ট্রেনের টিকিটযুদ্ধে রয়েছেন নারীরাও

|

তিনটি টিকিটের জন্য ২ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দিনাজপুরের খাদিজা খাতুন। এর ১২ ঘণ্টা আগে থেকে স্বামী ছিলেন পৃথক লাইনে। অসহ্য গরমে একটু পরপর কান্নাকাটি করছিল শিশুটি। কাঁদতে কাঁদকে কখনও ঘুমায়, ক্ষুধার জ্বালা আর গরমে ফের জেগে ওঠে। শিশুটিকে স্তন পান করাতে পারছিলেন না খাদিজা, সেখানে সে ব্যবস্থা নেই। এর ওপর আছে লাইনচ্যুত হওয়ার ভয়।

ট্রেনের অগ্রিম টিকিটি বিক্রির তৃতীয় দিন ছিল শুক্রবার। এ দিনের চিত্র এটি। আর শুধু খাদিজাই নন, অগ্রিম টিকিট কাটার লড়াইয়ে নেমেছেন এমন অনেক নারী। শিশুরা একা নিরাপদে থাকা নিয়ে সংশয় থাকায় সঙ্গে রয়েছে শিশু সন্তানও। আর তাদের টিকিট কাটার জন্য কমলাপুরে কাউন্টার রয়েছে মাত্র একটি। তাই চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল ক্লেশের চিহ্ন।

টিকিট বিক্রির তৃতীয় দিনেও বহু মানুষ টিকিট না পেয়ে ফিরে গেছেন হতাশ হয়ে। অনেকেই আজকের জন্য থেকে গেছেন লাইনে। আর অনলাইনে টিকিট কাটা নিয়ে আগের মতোই অভিযোগ করে গেছেন টিকিটপ্রত্যাশীরা। তারা জানিয়েছেন, অ্যাপে লগইন করলেই নোটিশ আসে অপেক্ষা করার জন্য। সে অপেক্ষা ঘণ্টার পর ঘণ্টাতেও শেষ হয় না। আর অ্যাপে টিকিট না পেয়ে তারা ছুটে এসেছেন কাউন্টারে। এদিনও দেখা গেছে, একেকটি লাইন কাউন্টার ছেড়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে স্টেশন চত্বর ছেড়েছে। নারীদের লাইনটি তেমনি দীর্ঘ।

কমলাপুরসহ রাজধানীর ৪ স্টেশনে ৩৬টি কাউন্টারে ১২ হাজার ৭৪৮টি টিকিট বরাদ্দ রয়েছে। এ তথ্য কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক জুয়েলের। শুক্রবার সন্ধ্যায় সিএনএস লিমিটেডের কর্মকর্তা শামীম আহমেদ জানান, সন্ধ্যা ৬টা ২৩ মিনিট পর্যন্ত কাউন্টার থেকে ১০ হাজার ৮৭৯টি এবং অ্যাপ থেকে ৭ হাজার ৮৫১টি টিকিট বিক্রি করা হয়েছে। সিএনএসের আরেক কর্মকর্তা জানান, অ্যাপ দিয়ে টিকিট কাটা যাচ্ছে না, এটা ঠিক নয়। একই সঙ্গে আড়াই-তিন লাখ লোক হিট করায় গতি ধীর হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বচ্ছতার জন্য শনিবার (আজ) থেকে কমলাপুর স্টেশনে ডিজিটাল ডিসপ্লে দেয়া হচ্ছে। অ্যাপ থেকে ক’টি টিকিট কাটা হচ্ছে, দিন শেষে কি পরিমাণ টিকিট বিক্রি হচ্ছে এমন সব তথ্য থাকবে।

কমলাপুর, বিমানবন্দর ও ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অগ্রিম টিকিট কাটতে আসা শত শত মানুষ রয়েছেন লাইনে। সবার একটাই প্রত্যাশা, যদি মিলে যায় ‘সোনার হরিণ’। শুক্রবার কাউন্টারগুলোর সামনে বিগত দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল।

