বন্ধুত্বের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করলো এসএসসি প্রজন্ম ২০০১, বাংলাদেশ

|

ফারজানা আক্তার রুবি, ২০১৮ সালে হঠাৎ আবিষ্কার করেন তার শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার জীবাণু। স্বামী আশরাফুজ্জামান তার সামর্থের শেষটুকু দিয়ে এক সময় হার মানেন। টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় প্রিয়তমা স্ত্রীর চিকিৎসা। আত্মীয়দের কাছে ধার কর্য করে যেটুকু পেরেছেন স্ত্রী রুবির চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন। একমাত্র সন্তান আফসারা এর চোখের সামনে হেরে যাওয়া বাবা, আর মৃত্যুভয়ে নি:শেষ হয়ে যাওয়া মায়ের প্রতিচ্ছবি। কোন পথ খোলা নেই, সামনে শুধুই অন্ধকার, অনিশ্চয়তা আশরাফুজ্জামানের চোখে।

অথচ একটি বছর পরেই, চিকিৎসকের রিপোর্টে মিলল স্বস্তির খবর। আর কোন ক্যান্সার জীবাণু নেই রুবির শরীরে। রুবি সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকবেন স্বামী আর সন্তানকে ঘিরে। না কোন নাটকের দৃশ্য নয়, বা উপন্যাসের খণ্ড চিত্র নয়। কুমিল্লার আদর্শ সদরের চাপাপুর পোস্ট অফিসের মনাগ্রামের আশরাফুজ্জমানের স্ত্রীর নতুন জীবন পাওয়ার এক সত্য ঘটনা। আশরাফের ছোট্ট পরিবারের ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে সামিল হয়েছিল তারই সমবয়সী বন্ধুরা।

অবাক ব্যাপার হলো আশরাফুজ্জামানের পাশে এসে দাঁড়ানো বন্ধুরা অনেকেই আশরাফকে চেনেও না, কোন দিন দেখাও হয়নি। তারপরও বন্ধুর বিপদে ঠিকই এগিয়ে এসেছে অচেনা অজানা এই বন্ধুরা। গল্পটা আসলে একটি ফেসবুক গ্রুপকে নিয়ে। ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করাদের ফেসবুক গ্রুপ “এসএসসি প্রজন্ম ২০০১, বাংলাদেশ” এর সদস্যরাই তাদের ভাবী রুবির ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে সামিল হয়। টাকার অভাবে যখন রুবির চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, শরীরে ছড়িয়ে পরছে কোলন ক্যান্সারের জীবাণু, একটু একটু করে মৃত্যুর থাবা এগিয়ে আসছে তখন এই ফেসবুক গ্রুপের সদস্যরাই যে যার মত সাহায্য করে গড়ে তোলে আশরাফের স্ত্রীকে চিকিৎসার ফান্ড। ১০ লাখের অধিক টাকা উঠে যায় বিভিন্ন স্তরে। ডাক্তারের পরামর্শে ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে ২৫ দিন রেডিয়েশন থেরাপি ও ওরাল কেমো থেরাপি নেওয়ার পর বন্ধুদের পরামর্শে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় রুবিকে। দিল্লীর ম্যাক্স হাসপাতালে সার্জারির পর বাংলাদেশ স্পেইশালাইজড হাসপাতালে ১২ টি কেমো থেরাপিতে সম্পন্ন হয় রুবির চিকিৎসা। এখন রুবি ক্যান্সারমুক্ত। তবে নিয়মিত চেক আপ এ থাকতে হবে তাকে।

একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে এমন উদ্যোগ নেওয়া, এত টাকা সাহায্য পাওয়া, চিকিৎসার প্রতিটি স্তর সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া, সবশেষে চিকিৎসকের কাছ থেকে ক্যান্সারমুক্তির ঘোষণা, সবকিছুই যেন অবিশ্বাস্য লাগছে ফারজানা আক্তার রুবির কাছে।

রুবি জানান, তার স্বামী চেষ্টার ত্রুটি করেনি, কিন্তু তার স্বামীর সামর্থ সম্পর্কে রুবির ধারনা ছিল। তাই ক্যান্সারের কাছে অসহায় আত্মসমর্পন ছাড়া আর কোন পথ ছিল না। কিন্তু তার স্বামীর ব্যাচমেট “এসএসসি প্রজন্ম ২০০১, বাংলাদেশ” গ্রুপের সদস্যরা যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা অবিশ্বাস্য। আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির কারণে শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা প্রতিটি মানুষের জন্য রুবি প্রার্থনা করেন।

ফারজানা আক্তার রুবির স্বামী আশরাফুজ্জামানের কাছেও এই ঘটনা বন্ধুত্বের এক নতুন সংজ্ঞা নিয়ে হাজির হয়েছে। আশরাফুজ্জামান জানান, চোখের সামনে প্রিয়তমা স্ত্রীর মলিন মুখ, সবাই জানছে আর বেশি দিন বাঁচবে না তার একমাত্র কণ্যার মা, ভালবাসার মানুষটি। এমন সময়ে একজন বাবা, স্বামী যে কতটা অসহায় তা হয়তো কেউ অনুভব করতে পারবে না। তিনি বলেন, আমি যখন আমার স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, তখন প্রজন্মের বন্ধুরা আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি তাদের কাছে আর্থিক ও মানসিক সাপোর্ট পেয়েছি ভীষণভাবে।

আবেগঘন কন্ঠে আশরাফুজ্জামান বলেন, বিপদে পড়ে বুঝেছি আত্মীয় স্বজন দুরে সরে যায়, কিন্তু বন্ধুরা তা করে না। “এসএসসি প্রজন্ম ২০০১, বাংলাদেশ” গ্রুপে সদস্য হতে পেরে আজ আমাদের জীবনে আরেকটি অধ্যায় শুরু হলো।

ফেসবুক গ্রুপ “এসএসসি প্রজন্ম ২০০১, বাংলাদেশ” এর ক্রিয়েটর এডমিন শওকত মঞ্জুর শান্ত রুবির ক্যান্সার মুক্তির খবরে সৃষ্টিকর্তার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। পেশায় সাংবাদিক শান্ত জানান, আশরাফুজ্জামান গত বছর তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে যোগাযোগ করলে গ্রুপ থেকে উদ্যোগ নেন তিনি। সাড়া দেয় দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা “এসএসসি প্রজন্ম ২০০১, বাংলাদেশ” এর অসংখ্য বন্ধু। একদিকে টাকা উঠতে থাকে, একদিকে চলতে থাকে রুবির চিকিৎসা।

শান্ত বলেন, এসময়টাতে আশরাফুজ্জামানকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়াটাকেই বেশি প্রধান্য দেই, প্রতিটি কেমো থেরাপির পর আশারাফুজ্জামান যখন খুশির খবর দিচ্ছিল তখন মনটা ভরে যাচ্ছিল খুশিতে,

শান্ত বলেন, “আমাদের এই কাজে অনেকগুলো বন্ধু নিরলস পরিশ্রম করেছে, বিশেষ করে কুমিল্লা জিলা স্কুলের বন্ধুদের একটি ফান্ড কাজটিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। বন্ধু পারভেজ হক, সাগর সরকার, ডা. কামাল শান্ত, ডা. সাজ্জাদ, অমিত চৌধুরীসহ আরো অনেক বন্ধু এগিয়ে আসায় পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ হয়েছে। রুবি ভাবী সুস্থভাবে বেঁচে থাকুক দীর্ঘদিন, এটাই চাওয়া আমাদের সবার। আশরাফের মেয়ে আফসারা তার মায়ের আদর পাবে, এটার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না।”









Leave a reply