কোন সে কিক সাকিবের?

|

তাহমিদ অমিত
ক্রিকেট প্রতিবেদক, যমুনা টিভি

সমালোচনার নীল বিষকে কেউ কেউ সবুজে পরিণত করে তাতে ফুল ফোটাতে পারেন। সাকিব আল হাসান তাদেরই একজন। চারিদিকে গেল গেল রব, দেশাত্ববোধের পাল্লায় যখন বর্ডার লাইনে কিংবা বিতর্কের টাইমলাইনে যখন ঘূর্ণিঝড়, তখন সেই নীল বিষ শুষে নেয়ার অসম্ভব এক ক্ষমতা আছে এই অলরাউন্ডারের।

কিভাবে পারেন তিনি? জাদু আছে কি তাঁর হাতে?

ডাবলিনের হোটেলের লবিতে বসে সাকিব নিজেই উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন সেই প্রশ্নের। ৬ মাস পর লাল সবুজ জার্সিতে প্রথম ম্যাচেই ব্যাট-বল কিংবা ফিল্ডিং তিন জায়গাতেই দেখিয়েছেন খেলাটা কতটা সহজাত তার কাছে। এমনটা না, যে আগে তার প্রমাণ রাখেননি। বারবার রেখেছেন, সাকিব বলেই হয়তো তাকে বারবার দেখাতে হয় কেন তিনি বিশ্বসেরা। গণমাধ্যমের তাই তো প্রশ্ন এই যে ফটোসেশনে না থাকা কিংবা তার স্ত্রীর তাঁতিয়ে দেয়া স্ট্যাটাস সব কিছু পেছনে কিভাবে ফেললেন তিনি?

মুচকি হেসে সাকিব উত্তর দিলেন “কিক। সালমান খানের কিক সিনেমাটি দেখেননি? জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিকের প্রয়োজন হয়! কিক মুভির মত কিকের দরকার হয়। আমি সেই কিক পেয়েছি। কিক এসেছে। কিভাবে সেটা আড়ালেই থাকুক। যেভাবেই হোক সেটা এসেছে, আমাকে জাগিয়ে তুলেছে”

হ্যাঁ, সাকিব জেগেছেন এটাই বড় প্রাপ্তি। সেটা যে কিক কিংবা তাড়না থেকেই হোক, তাকে নিশ্চয় দর্শকরা ধন্যবাদ দিবেন। কে না জানে সাকিব যখন মাঠে আগ্রাসী হন কিংবা তেতে থাকেন সেখানে এক ফুৎকারে উড়ে যায় তামাম ক্রিকেট বিশ্বের বড় শক্তিরাও। কিন্তু সাকিব খোলসা করেননি কি সেই কিক কিংবা তাকে তাঁতিয়ে দিলো কে?

কি সেই কিক?

সাকিব বলেছেন বড় কোন বিষয় না, হয়তো ছোট। কিন্তু সেই কিকটাই কাজে লেগেছে। সেই কিক খুঁজতে যাওয়া বোকামি কিংবা অপ্রয়োজনীয়। ধারণা থেকে হয়তো অনেকেই অনেক কিছু বলবেন, কিন্তু কারো মন তো পড়া সম্ভব না। সাকিবের বেলায় তো আরো না!
তবে মাঠে খেলতে না পারার একটা কষ্ট ছিলো। বিপিএলে খেলেছেন ফেব্রুয়ারির শুরুতে। এরপর ইনজুরির জন্য যেতে পারেননি নিউজিল্যান্ড সিরিজ। খেলা হয়নি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। সানরাইজার্স হায়দ্রবাদের হয়ে ১ম ম্যাচ খেলেই ঠিকানা হয়েছে ডাগআউটে। ম্যাচ খেলতে না পেরে হয়তো ক্রমেই বেড়েছে তার ভেতরের ছটফটানি। ওয়ার্নার, ব্যানক্রফট, কেন উইলিয়ামসন, রশিদ খানরা হয়তো নিজের জন্য আয়না হয়েছিলেন তার কাছে। যে আয়নায় নিজের সাজগোজটা কিংবা অলংকারটা ঠিক ভাবে পড়ে নেয়া যায়। আরো ভালো করবার তীব্র ইচ্ছাটা বড় তাড়না হয়েছে সাকিব আল হাসানের জন্য।

ফিট সাকিব!

