করতোয়া নদীতে বালু উত্তোলণের মহোৎসব

|

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা

প্রশাসনের চোঁখের সামনেই গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীর অর্ধশতাধিক পয়েন্টে চলছে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। এতে করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কসহ নদীর তীরের জনবসতি। প্রতিদিন বালু বোঝাই অসংখ্য মাহেন্দ্র ও ট্রাক্টর অবাধে চলাচলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী, এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কিছু কাঁচা-পাকা রাস্তাও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কয়েকটি গ্রুপ করে বালু তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। বিষয়টি বেশ কয়েকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও, কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষুদ্ধ জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী।

প্রথম দেখায় মনে হবে, নদী পথ সচল রাখতে চলছে সরকারী প্রকল্পের কোন কাজ। করতোয়া নদীর বুক চিড়ে জেগে উঠা চরে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলনের এমন মহাউৎসবের চিত্র গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের। আইনের তোয়াক্কা না করে নদীর তলদেশে থেকে গভীর করে চলছে বেপরোয়া এই বালু উত্তোলন। তালুককানুপুর ইউনিয়নের চণ্ডিপুর ও সমসপাড়া দুটি মৌজা জুড়ে নদীতে বসানো হয়েছে অসংখ্য ড্রেজার ও শ্যালোইঞ্জিন চালিত মেশিন। অনেকে নদীতে মেশিন বাসানোর কাজ করছে।

সোমবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গেলে এলাকাবাসী জানায়, চণ্ডিপুর ও সমসপাড়া দুটি মৌজার একাধিক জায়গায় কয়েক বছর ধরে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে লাখ লাখ টাকার বালু তুলে বিক্রি করছে সংঘবদ্ধ একাধিক সিন্ডিকেট। নদী থেকে উত্তোলন করা এসব বালু বিক্রির উদ্দেশ্যে স্তুপ করে রাখা হয় ফসলি জমি, বসতবাড়ির উঠান আর রাস্তার ধারে। দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকা থেকে বালু তোলায় ঝুঁকির মুখে পড়ছে রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক, কাটাখালি ব্রিজ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রতিবছর বর্ষায় তীব্র হয় করতোয়ার ভাঙন। কিন্তু নদীর মাঝ থেকে অবাধে বালু তোলায় আসছে বর্ষায় ফসলী জমি ও বসতবাড়ি ভাঙনের আশঙ্কায় পড়েছেন নদীর তীরবর্তী কয়েক এলাকার মানুষ।

চণ্ডিপুর গ্রামের আবদুর রশিদ বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঁচা-পাকা রাস্তার উপর দিয়ে চলাচল করছে বালু বোঝাই অসংখ্য মহেন্দ্র ও ট্রাক্টর। এসব ট্রাক্টরের দাপটে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচা-পাকা রাস্তার বিভিন্ন অংশ। তাছাড়া রাস্তায় আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হয় পথচারীসহ জনসাধারণকে’।

সমসপাড়ার গ্রামের ফরিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘দিনের আলোতে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন চললেও প্রতিবাদ করতে সাহস পাননা স্থানীয়রা। স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজসে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অবাধে বালু তুলে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বালু উত্তোলন বন্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষুদ্ধ ভূক্তভোগীরা’।

রাব্বী মিয়া নামে অপর জমি মালিক বলেন, ‘নদীতে তাদের জমি রয়েছে। বালু ব্যবসায়ীরা তাদের না জানিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছেন। বালু উত্তোলন বন্ধ করতে ও বাঁধা দিলে তারা মারধরসহ হুমকি-ধামকি দেয়’।

চণ্ডিপুর ও সমসপাড়া সড়কে চলাচলকারী ভ্যান চালক আকতার হোসেন বলেন, ‘ভ্যানে করে যাত্রীদের নিয়ে চলাচল করতে প্রতিদিন তাদের কষ্টে পড়তে হয়। ট্রাক্টর চলাচলে রাস্তা ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় ভ্যান চালাতে সমস্যা ও ভ্যান দুর্ঘটনায় পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে’।

বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীর মধ্যে কালাম মিয়ার দাবি, ‘প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া রাস্তা দিয়ে ট্রাক চলাচল করতেও টাকা দিতে হয়। এসব টাকা স্থানীয় বাবু নামের একজনকে দিতে হয়। তিনি সব ম্যানেজ করেন।

তালুককানুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘অবৈধ্যভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে বারবার চেষ্টা চালানো হয়। বালু উত্তোলনের সাথে জড়িতদর নোটিশ করে গ্রাম আদালতে ডাকা হয়। কিন্তু তারা বালু উত্তোলন বন্ধ করার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি’।

বালু তোলার বিষয়টি জানা আছে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। এ বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউল আলম বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বালু উত্তোলন বন্ধ করাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অব্যহত রয়েছে। দ্রুত চন্ডিপুর ও সমসপাড়ার করতোয়া নদী থেকে বালু তোলা উত্তোলন বন্ধ করা ও বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অভিযান চালানো হবে’।

শুধু করতোয়া নদী নয়, ঘাঘট নদী, তিস্তা নদী, ব্রক্ষপুত্র ও যমুনা নদীসহ গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকার আবাদি জমি ছাড়াও বেশিরভাগ জনবসতি এলাকা থেকেই অবৈধ্যভাবে বালু তুলে বিক্রি করে আসছে প্রভাবশালীরা। প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান করলেও নিয়মিত তদারকির অভাবে সিন্ডিকেটের অপতৎরতা কোন ভাবেই বন্ধ হচ্ছেনা।









Leave a reply