ব্রহ্মপুত্রে নিখোঁজ আংগুর মিয়ার স্ত্রীর ৩ সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন

|

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

চরের জমিতে ফসল কাটতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ গাইবান্ধার সদর উপজেলার ধুতিচরা গ্রামের জেলে আংগুর মিয়ার (৪৪) ১২ দিনেও খোঁজ মেলেনি। অনেক খোঁজাখুজি করেও আংগুর মিয়ার সন্ধান না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী ছামিনা বেগমসহ পরিবারের লোকজন। আংগুর মিয়া বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তা নিয়েও সংশয় রয়েছে পরিবার ও স্থানীয়দের মাঝে। একদিকে স্বামী হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ অন্যদিকে তিন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন স্ত্রী ছামিনা বেগম। দরিদ্র এই পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দূর্বিসহ ১২ দিন অতিবাহিত হলেও তাদের খোঁজ রাখেনি কেউ। এমনকি নিখোঁজ আঙ্গুর মিয়াকে খুঁজে পেতে সরকারীভাবেও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্ত্রী ছামিনা বেগমের।

রবিবার (১৯ মে) দুপুরে সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের ধুতিচরা গ্রামে গিয়ে আংগুর মিয়ার স্ত্রী ছামিনা বেগমের অসহায়ত্ব ও মানবেতর জীবনযাপনের দৃশ্য চোখে পড়ে। বাড়ি-ভিটে ছোট্ট একটি টিনের ছাপড়া ও একটি কুঁড়ে ঘর রয়েছে তার। স্ত্রী ছামিনা বেগম, শামীম মিয়া নামে ১৫ বছর, শাহিন মিয়া নামে ৭ বছর ও ৪ মাস বয়সী সাদেক নামে তিন ছেলে সন্তান নিয়ে সংসার ছিলো আংগুর মিয়ার।

এরআগে, গত ৭ মে সকালে সদরের গিদারী ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের ধুতিচরা এলাকায় নৌকা ডুবির ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১০-১২ জন নারী-পুরুষ নিখোঁজ হন। পরে সাঁতার কেটে অনেকে তীরে ফিরে আসলেও উদ্ধার করা হয় এক শিশুসহ তিনজনের লাশ। কিন্তু চেষ্টা করেও নিখোঁজ আংগুর মিয়া ও মেরেনা আকতার নামে এক শিশুর সন্ধান মেলেনি। বর্তমানে নিখোঁজ মেরেনাকেও ফিরে পাবার আশায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে আজও খুঁজে ফেরেন পরিবারের লোকজন। নিখোঁজ আংগুর মিয়া গিদারী ইউনিয়নের ধুতিচরা গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে ও মেরেনা আকতার (১৩) একই ইউনিয়নের দক্ষিণ গিদারী গ্রামের মিনহাজ মিয়ার মেয়ে।

নিখোঁজ আংগুর মিয়ার স্ত্রী ছামিনা বেগম বলেন, ‘স্বামী আঙ্গুর মিয়া একজন জেলে। মাছ ধরা ছাড়াও কখনো কখনো শ্রমিকের কাজ করে যা আয় হতো তা দিয়ে কোন রকমে চলতো সংসার। তার তিন ছেলে সন্তান রয়েছে। এরমধ্যে চার মাসের ছোট শিশু সন্তান তার কোলে। স্বামী নিখোঁজের পর থেকে তিন সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে বাড়িতেই পড়ে আছি। ঘরে খাবার নাই, আয় রোজগারের কোন উপায় নাই, এ অবস্থায় গত ১২ দিন ধরে এক বেলা খাই তো, দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। স্বামীর সম্পদ বলতে কিছুই নেই, বাড়িতে যে কুঁড়ে ঘর আছে সে ঘরটিও তার (ননদ) স্বামীর বড় বোন করে দিয়েছেন। তিন সন্তানকে নিয়ে কোন রকমে বসবাস করছেন তিনি’।

