করোনাকালেও পেশাদারিত্বে অবিচল তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ

|

ছবি: মোঃ নুরুল আবছার।

মো. নুরুল আবছার:

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিমেষেই লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে পুরো পৃথিবী। বিশ্বায়নের চরম উৎকর্ষের যুগেও আমরা সবাই আজ সবার থেকে বিচ্ছিন্ন। অথচ কেউ কি ভাবতে পেরেছিল এমনটি হবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাংলাদেশে আসার পর, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছে যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা।

কিন্তু এই মহামারি মোকাবেলায় ডাক্তার, নার্স, আনসার, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা যেন অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। যেহেতু এখনো পর্যন্ত এ রোগীর কার্যকর কোনো ঔষধ আবিস্কৃত হয়নি, তাই এই মহামারি থেকে জনসাধারণের জীবন রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরীকেই সবচেয়ে কার্যকরী উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞগণ।

আর এই জনসচেতনতা তৈরিতে দেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম ও সর্ববৃহৎ ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার লড়ে যাচ্ছে তার সবটুকু দিয়ে। যেকোনো দুর্যোগের মতো করোনাকালেও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে দূর্যোগে উপকূলীয় জনগণের লাইফ লাইন খ্যাত এই রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম।

ঝড়ঝঞ্ঝাটে যখন দেশের সব যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও প্রচার ব্যবস্থা অসহায় আত্মসমর্পণ করে, তখনো বাংলাদেশ বেতার নিজস্ব জেনারেটর ও রেডিও তরঙ্গের সাহায্যে পৌছে যায় ১লাখ ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের প্রতিটি ঘরে বিনামূল্য।

বাংলাদেশ বেতার দেশের স্বল্পশিক্ষিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠি থেকে শুরু করে আধুনিক ধারায় অভ্যস্ত নগরবাসীদের জন্য সময়োপযোগী অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচার করে আসছে। দেশে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বাংলাদেশ দেশজুড়ে ১৪টি আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ৮টি বিশেষায়িত ইউনিটের মাধ্যমে একাধিক এ.এম এবং এফ.এম ব্যান্ডের সাহায্যে সরকার নির্ধারিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য নির্দেশনা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার করে আসছে।

বাংলাদেশ বেতার এই ক্রান্তিকালেও তৃণমূল জনগণের জন্য তাদের আঞ্চলিক ভাষায় সাবলীল ও সহজবোধ্য করে বিভিন্ন বিনোদনমূলক ও সচেতনতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচার করছে যা রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম হিসাবে বাংলাদেশ বেতারকে অনন্য মাত্রায় স্থান করে দিয়েছে।

এমনকি করোনা ঝুঁকির মধ্যে সম্প্রতি দেশে আঘাত হানা ঘুর্ণিঝড় আম্পানে আবারও দেশের উপকূলীয় জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় লাইফ লাইনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় বাংলাদেশ বেতার। এসময়ে সকল ধরনের ছুটি বাতিলপূর্বক ২৪/৭ নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশেষ আবহাওয়া বুলেটিন এবং সরকার নির্ধারিত করণীয়সমূহ প্রচার করা হয়।

অন্যান্য সকল সাধারণ ছুটির মতো করোনাকালীন সময়ে সাধারণ ছুটিও তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য অধরাই থেকে যায়। কারণ এটি রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম, এটি কখনো বন্ধ হয় না, বন্ধ হতে পারে না।

তাই করোনায় সরকার সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর সরকারের অনেক অফিস বন্ধ থাকলেও তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিরামহীন কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ বেতার এক সেকেন্ডের জন্যও তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করেনি, বরং কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করেছে। উল্লেখ্য, তথ্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের বড় অংশটিই দেশের সবচেয়ে বড় ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারে পদায়ন করা হয়।

কারণ ব্রডকাস্টের কাজের ধরন ও বৈচিত্র্যই এমন। এখানে ভুলের কোন সুযোগ নেই, সঠিক ও নির্ভুল তথ্যটি প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সাজে নিত্যনতুন বিষয় তুলে ধরতে হয় জনসাধারণের সামনে, যা মুহূর্তেই পৌঁছে যায় টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয়া। শুধু টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয়া বললেও ভুল হবে, বাংলাদেশ বেতার তার বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পৌঁছে যায় ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, চীন জাপানসহ বিশ্বের প্রায় অর্ধশত দেশে।

এছাড়াও তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ সকল মন্ত্রণালয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা পদেও কর্মরত। এই মহামারি সময়ে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়গণ দিনরাত কাজ করছেন মানুষের জীবন রক্ষায়, আর তাদের সতল কাজেই ছায়ার মতো লেগে আছেন জনসংযোগ কর্মকর্তারা, কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস, যাতে দ্রুততম সময়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশনা পৌছে দিতে পারে সকল গণমাধ্যমে।

এভাবেই একে একে আক্রান্ত হন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পিআরও, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পিআরও, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পিআরওসহ আরও অনেকে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার সুস্থ হয়ে পুনরায় দাপ্তরিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করে জনগণকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তথ্য ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তা বেতারের উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান)ও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, দেশের একমাত্র স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারে কর্মরত কর্মকর্তাদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ বেতার “স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র” নামে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট নামে খ্যাত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের এক বলিষ্ঠ প্রচার কাণ্ডারি।

তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বেতারের কর্মকর্তারা আজও বাংলাদেশের যেকোন জাতীয় প্রয়োজনীয়তায় মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে জনগণের সেবা করাকে নিজেদের ইবাদত মনে করে আসছে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: বিসিএস (তথ্য) সভাপতির একান্ত সচিব। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। সহকারী পরিচালক (গণসংযোগ), বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়।









Leave a reply