নেই মুক্তিযুদ্ধের নতুন গান

|

পৃথিবীর আর কোনো দেশে নিজ দেশের স্বাধীনতা নিয়ে এত গান আছে বলে মনে হয় না, যতগুলো আছে বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সৃষ্ট সেসব গানই যেন এখনও আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। ওই সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের অগ্রগণ্য ভূমিকার কারণেই শতশত মুক্তিসেনা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে। সে সময় শিল্পীর কণ্ঠে গীত হয় ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’, ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’, ‘নোঙর তোল তোল’সহ মন উথাল করা সব গানসহ আরও নানা ধরনের দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনায় আগুন ঝরানো উদ্দীপক গান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এমনি সব দেশাত্মবোধক গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণে সঞ্চারিত করেছে যুদ্ধের চেতনা, দেশের মানুষের মনে জাগিয়েছে স্বাধীনতার আশার বাণী।

একদল মুক্তিকামী শিল্পী সুরকার, গীতিকারের সমন্বয়ে তৈরি গান গাইতেন শিল্পীরা। মুক্তিসেনারা এসব গান শুনে মাতৃভূমি রক্ষায় অকুতোভয়ে শত্রুর প্রাণঘাতী আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে নিরস্ত্র অবস্থাতেই দেশের জন্য লড়ে যেত। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শিল্পীদের গান দেশের মুক্তিসেনাদের উৎসাহিত করেছে। সে সময়ে শিল্পীদের সংগ্রামী কণ্ঠের গান সাড়া জাগিয়ে তোলে বাংলার পথে-প্রান্তরে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অজিত রায়, আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, ফকির আলমগীর, প্রবাল চৌধুরী, রথীন্দ্রনাথ রায়, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, শাহীন সামাদ, সুজিত রায়, বানী কুমার চৌধুরী, কল্যাণী ঘোষ, মিহির কুমার নন্দী, জয়ন্তী লালা, মৃণাল ভট্টাচার্য, শীলা মোমেন, উমা ইসলাম, নমিতা ঘোষ, শেফালী ঘোষসহ আরও অনেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সঙ্গীত পরিবেশন করে উৎসাহিত করেছেন পুরো বাঙালি জাতিকে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও বলতে হচ্ছে ওসব গান ছাড়া নতুন আর কোনো মুক্তিযুদ্ধের গান আমাদের এ অঙ্গনে তৈরি হয়নি।

তবে কি আমাদের চেতনা হারিয়ে গেছে, নাকি সেসব গানের আবেদন আর আগের মতো নেই। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘একটা সময় গান গেয়ে মানুষ হেসেছে, কেঁদেছে। গানের বাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ যুদ্ধে গেছে। এখন গানের কথায় একটা আকাল চলছে। দেশের গান গাইতেও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বর্তমান প্রজন্মকে। কারণ তো অনেক, তবে বিষয়টি দুঃখজনক। কারণ বলতে নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। অনুরোধ বলি আর পরামর্শই বলি তরুণদের প্রতি আমার একটাই কথা, তারা সব গান করুক পাশাপাশি দেশের গানও করুক। তা না হলে তো নিজের গোড়াকে অস্বীকার করা হল।’

প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আসলে এখন তো অনলাইনের যুগ। গান অনলাইনে প্রকাশ হচ্ছে। সে জন্য তাড়াতাড়ি তারকা হওয়ার জন্য অনেকেই হয়তো দেশাত্মবোধক গানের চেয়ে অন্যান্য গান করছে। তাছাড়া এখন দেশের গান লেখা এবং সুর করার মানুষও কম। যারা আছেন তারা তা কেন করছেন না- এটা আমার জানা নেই। তবে এটা আমাদের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।’

দেশের গানে নতুনদের অনাগ্রহ প্রসঙ্গে আরেক প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বলেন, ‘দেশাত্মবোধক গানের প্রতি তরুণ শিল্পীদের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি সত্যি নয়। তবে নতুন করে দেশের গান না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। এখন শ্রোতাদেরও চাহিদার ধরন বদলে গেছে। এ জন্য অনেক নির্মাতা দেশাত্মবোধক গানের চেয়ে অন্যান্য গান প্রকাশে বেশি আগ্রহী। আবার তরুণরাও এ পথে চলছে। তারা মনে করেন, দেশের গান তো বছরে দু-একদিন মানুষ শোনে। যার ফলে এ গানের প্রতি তাদের আগ্রহ কম হয় বলে আমি মনে করি।’









Leave a reply