ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি

|

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে কোনো অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এদিকে নির্বাচন নিয়ে ‘জনমনের বিভ্রান্তি’ দূর করতে কিছু জায়গায় আরও স্বচ্ছতা আনার সুপারিশ করেছে কমিটি। আগামীতে নির্বাচন পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা প্রণয়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।

বুধবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সভায় তদন্ত কমিটির এ প্রতিবেদন ও সুপারিশ গৃহীত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব সংগঠন ও প্যানেল। এ নিয়ে লাগাতার আন্দোলনেও ছিল তারা।

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যেসব অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, তদন্ত কমিটি তার কোনো প্রমাণ পায়নি। নির্বাচনে জালিয়াতি ও অনিয়মের কোনো প্রমাণ পায়নি। তারা তদন্ত করে দেখেছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। সেখানে এমন কোনো অভিযোগ কমিটি পায়নি যে, কেউ ভোট দিতে পারেনি, একের ভোট অন্য দিয়েছে বা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কেউ ভোট না দিয়ে ফিরে গেছে। তবে পরবর্তী সময় থেকে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় কিছু নিয়ম-নীতি প্রণয়নের সুপারিশ দিয়েছেন তারা। ভোটাদের হাতে অমোছনীয় কালি লাগানোসহ প্রস্তাবগুলো সিন্ডিকেট গ্রহণ করেছে।

এর আগে ২১ মার্চ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন-২০১৯ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক সাজেদা বানুকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। যদিও কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।

এর সদস্যদের মধ্যে ছিলেন জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক, স্যার পি জে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মো. মহিউদ্দিন, অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিক-উজ-জামান, সিন্ডিকেট সদস্য মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. শারমিন রুমি আলীম। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রলীগ বাদে অংশ নেয়া সব প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বিভিন্ন হলে অনিয়ম, ব্যালট পেপারে আগাম সিল, ভোটে বাধা, কারচুপিসহ নানা অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে পুনঃতফসিলের দাবি জানান তারা। পাঁচটি প্যানেলের প্রার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়।

কুয়েত মৈত্রী, রোকেয়াসহ কয়েকটি হলে নির্ধারিত সময়ে ভোট শুরু হয়নি। সর্বশেষ ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে নামে ছাত্র সংগঠনগুলো। অনিয়মের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে ছাত্র ধর্মঘট ও ক্লাস বর্জনের ডাক দেন তারা। এ অবস্থায় অভিযোগ তদন্তে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিন্ডিকেট সদস্য ও তদন্ত কমিটির সদস্য ড. হুমায়ুন কবির বলেন, ডাকসু নির্বাচনের পর বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন হয়। কমিটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, টিভিতে স্ক্রল দিয়ে এবং হলে হলে নোটিশ দিয়ে অনিয়মের অভিযোগ দিতে বলে। কিন্তু কেউ কোনো জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি। তদন্ত কমিটির সামনে এসে কেউ বলেনি সে ভোট দিতে পারেনি অথবা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এরপরও যে কটি অভিযোগ এসেছে এবং শিক্ষকরা যে অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। ৭টি মিটিং শেষে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। যা সিন্ডিকেট গ্রহণ করেছে।

সিন্ডিকেট সদস্য ড. হুমায়ুন আরও বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। ফলে নির্বাচন পরিচালনায় কিছু অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। তাই এ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য কমিটি কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- ভোট গ্রহণের পূর্বে, ভোট চালকালীন অবস্থায় এবং ভোটদানের পর কী হবে- এ সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যা আগে ছিল না। পাশাপাশি ভোটারদের অমোছনীয় কালি ব্যবহার ও ব্যালট পেপারের ক্রমিক নং দেয়া। সিন্ডিকেট এই প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেছে। আগামী ডাকসু নির্বাচন থেকে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

সিন্ডিকেট সদস্য ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায়নি। ব্যালট বাক্স নিয়ে যেসব কথা বলা হয়েছে, সেগুলোরও সত্যতা মেলেনি। এ ছাড়া রোকেয়া হলের ঘটনা ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে বলেও জানান তিনি। কেন্দ্রের বাইরে কৃত্রিম লাইন তৈরিরও প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি। এরপরও যে দু-চার জায়গা থেকে অভিযোগ এসেছে তা আমলে নিয়ে আগামীতে কেন্দ্রের বাইরে সুব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে কমিটি। এ ছাড়া তদন্ত কমিটির সাক্ষ্যদানকালে শর্ত না মেনে কথোপকথন রেকর্ড করায় জিএস প্রার্থী ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে (এসএম হল) শিক্ষার্থী ফরিদ হাসানকে মারধর ও ডাকসুর ভিপি নূরুল হক নূরসহ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমার পর পুনঃতদন্তে কমিটি গঠন করেছে সিন্ডিকেট।

এর আগে হল প্রশাসন এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। পুনঃতদন্তের বিষয়ে সিন্ডিকেট সদস্য ড. হুমায়ুন বলেন, হলটির আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটি সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা ছিল। সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি (ডিবি) রিপোর্টটি পূর্ণাঙ্গ নয় উল্লেখ করে তা পুনঃতদন্তের কথা বলে। তাই ঘটনার পুনঃতদন্তে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুল আলম জেয়ার্দারকে প্রধান করে সিন্ডিকেট তিন সদস্যের একটি কমটি গঠন করে।

এ কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন স্যার এএফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কেএম সাইফুল ইসলাম খান ও ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক মেহ্জাবীন হক।

এ ছাড়া পরীক্ষা সংক্রান্ত দুর্নীতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের ৪২ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয় সিন্ডিকেট সভায়। এর মধ্যে একজনকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও জানান সিন্ডিকেট সদস্য হুমায়ুন কবির।

সিন্ডিকেট সদস্য ড. মিজানুর রহমান জানান, সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের ইতিহাস বিকৃতি সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পরবর্তী বৈঠকে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সিন্ডিকেটের এই সদস্য আরও জানান, নিয়ম ভঙ্গ করে বিদেশ যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাসরীন ওয়াদুদকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি তাকে অধ্যাপক পদ থেকে পদাবনমন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য সহযোগী অধ্যাপক করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক দিক বিবেচনায় অনির্দিষ্টকাল সময়কে এক বছর করা হয়েছে। যার ফলে শাস্তির দিন থেকে এক বছর পূর্ণ হলে তিনি অধ্যাপক পদ ফিরে পাবেন।

ড. মিজান আরও জানান, সিন্ডিকেটের একই সভায় অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মাহফুজুল হক মারজানের শিক্ষা ছুটির অনুমতি দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ চলমান। ফলে পিএইচডির জন্য শিক্ষাছুটি চেয়ে তিনি আমেরিকা যেতে আবেদন করলে বিষয়টি সিন্ডিকেটে উত্থাপিত হয়। সিন্ডিকেট তার ছুটি মঞ্জুর করে।

সূত্র: যুগান্তর









Leave a reply