যে পথে মিলন হলো মিজান ও বাছিরের…

|

ঘুষ নেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাস্তকৃত পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। সোমবার (২২ জুলাই) রাতে রাজধানীল দারুসসালামের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে দুদকের একটি টিম। পুলিশের বিতর্কিত ও বরখাস্তকৃত ডিআইজি মিজানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়েই বাছির নিজেই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে যান। বিশেষ করে, ডিআইজি মিজানের সাথে ঘুষ লেনদেনের অডিও ক্লিপ ফাঁস হওয়ার পর বাছিরের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মেলায় বাছির ও মিজানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। এর আগে গত, অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় ১ জুলাই গ্রেফতার করা হয় মিজানকে।

এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠায় গত বছরের জানুয়ারিতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মিজানকে। এর চার মাস পর মিজানের সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক। একবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি করে দ্বিতীয় দফায় খন্দকার এনামুল বাছিরকে দায়িত্ব দেয়া হয়। অনুসন্ধান চলাকালেই মিজান দাবি করেন, বাছির তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। প্রমাণস্বরূপ তাদের কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপ ফাঁস করেন মিজান। যদিও বাছির সেটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে অ্যাখ্যায়িত করেছিলেন।

আলোচিত এই দুনীতি মামলার আদ্যোপান্ত পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