খিলগাঁও এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার বিকালে ৩ জুনের টিকিট কাটতে লাইনে (শুরুর দিকে) দাঁড়ান সাজেদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। শুক্রবার মধ্যরাতে লাইনে ঘুমিয়ে পড়লে কে বা কারা তাকে তুলে লাইনের পেছনের রেখে দেয়। ঘুম ভেঙে দেখেন তিনি বহু পেছনে। টিকিট পাওয়া নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হলে কেঁদে ফেলেন তিনি। ফোন দেন স্ত্রী খাদিজা খাতুনকে। সেহরি খেয়েই ২ বছরের কন্যা শিশু মুসফিরাত তাসনীমকে নিয়ে কমলাপুরে চলে আসেন খাদিজা। দু’জন দুই লাইনে। কেউ কাউকে দেখছেন না। তবে মোবাইলে যোগাযোগ হচ্ছে। সকাল পৌনে ১১টার দিকে মাইকে ঘোষণা হল দ্রুতযান ট্রেনের টিকিট শেষ। তখন লাইন ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে স্ত্রীর লাইনের পাশে দাঁড়ান। শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়েন স্ত্রী।

সাজেদুর জানান, তাদের বাড়ি দিনাজপুরে। দ্রুতযান ট্রেনের তিনটি টিকিটের জন্য স্বামী-স্ত্রী এসেছেন। বাবা মমতাজ আলী আর মা জাহানারা বেগম বলে দিয়েছেন সড়ক পথে বাসে নয়, ট্রেনেই বাড়িতে আসতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে আসার দরকার নেই। তিনি বলেন, যদি টিকিট না পান, তাহলে অসুস্থ বাবার সঙ্গে ঈদ করা হবে না তার। বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। বাবার কাঁধে থাকা ছোট্ট শিশু জেগে উঠে। বলতে থাকে বাবা, বাবা…। রাত ৮টার দিকে সাজেদুর এই প্র্রতিবেদকে ফোন করে জানান, ‘ভাই আমরা টিকিট পেয়েছি। শোভন চেয়ার পেয়েছি।’ টিকিট না পাওয়া যাত্রীদের অনেকে জানান, এক একটি কাউন্টার থেকে কয়টি করে টিকিট বিক্রি দেয়া হচ্ছে তা জানতে পারছে না লোকজন। ফলে এক একটি কাউন্টারের সামনে শত শত লোক দাঁড়াচ্ছে। ২টি কাউন্টারের সামনে ডিসপ্লে থাকলেও ১৮টি কাউন্টারের সামনে কোনো ডিসপ্লে নেই।

কাউন্টারের ভেতর টিকিট দূর্নীতি হচ্ছে। বরাদ্দ সব টিকিট ছাড়া হচ্ছে না। বিশেষ করে এসি চেয়ার এবং কেবিনের টিকিট যতৎ সামান্য নাম মাত্র ছাড়া হচ্ছে। বাকি সব ব্লক করে রাখা হচ্ছে।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক জুয়েল জানান, সব আন্তনগর ট্রেনে এসি বগি নেই। যেসব ট্রেনে এসি বগি রয়েছে তার সংখ্যা খুবই কম। ফলে এসি চেয়ার কিংবা কেবিনের টিকিট খুব বেশি নয়। কাউন্টার ওপেন হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই এসব টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, সীমিত টিকিট সবাই পাবে না এটাই স্বাভাবিক। সীমিত টিকিটের বিপরীতে কাউন্টারের সামনে শত শত লোক দাঁড়াচ্ছে। অপর দিকে অ্যাপস’এ সীমিত টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু ওই সীমিত টিকিটের বিপরীতে হাজার হাজার লোক অ্যাপসটিতে হিট করছে। কোনো ক্ষেত্রে ধীরগতি হলেও অ্যাপস থেকে যথাযথ টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।









Leave a reply