সরকারি কলেজে শিক্ষক সংকটে বেহাল শিক্ষা

|

নীলফামারীর চিলাহাটি সরকারি কলেজে ১৭ বিষয়ে পাঠদান করা হয়। উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরের জন্য এই কলেজে ২৭ জন শিক্ষক থাকার কথা। আছেন মাত্র ১১ জন।

আবশ্যিক বিষয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে কোনো শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। একই অবস্থা কৃষি, মার্কেটিং ও ফিন্যান্স বিষয়ে। ইংরেজিতে ৩ জনের জায়গায় একমাত্র শিক্ষক পাঠদান করছেন। কিন্তু গণিতে কোনো শিক্ষকই নেই। অন্যান্য বিষয়ে যারা আছেন তাদের প্রত্যেককে সপ্তাহে ১৫টি করে ক্লাস নিতে হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে সহকারী অধ্যাপকের ওপর কোনো শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি।

পটুয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজে ২১টি বিষয়ের মধ্যে ৮টিতে কোনো শিক্ষকের পদই সৃষ্টি করা হয়নি। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজে পাঁচ বিষয়ে পাঠদান থাকলেও শিক্ষকের পদ নেই।

ওই প্রতিষ্ঠানে গণিত, রসায়ন আইসিটির মতো আবশ্যিক বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। অথচ ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত কলেজে আসছে। শিক্ষক না থাকায় তারা ক্লাস না করেই বাড়ি ফিরছে।

শুধু উল্লিখিত তিনটি নয়, দেশের প্রায় সব সরকারি কলেজেই শিক্ষকের অভাবে লেখাপড়া চলছে জোড়াতালি দিয়ে। পদ সৃষ্টি না হওয়ায় এক বিষয়ের শিক্ষক পড়াচ্ছেন আরেক বিষয়। আবার সৃষ্ট পদে শিক্ষক না থাকায় দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে লেখাপড়া। নতুন-পুরনো মিলে সারা দেশে বর্তমানে ৬৩২টি সরকারি কলেজ আছে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির আহ্বায়ক ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আইকে সেলিমউল্লাহ খোন্দকার বলেন, সরকারি কলেজে শিক্ষক ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে প্রান্তিক ও গরিব মানুষের সন্তানরা।

কারণ স্বল্প ব্যয়ের কারণে এসব কলেজে তারা সন্তান ভর্তি করে। তিনি বলেন, মধ্যম আয়ের দেশের উন্নীত হওয়া বা ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন- যেটাই বলি না কেন, শিক্ষক লাগবে। শিক্ষক থাকলে গাছতলায়ও পাঠদান সম্ভব।

সারা দেশের ৬৩২টি কলেজের মধ্যে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জাতীয়করণকৃত ৪৬টিসহ ৩২৯টি পুরনো কলেজ আছে। বাকি ৩০৩টি ২০১৬ সালের আগস্টের পর জাতীয়করণ কলেজ। পুরনো কলেজগুলোতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার শিক্ষকের পদ আছে। ২৮ নভেম্বরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত পদের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৭টিই শূন্য, যা বিদ্যমান পদের প্রায় ১৭ শতাংশ। এগুলোর মধ্যে অধ্যাপক ১৩৩, সহযোগী অধ্যাপক ২৮২, সহকারী অধ্যাপক ৩২২ এবং প্রভাষকের ১৮৬০টি পদ খালি আছে।

নতুন জাতীয়করণকৃত কলেজের অবস্থা আরও করুণ। অনেক কলেজে অবসরে যাওয়ার কারণে শিক্ষকের সংখ্যা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এমন কলেজের একটি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ কলেজ।

ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি এবং তিন বিষয়ে অনার্স পাঠদান আছে। প্রয়োজনের তুলনায় ৫০ শতাংশ শিক্ষক আছেন, বাকিরা অবসরে গেছেন। ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা হয় বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, জাতীয়করণকৃত কলেজগুলোতে ৮ হাজার ৫৮টি শিক্ষকের পদ আছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৮শ’ শিক্ষক অবসরে গেছেন। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অবসরে যাবেন আরও ১৬৯ জন। আগামী বছর আরও ৪৩৫ শিক্ষকের অবসরে যাওয়ার কথা।

নতুন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সংগঠন সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন, পদসৃজন ও পদায়ন দুটিই ঝুলে আছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় ও মাউশি আশানুরূপ কাজ করছে না। বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্য পদে আসীন থাকায় কাজ আটকে আছে। তিনি বলেন, তাদের আটকাতে গিয়ে প্রকারান্তরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজ শিক্ষাকেই আটকে দেয়া হয়েছে।

এমন অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন মাউশি মহাপরিচালক ড. এসএম গোলাম ফারুক। তিনি বলেন, কলেজ ও শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণের কাজ সুনির্দিষ্ট আইন-কানুনের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ বিলম্বিত করার সুযোগ নেই। কাগজপত্র যাচাইসহ আনুষঙ্গিক কাজে একটু সময়ের প্রয়োজন পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় প্রত্যেক কলেজেই সর্বনিম্ন ৩টি থেকে সর্বোচ্চ ৮টি বিষয়ে শিক্ষকের পদই সৃষ্টি হয়নি। বেশকিছু কলেজে পদ সৃষ্টি আছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। আবার ইংরেজি-বাংলা, আইসিটি, গণিত ও পদার্থ-রসায়নের মতো বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। শিক্ষক সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে আছে দেশের উপজেলাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো।