  •  ৭ জানুয়ারি, ২০১৮ । ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে অতপর: ৪ মাস সংসার করার পর মিথ্যে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর অভিযোগ করেন মরিয়ম ইকো নামের এক নারী। এ নিয়ে প্রথম সংবাদ প্রচার করে যমুনা নিউজ ও দৈনিক যুগান্তর। কেঁচো খুড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে সাপ। এরপর মিজানের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতি, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া এক সংবাদ পাঠিকাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায় মিজানের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন করায় যমুনা-যুগান্তরের দুই প্রতিবেদককে হুমকি দেন মিজান।
  • ৮ জানুয়ারি , ২০১৮।মিজানুর রহমানের দাপট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আবারও সংবাদ প্রচার করে যমুনা টেলিভিশন ও দেনিক যুগান্তর। সেদিনই, আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
  • ৯ জানুয়ারি ২০১৮। ডিআইজি মিজানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
  • ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে দুদকের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ডিআইজি মিজানকে দুদকে তলব করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
  • ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অসদাচরণের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায় পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটি।
  • ৩ মে, ২০১৮। সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে মিজানকে সাড়ে ৭ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদক পরিচালক কাজী সফিকুল আলম ও উপপরিচালক ফরিদ।
  • ১১ জুলাই, ২০১৮। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় মিজানকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পদবিবরণী জমা দিতে বলা হয়।
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮। মিজানকে তলবি নোটিশ পাঠান ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। ৩০ সেপ্টেম্বর হাজির হতে বলা হয় তাকে। এরই মধ্যেই দুদক উপপরিচালক ফরিদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ তোলেন ডিআইজি মিজান।
  • ২৫ অক্টোবর, ২০১৮। উপপরিচালক ফরিদের বদলে মিজানের সম্পদ অনুসন্ধানে দায়িত্ব বাছিরকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
  • ২৯ অক্টোবর, ২০১৮। ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীর কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব বুঝে নেন বাছির। ওইদিনই সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে মিজানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় বাছিরের।
  • ২৩ মে, ২০১৯। মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত শেষে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেন বাছির।
  • ২৬ মে, ২০১৯। বাছিরের অনুসন্ধান প্রতিবেদন দুদকে গৃহীত হয়।
  • ৯ জুন, ২০১৯। বাছিরের সাথে ঘুষ লেনদেনের কথোপকথনের একাধিক অডিও প্রকাশ করেন ডিআইজি মিজান। দাবি করেন, দুই দফায় বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
  • ৯ জুন, ২০১৯ অডিও প্রকাশের ঘটনা অনুসন্ধানে দুদক সচিব দিলোয়ার বখতকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন হয়।
  • ১০ জুন, ২০১৯। কমিটির সুপারিশে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ এনে বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক।
  • ১১ জুন, ২০১৯। এনামুল বাছির গণমাধ্যমে দাবি করেন, ঘুষ লেনদেনের কথোপকথনে ব্যবহৃত কণ্ঠ সম্পূর্ণ বানোয়াট।
  • ১২ জুন, ২০১৯। মিজানের সম্পদ অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান দুদক পরিচালক মনজুর মোরশেদ।
  • ১৩ জুন, ২০১৯। মিজান-বাছিরের ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হলেন দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। অন্য দুই সদস্য হলেন-সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাউদ্দিন।
  • ১৬ জুন, ২০১৯। মিজান-বাছিরের ঘুষ লেনদেনের কথোপকথনের অডিও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) পাঠায় দুদক।
  • ২৩ জুন, ২০১৯। মিজানের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শেষ হওয়ার কথা জানায় দুদক।
  • ২৪ জুন, ২০১৯। মিজান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা (মামলা নম্বর-১) দায়ের করে দুদক। মামলার অন্য আসামিরা হলেন-মিজানের স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্না, ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসান ও ছোটভাই মাহবুবুর রহমান। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা অর্জন ও ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার ৪২১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
  • ২৪ জুন, ২০১৯। এনামুল বাছিরকে নোটিশ পাঠিয়ে ১ জুলাই দুদকে হাজির হতে বলা হয়। একইসাথে মিজানের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
  • ২৫ জুন, ২০১৯। ফরেনসিক পরীক্ষার সত্যতা জানতে দুদকের ১০ সদস্যের একটি দল এনটিএমসি কার্যালয়ে যায়। একদিনে, মিজানকে সাময়িক বরখাস্ত করার প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবে অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
  • ২৬ জুন, ২০১৯। বাছিরের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা দেয় দুদক।
  • ৩০ জুন, ২০১৯। দুদকের সাবেক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভুঁইয়া ও জায়েদ হোসেন খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অনুসন্ধান কমিটি।
  • ১ জুলাই, ২০১৯। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দুদকে হাজির হননি বাছির। ১০ জুলাই তাকে দুদকে হাজির হতে বলা হয়। এক্দইন, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ মিজানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করেন।
  • ৪ জুলাই, ২০১৯। ঘুষ লেনদেন নিয়ে মিজান-বাছিরের অডিও সংলাপের ফরেনসিক প্রতিবেদন দুদকে জমা হয়। অডিও সংলাপের কণ্ঠ পরীক্ষা করে এনটিএমসি। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় মিজান-বাছির ঘুষ লেনেদেন নিয়ে কথা বলেছেন।
  • ১০ জুলাই, ২০১৯। দুদকে হাজির না হয়ে আইনজীবীকে দিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠান বাছির। একইদিনে, ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ অনুসন্ধানে মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে আবেদন করেন দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস ১৫ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
  • ১৪ জুলাই, ২০১৯। বাছিরকে আবারও নোটিশ পাঠায় দুদক। এবার ১৭ জুলাই সরাসরি দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সামনে হাজির হতে বলা হয়।
  • ১৫ জুলাই, ২০১৯। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অনুসন্ধান কমিটির প্রধান দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা।
  • ১৬ জুলাই, ২০১৯। মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
  • ১৭ জুলাই, ২০১৯। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দুদকে হাজির হওয়া থেকে বিরত থাকেন বাছির।
  • ২২ জুলাই, ২০১৯। রাজধানীর দারুসসালাম এলাকার একটি বাসা থেকে এনামুল বাছিরকে গ্রেফতার করে দুদকের একটি টিম। মিজান ও বাছির দুজনই গ্রেফতার হলেন দুই সোমবারে!

    যমুনা অনলাইন: টিএফ

 









Leave a reply