পৃথিবীতে হলিউডের বাস্তবতা

|

নূরনবী সরকার:

‘গেরামে ওলাবিবি আইছে। ইয়া আল্লাহ মাপ কইরা দাও। আতঙ্কে সবাই শিউরে উঠলো। গনু মোল্লা ওজু করছিলো, সেখান থেকে মুখ তুলে প্রশ্ন করলো, কোনহানে আইছে ওলা বিবি? কোন বাড়িতে আইছে?’  মকবুল বললো, মাঝি-বাড়ি।

‘মাঝি-বাড়ি?’ একসঙ্গে বলে উঠলো সবাই। ‘কয়জন পড়ছে?’ তিনজন।

‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস (১৯৮৪), জহির রায়হানের অনন্য এই লেখনিতে ডায়রিয়া রোগের কবলে অসহায় গ্রামীণ মানুষগুলোর আর্তনাদ ফুটে উঠেছে। জহির রায়হানের অনন্য কীর্তির অ্যানাটমি লিখতে কিবোর্ডে হাত রাখিনি। আতঙ্কে, বন্দিদশাপূর্ণ এক দুনিয়াকে ভিন্নচোখে দেখার প্রয়াসে এই চরণগুলি গুজরান করছি। আধুনিক যুগ। এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়া হাতের কাছে। কোটি কোটি মাইল দূরের মহাকাশও মানবের ‌আয়ত্তে। মঙ্গলেও বসতি গড়ার সুখবরের অপেক্ষায়।

বাস্তবতা হলো, ২০২০ সালে এসে দুনিয়া অসহায়ভাবে করোনা নামক ভাইরাসকে মোকাবেলা করছে; প্রাণ দিয়ে, অর্থনীতি ও জীবন দিয়ে। কোনো কিছুতেই দমছে না ১০০ ন্যানোমিটার (যা ইলেকট্রন মাইকোস্ক্রোপ দিয়ে দেখতে হয়) সাইজের কোভিড-১৯ ভাইরাস। এরই মাঝে ৩৮০ বারের বেশি বিজ্ঞানীদের ধোঁকা দিয়ে হাইব্রিড এই ভাইরাসটির জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের বদল ঘটেছে। বিজ্ঞানীদের গলদঘর্ম করে ছাড়ছে করোনাভাইরাস। নেই কোনো সুখবর। একমাত্র সমাধান এখন সঙ্গনিরোধ, মানুষে মানুষে দূরত্ব ও গৃহবন্দি থাকা।


এর আগে, মানুষ হাত ধোয়া নিয়ে বা স্যানিটাইজার ব্যবহার করা নিয়ে এখনকার মতো সচেতনতা দেখায়নি। মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমাজের শ্রেণি বিভাজন এক কাতারে নেমে এসেছে যেন। সূচি-অসূচি ছিল কিন্তু মানুষে মানুষে স্পর্শের প্রতি দুনিয়া আগে কখনও এত সন্দেহপ্রবণ ছিল কী?

এত ক্ষুদ্র এক ভাইরাস- যা খালি চোখে দেখা যায় না। অ্যাটোম বোমার থেকেও বহুগুণ শক্তিশালী! যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে দানবীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে গোটা বিশ্বে। রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা, খেলা সবখানে এখন লকডাউন। উন্নত-গরীব রাষ্ট্র- সবাই এখন দিশেহারা। শত্রু করোনাকে বধ কীভাবে করবে?

বউ জামাইকে, ছেলেবন্ধু মেয়েবন্ধুকে, পীর মুরিদরে, মুরিদ পীরকে- কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। না জানি কার কাছে আছে করোনা। বিশ্বাস, আড্ডা, সম্ভাষণ, বলতে গেলে চন্ডীপাঠ থেকে জুতা সেলাই, দেবালয় থেকে গণিকালয় সবখানে সর্বগ্রাসী করোনা আচরণ ফেলেছে মারাত্মক প্রভাব। দুনিয়াজুড়ে ঘরে থেকেও মানুষকে বন্দিশালার যন্ত্রণা দিচ্ছে এই করোনা। ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের সামনে জনশূন্যতা!


এমন দশায় প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তার কাছে করুণার ভিখারি হতে হবে। তার আগে সচেতন হন। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। সবাই এটা জানি। তবে, সবচে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, সহমর্মিতা, ভালবাসা দিয়ে এই দুর্যোগে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঘরে থাকুন। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে মানুষের উপকারে আসুন। হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত লোভ ও দীনতা পরিহার করতে হবে। ক্রান্তিকালে মানবিকতা, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণিভেদ সবকিছুকে ভুলিয়ে দেয়। সেই মানবতার অমোঘ বাণীতে মানুষের উচিত তারা যে সৃষ্টির সেরা জীব সেটার প্রমাণ দেয়া।

আজ হলিউডের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছে দুনিয়া। হলিউডের বাস্তবতায় সমাধানও আছে নিশ্চয়। জানি না কবে আমরা মুক্তি পাবো করোনার করাল থাবা থেকে।

শেষ করছি হাজার বছর উপন্যাসের কয়েক ছত্র ধার নিয়ে -‌‌‍‍‍‌‌‌‌‍
‘ওলা বিবি গেলেন। আর দিনকয়েক পরে বৃষ্টি এলো জোরে। আকাশ কালো করে নেমে এলো অবিরাম বর্ষণ। সারারাত মেঘ গর্জন করলো। বাতাস বইলো আর প্রচণ্ড বেগে ঝড় হলো’। ‌

আমাদের ধরণীকে বাঁচাতে হবে আমাদের যতক্ষণ আছে প্রাণ। বাঁচাতে হবে নিজেদের। নিজেকে ভালো রাখুন। অপরকে ভালো থাকতে সহায়তা করুন। বিপদে সাহস রাখুন। কেটে যাক করোনা ভীতি। প্রতিরোধের হাতিয়ার জ্বলুক সবার মাঝে। উহানবাসী পেরেছে। বাকি দুনিয়াও পরাস্ত করবে করোনাকে।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, যমুনা টেলিভিশন।









Leave a reply