যেভাবে জোড়া লাগলো জাহের-রুপার ভাঙা সংসার

|

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার উত্তর চরমার্টিন গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ আহমদের মেয়ে রূপা আক্তার। ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে একই গ্রামের হোসেন আহমদের ছেলে আবদুল জাহের-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি পারিবারিক কলহের জের ধরে আবদুল জাহের তার স্ত্রী রুপাকে তালাক দেয়। যেকারণে তাদের সাজানো গোছানো সংসারটি ভেঙে যায়।

সম্প্রতি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে গ্রামীণ এ দম্পতির ভাঙা সংসার ‘জোড়া’ লেগেছে। জাহের তার ভুল বুঝতে পেরে তালাকনামা প্রত্যাহার করে রুপাকে পুনরায় বিয়ে করেছে। এই সুযোগে বাবা-মায়ের বিয়ের মিষ্টি খেয়ে বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করলো তাদের দুই শিশু সন্তান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবদুল জাহের একজন বেকারি শ্রমিক। স্বল্প আয়ে ভালোভাবেই চলছিল রুপা ও তার সংসার। কিন্তু হঠাৎ করে পারিবারিক ছোটখাটো বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে রুপার সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ভুল বোঝাবুঝি দেখা দেয়। এ নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি জাহের তার স্ত্রী রুপাকে তালাক দেয়। কিন্তু রুপা তার সাজানো গোছানো সংসারটি ভাঙতে নারাজ। কিন্তু সে কি করবে? আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে অধিকার আদায় করবে? তাহলে তো অনেক টাকার দরকার! কিন্তু তার দরিদ্র বাবার পক্ষে এতটাকা যোগান দেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা অবস্থা তার। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে রূপা তার বাবার বাড়িতে প্রায় ৪ মাস কাটিয়ে দিল।

এরপর একদিন রুপা ছুটে গেল জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে। সে জানতে পেরেছে, এখানে সরকারিভাবে আইনি সহায়তা পাওয়া যায়। এজন্য কোনও টাকা-পয়সা দিতে হয় না। রুপা গত ১৬ মে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে একটি অভিযোগ দায়ের করে। তবে সেটি মামলা নয়, মামলা ছাড়াই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ন্যায্য অধিকার আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে সেখানে।

জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও সিনিয়র সহকারী জজ ফাহাদ বিন আমিন চৌধুরী বলেন, লিগ্যাল নোটিশ পেয়ে আবদুল জাহের অফিসে এসে জানায় তিনি সংসার করবেন না। তবে দেনমোহরের সব টাকা পরিশোধ করতে পারবেন না। যতটুকু পারেন কিস্তিতে পরিশোধ করবেন। তাকে মামলার কুফল ও সামাজিক মানহানি সম্পর্কে বোঝানো হয়। তবুও তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। এজন্য দেনমোহরের কিছু টাকাও জমা দিয়ে যান।

এ নিয়ে রুপা কিছুটা হতাশ হয়েছিল। কারণ ইতোমধ্যে তালাক কার্যকর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই হতাশার রেশ কাটতে বেশি দিন লাগেনি। মাত্র তিনটি আপোষ বৈঠক। এরই মধ্যে রুপা ও জাহেরের ভাঙা সংসার ‘জোড়া’ লেগে যায়। জাহের, তার ভুল বুঝতে পেরে তালাক প্রত্যাহার করে নেন এবং রুপাকে পুনরায় বিয়ে করার সম্মতি জানান। পরে জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা তার অফিসে কাজী ডেকে বিয়ের আয়োজন করেন। এসময় নববিবাহিত দম্পতি, তাদের দুই শিশু সন্তান, বিয়ের সাক্ষী, কাজী, ইউএসএআইডি ও এইড কুমিল্লা-এর প্রতিনিধি সহ উপস্থিত সকলকে মিষ্টি মুখ করানো হয়। গত মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবদুল জাহের ও রূপা আক্তারের আপোষ চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়।

আবদুল জাহের বলেন, মাথা গরম হওয়াতে অনেক বড় ভুল হয়ে গিয়েছিল। আমার সাজানো গোছানো সংসারটাই হারাতে বসেছিলাম। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতায় আমি আমার সংসার ফিরে পেয়েছি। ফিরে পেয়েছি, আমার স্ত্রী ও সন্তানদের।

জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ফাহাদ বিন আমিন চৌধুরী বলেন, ‘রাগ, জেদ থেকে নেয়া সিদ্ধান্তের নেতিবাচক পরিণতি হয়। প্রকৃত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও ভালো-খারাপের ভারসাম্য যাচাই করলে যেকোনো বিরোধ থেকেই ইতিবাচক পরিণতির দিকে অগ্রসর হওয়া যায়।’









Leave a reply