আক্ষেপের সুরে ছামিনা বেগম বলেন, ‘ঘটনার দিনেই শুধু নিখোঁজ স্বামীকে উদ্ধারে চেষ্টা করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল। এরপর স্থানীয় লোকজন কয়েকদিন খুঁজেও কোন সন্ধান পায়নি স্বামী আংগুর মিয়ার। তিনি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তাও অনিশ্চিত। প্রতিটি দিনরাত কাটে এই বুঝি স্বামী বাড়িতে আসলো। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসছেন না। বেঁচে না থাকলেও অনন্ত লাশ পেলে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। শিশু সন্তানদের নিয়ে কুঁড়েঘরে পড়ে থাকলেও কেউ তাদের খোঁজ রাখেনি। এখন সন্তানদের নিয়ে কিভাবে দিন কাটবে, কিভাবে সন্তানদের মানুষ করবেন এমন চিন্তায় দিশেহারা ছামিনা বেগম’।

চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে ছামিনা বেগম আরও বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়েছি ঠিকেই কিন্তু খাবারের অভাবে তিন সন্তানকে হারাতে চাইনা। অন্যর বাড়িতে কিংবা ক্ষেতে শ্রমিকের কাজ করে হলেও সন্তানকে মানুষ করতে চাই। বর্তমানে কয়েকদিন ধরে গ্রামের মানুষের দ্বারে গিয়ে হাত পেতে চাল তুলে এনে সন্তানদের মুখে খাবার দিচ্ছি। এছাড়া স্বামীর বড় বোনরা (ননদ) একটু সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে, এরপর থেকে কে করবে তাদের সাহায্যে এমন চিন্তায় দিশেহারা ছামিনা বেগম’।

প্রতিবেশী মুহাম্মদ সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ‘বাবা হারা তিন সন্তানকে নিয়ে ছামিনা বেগম চরম বিপাকে পড়েছেন। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে আছে জরাজীর্ণ কুঁড়ের ঘর। বর্তমানে দু’বেলা খাবার জোটানোর ব্যবস্থা নেই তাদের, সরকারীভাবেও কোন সাহায্য পায়নি আংগুরের পরিবার। ঘটনার পর থেকে সন্তানদেরকে নিয়ে দূর্বিষহ দিন যাপন করছেন ছামিনা বেগম। নিখোঁজ আংগুরের তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে। তবে তাদের বড় করা ও লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত বাড়ানোর দাবি জানান তিনি’।

অপরদিকে, নিখোঁজ মেরেনা আকতারের বড় বোন মেরি খাতুন বলেন, ‘অন্যদের সঙ্গে নৌকাতে করে চরে যাচ্ছিলো মেরেনা। কিন্তু নৌকা ডুবির ঘটনায় আজও সে নিখোঁজ। স্থানীয়ভাবে অনেক খোঁজাখুজি করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। বর্তমানে নিখোঁজ মেরেনার শোকে পাথর বাবা-মাসহ পরিবারের লোকজন। মেরেনাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় দিনরাত ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পরিবারের লোকজন। মেরি খাতুনের অভিযোগ, নিখোঁজদের উদ্ধারে প্রশাসনের কোন তৎপরতা নেই। এছাড়া নিখোঁজ পরিবারের কোন খোঁজখবর বা সহযোগিতাও করা হয়নি প্রশাসনের পক্ষ থেকে’।

আংগুরের পরিবার কষ্টে দিন কাটাচ্ছে স্বীকার করে গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ ইদু মুঠোফোনে বলেন, ‘নৌকা ডুবির ঘটনায় আংগুর মিয়া ও শিশু মেরেনা আকতার এখনো নিখোঁজ। তাদের উদ্ধারে যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা করা হলেও নিখোঁজ দুইজন পরিবারকে কোন সহায়তা করা হয়নি। তবে নিজ উদ্যোগে তিনি আংগুরের পরিবারকে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া আংগুরের পরিবারের দুর্ভোগ যাতে লাঘব হয় সেজন্য ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে’।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউওনও) উত্তম কুমার রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ আংগুর মিয়ার পরিবারের বিষয়টি জানা আছে তার। আংগুরের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করা হচ্ছে। আংগুরের স্ত্রী ছামিনা বেগমের নামে ভিজিডি, ভিজিএফ বা বিধবা ভাতাসহ অন্য কোন কর্মসূচিতে অন্তর্ভূক্তের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে’।









Leave a reply