নিরাপদ হোক শিক্ষার্থীর জীবন


‘অক্সিজেন মোড়ে মহড়া দিচ্ছে কিছু লোকজন। চুয়েটের শিক্ষার্থীদের খোঁজা হচ্ছে। সিএনজি-যানবাহন থামিয়ে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে চুয়েটের কেউ আছে কিনা? ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েও হামলার হুমকি দেয়া হয়েছে। আমরা এখন এক অনিরাপদ জীবনের বাসিন্দা। পরিবারের লোকজন ফোন করে ঘণ্টায় ঘণ্টায় খোঁজ নিচ্ছে। মনে হচ্ছে আমরা কোনো জিম্মি অবস্থায় আছি। সত্যিই কি আমাদেরকে দেখার কেউ নেই?’

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) এক শিক্ষার্থীর এমন ফেসবুক স্ট্যাটাস কিছুটা হলেও ধারণা দেয় যে সেখানে কোনো ঝামেলা হচ্ছে বা হয়েছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর যখন ল্যাবে গবেষণা করার কথা কিংবা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নেয়ার কথা, তখন তাকে দেখা যাচ্ছে প্রাণভয়ে ভীত। তারা সুস্থ আছেন, পরিবারগুলোর কাছে এটিই যেন সবচেয়ে বড় সুখবর।

গত ১৯ নভেম্বর রাতের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতা বোধ চরমে উঠেছে। সেদিন, প্রতিদিনের মতো রাতের বাসগুলো চুয়েট ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা দেয়। অক্সিজেন মোড়ে বাসগুলো পৌঁছায় রাত পৌনে দশটায়। তিনটি বাসের মধ্যে ‘কর্ণফুলী’ সবার আগে ছিলো। বাসটি হোটেল জামানের কাছাকাছি গেলে স্থানীয় কাঁচাবাজারের কিছু সবজি-ভ্যান ও প্রাইভেট কার রাস্তার উপরে থাকায় চলাচলের পথ পাচ্ছিল না। এসময় বাসের জন্য পথ ছেড়ে দেয়ার আহবান জানায় শিক্ষার্থীরা। এতে স্থানীয় কিছু যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদ করলে ওই ‘স্থানীয় যুবকেরা’ চুয়েটের বাসে উঠে মারধর করে এবং স্ট্যাম্প-রড নিয়ে এসে শোডাউন দেয়। আতঙ্ক ছড়ায় বাসে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। পরে চুয়েটের আরো দুইটি বাস ঘটনাস্থলে পৌঁছালে স্থানীয়রা কিছুটা দমে যায়। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা শুরু করে প্রতিবাদ। ব্যর্থ হয় সমাধানের নানা প্রচেষ্টা । ফলশ্রুতিতে, বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু হয় গণ্ডগোল। সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছে বিষয়টি।

তারপর থেকে পরিস্থিতি আরো থমথমে। এখন নাকি চুয়েট শুনলেই হামলা করা হচ্ছে, খোঁজা হচ্ছে চুয়েটিয়ানদের। রাজধানী বাদ দিলে দেশের সবখানেই শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। নতুন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবাইকে স্থানীয় মানুষদের সাথে মানিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায় নামতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সফল অভিযোজন হয় না। শিক্ষার ব্যবধান, সমাজব্যবস্থা কিংবা জীবনাচরণের পার্থক্য এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটা ঘটছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি)। মূল শহর মাইজদী থেকে প্রায় সাত-আট কিলোমিটার দূরে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস। নভেম্বরের প্রথম দিকে নোবিপ্রবিতেও ঘটে চুয়েটের মতো ঘটনা। স্থানীয়দের সাথে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ। নিকটস্থ বাজার সোনাপুরের কিছু যুবক ক্যাম্পাসে এসে মারধর ও ভাঙচুর চালায় বলে জাতীয় দৈনিকে ফলাও করে খবর হয়। সেখানকার শিক্ষার্থীরাও ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়, উৎকণ্ঠায় তাদের পরিবার। নোবিপ্রবিতে নারী শিক্ষার্থীদের সংকট আরো বেশি। ছেলে বন্ধুর সাথে রিকশায় উঠলেও সমস্যা। স্থানীয় যুবকরা নাকি ক্যাম্পাসে এসে মাদকের পসরা সাজিয়ে বসে। আর ক’দিন আগের বুয়েটের ঘটনা তো সবারই জানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের শিক্ষার্থীদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনায় বুয়েটে এখনো ক্লাস বন্ধ আছে। আমরা কী এমন বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিলাম? যেখানে একজন শিক্ষার্থী সিএনজিতে অটোরিক্সায় বসে তার ক্যাম্পাসের পরিচয় দিতে ভয়ে কুঁকড়ে যাবে কিংবা ছেলে-মেয়েরা একসাথে রিকশায় চলাচলের সময় উৎকণ্ঠায় থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি তার মূল সুর তো সে কথা বলে না। ভয়ডরহীন উচ্ছল-প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস জীবনের গল্পই তো স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি।

স্থানীয়দের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এমন সর্ম্পকের ঘটনা হতাশার। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাহলে কোথায় যাবে? প্রশ্নের আগে কিছু মানুষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রয়োজন আছে। ক্যাম্পাসের অভিভাবক তথা উপাচার্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজটা তাহলে কী? ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিধিতে তো এসব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে? আর শিক্ষার্থী, শিক্ষার্থীদের সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও আরো দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সংকটে উত্তেজনা না ছড়িয়ে সংযত থেকে সমাধানের পথ বের করে আনতে হবে। স্থানীয় জনগণের জীবনাচরণে ক্ষোভের জন্ম দেয় এমন কাজ থেকে নিশ্চয় বিরত থাকতে হবে। আবার একই সাথে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তবেই তো হাসবে-গাইবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। নইলে হয়তো অকালে ঝরে পড়বে কোনো মেধাবী গবেষক, আগামীর প্রতিধ্বনি। ক্যাম্পাস তবে নিরাপদ হোক, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য।

জিয়াউর রহমান চৌধুরী: সাংবাদিক









Leave a reply