চলচ্চিত্রে জহির রায়হান

|

সুচিস্মিতা তিথি:

ছোটবেলায় বিটিভিতে দেখা অসংখ্য বাংলা সিনেমার মধ্যে যে সিনেমাটার কথা আজো মনের ভেতরে গেঁথে আছে সেটি- ‘জীবন থেকে নেয়া’। বাসায় টিভি দেখার চল ছিল না তেমন। ছুটির দিনগুলিতে টিভিতে চ্যানেলে ঘোরাতে ঘোরাতে কোথাও ‘জীবন থেকে নেয়া’ পেয়ে গেলে সবাই খুশিমনে দেখা শুরু করতাম। ‘জীবন থেকে নেয়া’ আমাদের কাছে তখন নিতান্তই একটা পারিবারিক গল্প নিয়ে নির্মিত সামাজিক ছবি হিসেবে ধরা দিয়েছিল। নিরীহ স্বামীর চরিত্রে খান আতাউর রহমানের ছাদে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাওয়ার দৃশ্য কিংবা বাড়ির শাসনকর্তা রওশন জামিলের বিরুদ্ধে বাড়ির দেয়ালে পোস্টার লাগানোর মতো দৃশ্যগুলিতে সেই ছোট বয়সেই বেশ আনন্দ পেতাম।

তবে চলচ্চিত্র নয়, জহির রায়হানের সাথে আমি পরিচিত হই মূলত পাঠ্যবইয়ে ছাপানো ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটির মাধ্যমে। স্কুলজীবনেই পড়ে শেষ করেছিলাম জহির রায়হানের উপন্যাস সমগ্র- ‘বরফ গলা নদী’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘আরেক ফাল্গুন’। চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ জন্মানোর পর একজন চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সাথে নতুনভাবে পরিচয় হলো। তার নির্মিত চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র বিষয়ক নানা বই, সেমিনার আর ইন্টারনেটের লেখাপত্র ঘেঁটে পরিচালক জহির রায়হানকে জানার চেষ্টা করে গেছি নিয়মিতভাবে।


ষাটের দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে যে কয়টি চলচ্চিত্র সফল হয়েছিল তার সবগুলোই ছিল হাস্যরসাত্মক এবং প্রায় সবগুলোতেই বাস্তবতা-বিবর্জিত প্রেম প্রাধান্য পেয়েছিল। নিমার্ণ কৌশল ও চিত্রনাট্যের দিক থেকে ভিন্ন পথে হেঁটেছিলেন জহির রায়হান। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সালাউদ্দীন পরিচালিত যে ‘নদী মরুপথে’ চলচ্চিত্রেও তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন । ১৯৫৯ সালে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন তিনি। জহির রায়হান রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র মরিয়ম কোনো মানুষ না বরং একটা ভাস্কর্য হিসেবে সুলতান নামের চরিত্রটির ব্যক্তিগত জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকে। ব্যতিক্রমধর্মী কাহিনী, সাবলীল ভাষা, উপস্থাপনা ও নির্মাণশৈলীর জন্য এই ছবিটি সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রায় সব সমালোচকই তখন জহির রায়হানকে সময়ের তুলনায় অগ্রবর্তী নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। ছবিটি ব্যবসা সফল হয়নি।
১৯৬২ সালে তিনি কলিম শরাফীর সাথে যৌথভাবে নির্মাণ করেন সোনার কাজল। চলচ্চিত্রটি ১৯৬৩ সালে শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে।

সে সময়কার চলচ্চিলগুলোর মধ্যে নির্মাণের দিক থেকে সবচেয়ে গোছানো চলচ্চিত্রটি ছিল ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩)। চলচ্চিত্রটির কাহিনী একটি নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে। ষড়যন্ত্র, নীচতা আর হিংসায় ভারাক্রান্ত বাড়িতে একটি মেয়ের জীবনযাপন এবং পরবর্তীতে বিদ্রোহ নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। চলচ্চিত্রটি পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার, নিগার পুরস্কার এবং ফ্রাংকফুর্ট চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ পুরস্কার পায়। এই ছবিটির জন্য তাকে ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। এই চলচ্চিত্রটিও ব্যবসাসফল হয়নি। জহির রায়হান ব্যাপক অর্থকষ্টে পড়েন। সম্ভবত এজন্যই এই স্বাধীনচেতা নির্মাতা এরপর বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকেন।

১৯৬৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নির্মিত প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’। চলচ্চিত্রটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং ব্যবসাসফল হয়। এটি পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে। উর্দু ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ (১৯৬৫) বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র। দ্বিতীয়বারের মতো উর্দু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে জহির রায়হান গোটা পাকিস্তানে একজন বাঙালি চলচ্চিত্রকার হিসেবে বাঙালির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।


সে সময় বাংলা চলচ্চিত্রকে প্রতিষ্ঠিত ও টিকিয়ে রাখার ফর্মুলা হিসেবে বাংলার লোককাহিনীর উপর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা দেখা দেয়। সালাহউদ্দীনের পরিচালনায় নির্মিত ‘রূপবান’ (১৯৬৫)-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা সেসময়কার প্রায় সব নিমার্তাদের ফোক চলচ্চিত্র নির্মানের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছিলো। ফোক ঘরানার এসব চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায় জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ (১৯৬৬)। ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘বেহুলা’ হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর উপর নির্মিত হয়েছিল।