মন তখনই কথা শোনে যখন ফিট থাকে শরীর। তাই তো ৪ সপ্তাহে ওজন কমালেন ৬ কেজি! অথচ এই সময়ে তিনি আইপিএলে ছিলেন। এই ফাঁকে; দেশের অনুশীলন বাদ দিয়ে টাকা কামাতে গিয়েছিলেন- এই সমালোচনার হুলে বিদ্ধ করেছিলেন বোদ্ধারা। এর বিপরীত মতও ছিলো। আইপিএলে প্রস্তুতির সুযোগ বেশি থাকে, বিশ্বসেরাদের সাথে ডাগআউট শেয়ারের অভিজ্ঞতা তো থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সাকিব কেন পিকনিক আমেজ বাদ দিয়ে এসব সুবিধা নিবেন! না খেললেও তো পকেটে টাকা ঠিকই ঢুকবে, তাই না! কিন্তু সাকিব ব্যতিক্রম এখানেই। কঠোর পরিশ্রম করেছেন এই সময়টায়। ডায়েটের বিশেষ চার্ট বানিয়ে ওজন কমিয়ে এনেছেন। ঠিক যেন ২০০৭ সালের টগবগে এক কিশোর!
দেশ থেকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার ক্রিকেট গুরু মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে। হায়দ্রবাদের অন্যদের অনুশীলনের বাইরে স্যারের সঙ্গে আলাদা করে করেছেন ব্যাটিং বোলিং অনুশীলন। কমলা জার্সি গায়ে চেপে প্রস্তুত হয়েছেন লাল সবুজ জার্সিটার জন্য। সাকিব বলছেন “ এত কষ্ট গত ৮-৯ বছরে বোধহয় করিনি, যত পরিশ্রম ও প্রস্তুতি এই বিশ্বকাপকে ঘিরে”

ভি ভি এস লক্ষণের চোখে সাকিব

হায়দ্রবাদের উপেদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন ভারতের তারকা ভিভিএস লক্ষণ। সালাউদ্দিনকে দেশ থেকে উড়িয়ে এনে সাকিবের অনুশীলনের বিষয়টি দৃষ্টি কেড়েছে তারও। সেই সালাউদ্দিনের সাথে কথা প্রসঙ্গে গুরুত্বপুর্ণ এক বিষয় আনলেন সামনে “ দেখ তোমাদের ওখানে খুব বেশি ক্রিকেটার নেই। সাকিব তাদের মধ্যে সেরা। কিন্তু সেই সাকিবের উপর অনেক চাপ থাকে। দর্শকের চাপ, গণমাধ্যমের চাপ, বোর্ডের চাপ। সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে মোটিভেটেড রাখাটাই কঠিন। চাইলেই পারা যায় না। সাকিব ম্যাচ খেলছে কি খেলছে না সেটা বড় কথা না। এমনকি অনুশীলনেও ওর শেখার কিছু নেই। কিন্তু এই যে তোমাকে ডেকে এনে পরিশ্রম করছে। এটাই সবচেয়ে ইতিবাচক। এই মোটিভেশনটাই জরুরি।”
লক্ষণের ক্রিকেটীয় দৃষ্টি সাকিবেকে খুঁজে পেয়েছে, কিন্তু সমালোচকদের আতশীকাঁচে সবকিছু আসে না। আসবার কথাও না।

তাড়নার কি ফেসবুক আইডি থাকে?

মৃদুভাষী সাকিব এমনিতেই একটু গুটিয়ে রাখেন। বলতে পচ্ছন্দ করেন না। তাই তো সামাজিক মাধ্যমের সাকিবের ভেতরের ‘তাড়নার’ একটা আইডি থাকলে মন্দ হতো না! তাহলে হয়তো সাকিবের সেই তাড়না আইডি চেকিং দিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিতে ‘ আমি জিমে….তৈরী হচ্ছি বিশ্বকাপের জন্য’। না, চেষ্টা একাগ্রতা কিংবা নিবেদনের কোন ফেসবুক আইডি হয় না! হওয়ার দরকারও নাই। প্রমাণের মঞ্চ কোন নীল, কোন টাইমলাইন নয়। সাকিবের কাছে তা মায়াবী সবুজ ঐ ২২ গজ।

সেই ২২ গজের মায়ায় তিনি আরো সবুজ হন। হয়ে থাকুন এভারগ্রিন সাকিব আল হাসান।









Leave a reply