'ভূমিধস বিজয়' কী? বাংলাদেশে এর ব্যবহার শুরুই বা কবে?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
ছবি: এআই জেনারেটেড
মেহেদী হাসান রোমান⚫
সদ্যই শেষ হলো জাতীয় নির্বাচন। দেশের ১৩তম সংসদে বিপুল পরিমাণ সংসদ সদস্য নিজ এলাকার জনগণের তো বটেই, প্রতিনিধিত্ব করবেন একটি সুনির্দিষ্ট দলের। ভোটে আসনের নিরিখে তারা অতিক্রম করেছে 'ডাবল সেঞ্চুরি'। বাকি আরও অর্ধশতাধিক দল মিলেও পেরোতে পারেনি এর অর্ধেক। এই যে বিপুল জয় বা অন্যদের চেয়ে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে মসনদ দখলের প্রতিযোগিতায় সফল হওয়া, রাজনৈতিক শব্দচয়নে একে অভিহিত করা হয় 'ভূমিধস বিজয়' হিসেবে। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে এই সাফল্যের সঙ্গে ভূমিধসের সম্পর্ক কী?
আক্ষরিক অর্থে ভূমিধস শব্দ শুনলে মনে হতে পারে কোনো স্থানে চোরাবালি, ফাঁপা মাটি কিংবা বন্যায় নদীর পাড় ভেঙে মাটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি 'ল্যান্ডস্লাইড' শব্দের সরাসরি বাংলা করলে এটিই দাঁড়ায়।
আপেক্ষিক কিংবা রূপক অর্থে বলা যায় পাহাড়ি গা বেয়ে যখন বিশাল মাটির স্তূপ তীব্র বেগে নিচে পড়তে থাকে, তখন তার সামনে যেমন কোনকিছুই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তেমনি রাজনীতির ময়দানেও যখন বিপুল জনমতের জোয়ার প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো ভেসে নিয়ে যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ যখন একেবারেই বিলীন হয়, তখনই তাকে বলা হয় ভূমিধস বিজয়। এই ধরণের বিজয়ী প্রার্থী মূলত তার প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ‘কবর’ দেন।
তবে, ভোটে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’র কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। কতটুকু ব্যবধান গড়ে জয় পেলে এই বিশেষণ দেয়া যাবে, তার মানদণ্ডও নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যম, সাংবাদিকরা যদি নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনে সার্বিক আবহ বিবেচনায় বিশাল জয় দেখতে পান— তখনই এই শব্দ ব্যবহার করে থাকে্ন।
ঊনবিংশ শতকের আশির দশকে এর ব্যবহার বড় পরিসরে দেখা যায় প্রথমবার। সময়টা ১৮৮৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেই সময় তখনকার সংবাদমাধ্যমগুলো প্রথমবার বড় ক্যানভাসে একটা লাইন লেখে 'Grover Cleveland won by a landslide'- কারণ তিনি বিরোধীদের তুলনায় বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন।
সেই থেকে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে 'ল্যান্ডস্লাইড' শব্দটি 'বিপুল ব্যবধানের জয়' বোঝাতে ব্যবহার শুরু হয়। অবশ্য এর আগেও এটি ব্যবহার হয়েছে, ১৮৪০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসনের বিশাল ব্যবধানের জয়কে বর্ণনা করতে গিয়ে তৎকালীন সংবাদমাধ্যমগুলো এই উপমাটি ব্যবহার করে।
পরে শব্দটি আমেরিকান ইংরেজি থেকে ব্রিটিশ ইংরেজিতেও চলে আসে। তারপর ভারতীয় উপমহাদেশে এবং অবশেষে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশেও।
বাংলাদেশে 'ভূমিধস বিজয়' শব্দের জনপ্রিয়তা মূলত শুরু হয় পাকিস্তানি আমলের শেষ বছর। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান অংশে যখন একটি দল ১৬৯ আসনের ১৬৭টিতে জয় পায়, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিকে বোঝাতে 'ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টোরি' ব্যবহার করে।
এর আগে, আজকের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ১৯৫৪ পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়েও সেই সময়ের পত্রিকায় এর ব্যবহার দেখা যায় না। তারও আগে, ১৯৪৬ অবিভক্ত বঙ্গীয় আইনসভা নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগ ও শরৎচন্দ্র বসুর কংগ্রেসের আসনের পার্থক্য ছিল মাত্র ১১। ব্রিটিশ ভারতে বাংলা অঞ্চলে ১৯৩৭ সালের আইনসভা নির্বাচনের আগের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও তৎকালীন সংবাদপত্র যে এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত ছিল না, তা বলা যায়।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বছর তিনেক পরেই সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতি ঘটে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থাকায় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইস্যু নিয়ে বেশি মাতামাতি দেখা যায়নি। এর মাঝে তিনটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়, যার মাঝে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ব্যবধান ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে, তখনকার পত্রিকাগুলোও 'ভূমিধস' শব্দ ব্যবহার করেনি।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদে সরকারি দল ১৪১ আসন পায়, যা ৩০০ আসনের আইনসভায় বিরোধীদের চেয়ে ৫৩টি বেশি। ১৯৯৬ সপ্তম সংসদে তা আরও কমে আসে, সরকারি দলের ১৪৬ আসনের বিপরীতে বিরোধী দল পায় ১১৬টি। পার্থক্য খুবই কম।
মূলত, বাংলাদেশে 'ভূমিধস জয়' ব্যবহার হয় ২০০১ সালের নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে সরকারি দল নিজেদের জোটভুক্ত আসনের হিসাবের বাইরে এককভাবে নিজেরাই পায় ১৯৩টি আসন। যা বিরোধী দলের পাওয়া ৬২ আসনের চেয়ে ১৩১টি বেশি। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও এমন কিছু দেখা যায়। সেবার পার্থক্য ছিল ২০০।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলাফল, জাতীয় নির্বাচনের আগে সভা-সমাবেশ, টেলিভিশন টক শো'তে 'আমরা ভূমিধস জয় পেয়েছি', 'আমরা ভূমিধস বিজয়ের অপেক্ষায়/পেতে যাচ্ছি'- কথাগুলোর সঙ্গে আমরা অনেকটাই পরিচিত।
এবার বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী দল বিরোধী দলের চেয়ে আসন বেশি পেয়েছে ১৪১টি। এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। কারণ ৩টি আসনের ফলাফল এখনও বাকি। 'ভূমিধস বিজয়' হিসেবে একে অভিহিত করা যথার্থ।
/এমএইচআর