একের পর এক লোককাহিনী নির্ভর, ফোক চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকায় দর্শকের মাঝে একসময় একঘেয়েমিতা দেখা দিতে থাকে। একইসাথে, শহুরে পরিবেশের পারিবারিক গল্প নিয়ে নির্মিত কিছু চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শকের আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। সেসময়ে জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭)। এটি ব্যবসাসফল সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত হয়। মোহাম্মদ নজিবর রহমান এর বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক মর্যাদাপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘আনোয়ারা’ অবলম্বনে এ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। ছবিটির দর্শকপ্রিয়তার জন্য অন্যান্য নির্মাতারাও তখন লোককাহিনী থেকে সরে গিয়ে বর্তমান শহুরে সমাজব্যবস্থাকে তুলে ধরে এমন সব গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকতে থাকেন এবং বলা চলে, এরই ফলাফল হিসেবে তখন বাংলা চলচ্চিত্র সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

জহির রায়হান নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) আপাতদৃষ্টিতে একটি সামাজিক ছবি হিসেবে সাধারণ দর্শকের কাছে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটিই দেশের প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য সংবলিত চলচ্চিত্র। প্রচলিত বাংলা চলচ্চিত্র ও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সকল উপাদান যেমন- অভিনয় ও উপস্থাপনে নাটকীয়তা, জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর উপস্থিতি, অতিরিক্ত প্রসাধনীর ব্যবহার-বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। এর মাঝেও ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি অনন্য। কারণ এটি একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের অন্যতম রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে উঠেছিল। শ্যুটিং এর সময় থেকেই এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছিল জহির রায়হানকে। শুটিং চলাকালে একদিন এফডিসিতে আর্মি এসে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জহির রায়হান এবং রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যায়। ‘যদি এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাবার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে তবে তার সব দায়ভার তিনি বহন করবেন’- এমন বন্ড দিয়ে সেখান থেকে ছাড়া পান জহির রায়হান। ছবিটির শুটিং হয় সাভার, এফডিসি এবং জহির রায়হানের বাড়ির ছাদে। মুক্তির পরদিনই নিষিদ্ধ হলো প্রদর্শনী। সব সিনেমা হল থেকে আর্মি সিনেমার রিল জব্দ করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেন্সরবোর্ডে নানা কাঠখড় পোড়ানোর পরে ছবিটি পুনরায় মুক্তি পায়। শুধুমাত্র বাংলাদেশ না, মুক্তিযুদ্ধের সময় ছবিটি কলকাতার হলগুলোতেও ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল।


মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত প্রথম তথ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য নির্মিত হয়েছিল। নির্মাতা জহির রায়হান এ তথ্যচিত্রে পাকিস্তানিদের চালানো গণহত্যার বিষয়টি অসংখ্য আলোকচিত্রের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তথ্যচিত্রটিতে জহির রায়হান দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী কার্যক্রম নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের একটি উন্নত জীবন, স্বাধীনতার জন্য যে অবিরাম সংগ্রাম তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হাতে আঁকা ছবি, ফটোগ্রাফ, প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীদের তৈলচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং নানা সময়ে ধারণকৃত ফুটেজের সমন্বয়ে নির্মিত ‘বার্থ অব আ নেশন/এ স্টেট ইজ বর্ন’ (১৯৭১)। এ চলচ্চিত্রটিতে ১৯৮৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালির সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন দিক দেখতে পাওয়া যায়।

জহির রায়হানের অসমাপ্ত ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এখনো মুক্তির অপেক্ষায়, এটি বর্তমানে ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।

জহির রায়হান একদল নির্মাতাকে সাথে নিয়ে চলচ্চিত্রশিল্পের পূর্ণ জাতীয়করণের পরিকল্পনা করেছিলেন। এ পরিকল্পনায় চলচ্চিত্রের মান নিশ্চিতকরণের জন্য একদল নবীন পরিচালককে সরকারি বেতনভুক্ত করা, দেশের চাহিদা অনুযায়ী চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও গল্পের পুনরাবৃত্তি বর্জন, স্টুডিও নির্মাণ, সব সিনেমা হলকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসকল পরিকল্পনা বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে পারতো। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য জহির রায়হানের নেতৃত্ব ছিল অপরিহার্য।

১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও লেখক শহীদুল্লা কায়সারের খোঁজ করতে তিনি পাকিস্তানি সহায়তাকারীদের অধ্যুষিত ঢাকার মিরপুরের শহরতলিতে যান, তিনি আর ফিরে আসেননি। তার এই অন্তর্ধানে চলচ্চিত্রশিল্প জাতীয়করণের বিষয়টি আর সামনে এগোয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই এসকল পরিকল্পনা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র নিয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা অনুষ্ঠিত হলেও এখনো পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে কোনো চলচ্চিত্র উৎসব হয়নি। আর এসব সেমিনারে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি তেমন দেখা যায় না। শুধুমাত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছাড়া জহির রায়হানের আর কোনো চলচ্চিত্র টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দেখানো হয় না বললেই চলে। তার ‘কখনো আসেনি’ কিংবা ‘কাঁচের দেয়াল’ দেখার জন্য নিজ উদ্যোগে সিডির দোকানে ঘুরাঘুরি কিংবা ফিল্ম আর্কাইভে যোগাযোগ করতে হবে।

‘স্টপ জেনোসাইড’ চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ পাকিস্তানি গণহত্যার দলিল এ চলচ্চিত্রটি সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল!

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ।

তথ্যসূত্রঃ
১. আলমগীর কবির (১৯৭৯), ‘বাংলাদেশে চলচ্চিত্র’
২. পাকিস্তান মুভি ডাটাবেজ









Leave a reply