা।

এদিকে খননের নামে অনিয়ম-দুর্র্নীতিতে কোটি টাকা লুটপাটের কারণে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে ও সঠিকভাবে প্রকল্পের কাজ সম্পনের দাবিতে বিআইডাব্লিউটি, জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। কিন্তু অভিযোগের পরও প্রকল্প এলাকা তদন্ত বা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা ফেরাতে এবং ফেরি চলাচলের সুবিধার্থে নদের খনন কাজের প্রকল্প হাতে নেয় বিআইডাব্লিউটিএ। প্রায় পৌনে চার শত কোটি টাকা ব্যয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে বালাসীঘাট পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এলাকায় খনন কাজ দায়িত্ব পায় নারায়নগঞ্জের ডকেয়ার লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ বিক্রি দেয় অন্য ঠিকাদারের কাছে। তারপর গত এক মাস ধরে নকশা পরিবর্তন ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেনতেনভাবে কাজ করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় টাঙানো হয়নি সাইনবোর্ড। অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি খনন কাজের নকশা অনুযায়ী কোন লাল পতাকাও।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ শুরুর সময় নদ খনন নীতিমালা ও প্রকল্পের বিধিমালা তোয়াক্কা না করে অনিয়মের মাধ্যমে কাজ করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। অপরিকল্পিতভাবে নদীতে কয়েকটি ছোটবড় ডেজ্রার মেশিন বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। আবার নদীর তলদেশ থেকে উত্তোলন করা বালু ফেলা হচ্ছে নদের তীরেই। নদের পুর্ব অংশে মুল গভীরে খননের কথা থাকলেও তা মানছেনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। অর্থ বাঁচাতে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করে ফসলি জমিতে করা হচ্ছে খনন কাজ। অথচ যেখানে খনন কাজ চলছে সে জমি মালিকানাধীন। এসব জমিতে বিভিন্ন ফসল করে জীবিকা নির্বাহ করেন চরা লসহ নদী পাড়ের মানুষরা। কিন্তু খনন কাজ চলমান থাকায় এসব জমির ভুট্টা, গম, বাদাম ও কাউনসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

চরের জমির মালিক শফি আলম বলেন, কিন্তু কিছু না জানিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জমির মধ্যে খনন কাজ করছেন। এতে ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক কৃষক। এছাড়া যেভাবে খনন কাজ চলছে তা অনিয়ম ও সরকারী অর্থ হরিলুট হবে, জনগনের কোন উপকার হবেনা’।

আবু বক্কর সিদ্দিক ও রেজা মিয়া নামে কৃষক বলেন, ‘চরের সামান্য জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবন চলে তাদের। কিন্তু সেই জমি দখল করে খনন কাজ করছে ঠিকাদার। অথচ কাজ শুরুর আগেও নদ খননের জন্য পুর্ব দিকে লাল পতাকার নিশাদ দেখা যায়। কিন্তু সেখানে খনন না করে মালিকাধীন জমিতে খনন কাজ চলছে।

এ বিষয়ে উড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আজগর আলী বলেন, ‘২৪ কিলোমিটার নদী খননের বরাদ্দ হলেও নকশার পরিবর্তনে খনন কাজে কমেছে কয়েক কিলোমিটার এলাকা। এতে প্রকল্পের টাকা লুটপাটে সুবিধা হচ্ছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের।

উড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ বলেন, ‘দীর্ঘদিনের এলাকাবাসীর দাবি ও জনপ্রতিনিধিদের চেষ্টায় সরকার নদ খননের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের বরাদ্দের খবরে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দ দেখা দেয়। কিন্তু খনন কাজ শুরু সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

এদিকে, অনিয়মের বিষয় জানতে খোঁজাখুজি করেও প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বা বিআইডাব্লিউটিএ’র সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজনও কিছু জানেন না বলে অভিযোগ এড়িয়ে যান। তবে বিআইডাব্লিউটি-এর তদারিকতে থাকা নুরুল ইসলাম নামে এক স্টাফ মুঠোফোনে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী খনন কাজ করছেন তারা। মালিকানাধীন কোন জমি দখল করা হয়নি। এছাড়া খনন কাজে কোন অনিয়মও হয়নি বলে দাবি করেন তিনি’।

এছাড়া এ বিষয়ে জানতে বিআইডাব্লিইটিএ’র প্রধান কার্যালয় এবং কার্যাদেশ পাওয়া নারায়নগঞ্জ ডকেয়ার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিসের টেলিফোন নাম্বারে একাধিকবার ফোন করেও কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবদুল মতিনের বলেন, ‘প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী ও নিয়ম অনুযায়ী খনন কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে নদীতে মালিকাধীন কারো জমি থাকতে পারেনা বলেও জানান তিনি’।









Leave a reply