আর দুর্গম অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা অবর্ণনীয়। বান্দরবান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মকছুদুল আমিন জানান, যেসব বিভাগে মাস্টার্স রয়েছে সেগুলোতে ১২ জন ও অনার্স থাকা বিভাগগুলোতে ৭ জন শিক্ষক থাকার কথা। সে হিসাবে আমার কলেজে ১০৩টি শিক্ষকের পদ থাকার কথা। কিন্তু আছে মাত্র ৩৫টি।

চিলাহাটী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে ২৭টি পদ আছে। কিন্তু কর্মরত আছেন ১১ জন। ওই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের প্রভাষক শিবু চন্দ্র অধিকারী বলেন, ডিগ্রি ও উচ্চ মাধ্যমিকের ১৫টি ক্লাস তাকে একা প্রতি সপ্তাহে নিতে হয়। ৩ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও তিনি একা কর্মরত আছেন। একই দশা ইংরেজিতে। ৩টি পদ থাকলেও মাত্র একজন কর্মরত আছেন।

শুধু প্রত্যন্ত অঞ্চলই নয়, খোদ ঢাকায়ও শিক্ষক সংকটে বিঘ্নিত হচ্ছে লেখাপড়া। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২ নভেম্বর রাজধানীর ৭ কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষক সংকটসহ ৮ সমস্যার কথা অবহিত করেন। গত রোববার রাজশাহীতে দেশের শতবর্ষী কলেজগুলোর এক অনুষ্ঠানেও শিক্ষক সংকটের ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন শিক্ষকরা।

রাজধানীর ৭ কলেজের সমন্বয়ক অধ্যাপক আইকে সেলিমউল্লাহ খোন্দকার বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আপনারা অনার্স বন্ধ করে দিচ্ছেন না কেন?

তিনি সংকটের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলায় আছে ৫ জন আর ইংরেজিতে ৯ জন। পদার্থবিজ্ঞানে আছে ২ জন, রসায়নে ৪ জন। একই পরিস্থিতি অন্য বিভাগেও। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, অনার্স থাকলে একটি বিভাগে কমপক্ষে ৭ জন শিক্ষক থাকতে হবে। মাস্টার্স থাকলে শিক্ষকের সংখ্যা আরও বাড়বে।

শূন্যপদের ব্যাপারে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এসএম গোলাম ফারুক বলেন, সরকারি কলেজে শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করতে হয় বিসিএসের মাধ্যমে, যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে এভাবে চলতে দেয়া যায় না। রোববার রাজশাহীতেও এক অনুষ্ঠানে এ নিয়ে কথা উঠেছে।

সেখানে সাময়িক সমাধান হিসেবে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। ৪১তম বিসিএসে ৯০৫ জন নিয়োগের সার্কুলার এসেছে। আরও কয়েকটি বিসিএসে নিয়োগ পাইপলাইনে আছে। সেগুলো এলে সংকট কিছুটা দূর হবে। তবে শিক্ষকের প্রয়োজন পূরণে সবচেয়ে বড় দরকার পদ সৃষ্টির প্রস্তাব অনুমোদন করা। বর্তমানে সাড়ে ১২ হাজার শিক্ষকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে।

জানা গেছে, শুধু পদ সৃষ্টিই নয়, পদ সোপানের প্রস্তাবও আটকে আছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। পদ সোপানের প্রস্তাবে অধ্যাপক ও বিভিন্ন প্রশাসনিক পদের মর্যাদাসহ গ্রেড উন্নয়নের কথা আছে। এর মধ্যে মাউশি মহাপরিচালক পদ গ্রেড-১ এবং ৬টি পরিচালক ও ৯টি পুরনো কলেজের অধ্যক্ষের পদ গ্রেড-২ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর মোট অধ্যাপক পদের ৫০ শতাংশ গ্রেড-৩ করার প্রস্তাব আছে। বর্তমানে অধ্যাপকের পদ ৮৫৮টি। সেই হিসাবে ৪২৯ জন ৩য় গ্রেড পাবেন। ২০১৫ সালে সিলেকশন গ্রেড বাতিল হয়েছে। এ কারণে গত ৪ বছরে যেসব অধ্যাপক অবসরে গেছেন তারা ৪র্থ গ্রেডেই অবসরে যেতে হয়েছে।

আগে কলেজগুলো আলাদাভাবে প্রয়োজনের নিরিখে পদ সৃষ্টি করে নিতে পারত। সাড়ে ১২ হাজার পদ সৃষ্টির প্রস্তাব থাকায় ৪ বছর ধরে তা আটকে আছে বলে জানান আইকে সেলিমউল্লাহ খোন্দকার। অথচ ২০১৫ সালে গঠিত বেতন বৈষম্য নিরসন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০০ দিনের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই প্রস্তাব পাস হওয়ার কথা ছিল।

মাউশি মহাপরিচালক বলেন, ১৯৮৩ সালের এনাম কমিশনের সুপারিশ অনার্স কলেজে ১২ জন শিক্ষকের প্রস্তাব আছে। ১৯৮৭ সালে আরেকটি মূল্যায়ন কমিটির প্রস্তাবে অনার্সে প্রতি বিষয়ে ১৬ শিক্ষকের কথা আছে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে ১২ শিক্ষকের প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়েছে।

সূত্র: যুগান্তর









Leave a reply