মমতা-বিমান বসলেন, আমরা পারলাম কই?

|

মুরশিদুজ্জামান হিমু:

কয়েকদিন আগের ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু গেছেন নবান্নে। উপলক্ষ্য করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ে কথা বলবেন মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাথে। তার আগে, ফোনে সময় চেয়েছিলেন। মমতা সময়ও দিয়েছেন কোনো কথা খরচা ছাড়াই। তিনি সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বাম নেতৃবৃন্দকে।

সময় অনুযায়ী বৈঠক শুরু হয়। দু’দলের শীর্ষ দুই নেতাই করোনা মোকাবেলায় একসাথে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হন। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের কিছু আইডিয়াও বিমান বসু দেন মমতাকে। খুব সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয় আলোচনা।

আলোচনার এক পর্যায়ে বিমান বসুকে উদ্যেশ্য করে মমতা বলেন, ‘আপনি মাস্ক পড়ছেন না কেন? দেখছেন না চারদিকে কী দুর্যোগ? অবশ্যই আপনি মাস্ক পড়বেন। তাছাড়া আপনার বয়স হয়েছে বিমান দা। এ মুহূর্তে সাবধানে আপনাকে থাকতেই হবে। আর কোন সমস্যা হলে অবশ্যই আমাকে আগে জানাবেন।’

শাসনের সুরে মমতার এসব কথায় আলোচনার টেবিলের পরিবেশ হয়ে ওঠে অন্যরকম। অনেকেরই ভাষ্য, যেন নিয়ম না মানায় ছোট বোন কড়া ভাষায় বলেছেন বড় দাদাকে। এক পর্যায়ে ৭৯ বছর বয়সী বিমান বসুও মমতা ব্যানার্জিকে বলেন, ‘তুমিও সাবধানে থেকো। আজকাল যা ছোটাছুটি করছো..।’

এবার আসি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। এ দুর্যোগ মুহূর্তেও আমাদের প্রধান দু’দলের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ এখনও একসাথে এক টেবিলে আলোচনার জন্য বসতে পারলেন না। আর একসাথে মহামারি মোকাবেলা তো দূরের কথা।

অথচ কী হবার কথা ছিল? যখন একের পর এক রোগী শনাক্ত হওয়া শুরু করলো, তখনই যেকোনো এক পক্ষ আরেকপক্ষের সাথে দেখা করতে চেয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে নিতো। আলোচনার টেবিলে বসে ঠিক হতো, কোন দল কত জন স্বেচ্ছাসেবী তৈরি করছে। কোন কোন নেতার গার্মেন্টেসে পিপিই তৈরি হচ্ছে, কে মাস্ক বানাচ্ছে। নতুন হাসপাতাল নির্মাণ দেখভাল কে করবে, সুযোগ বুঝে এ সময়ে কেউ যেন অসহায় মানুষকে কষ্টে না ফেলে, সেটি কী উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আরও কতশত কথা। অথচ, কিছুই হলো না।

এতই বলি বন্ধু রাষ্ট্র, অথচ তাদের ভালো কিছু নিতে পারছি না এখনও। এখনও সেই পুরনো গণ্ডিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনীতি। করোনার মতো মহামারিও এনাদের এক করতে পারলো না। আফসোসটা এখানেই। রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে, এ মুহূর্তেও যদি আগের মতোই শুধু দোষারোপ করেই চলি, নিজ থেকে কেউ কাউকে সহায়তা না করি, তবে মহামারি রুখবেন কীভাবে? শুধু প্রণোদনা দিয়ে, আর অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করে?

কাল্পনিক একটি আলোচনা দিয়ে শেষ করি। ধরুন বিমান বাবুর মতো বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আলোচনার সময় ঠিক হলো। কোনো এক বিকেলে গণভবনের বাগানে।

শেখ হাসিনা : আপনারা এ সময় দেশের মানুষের কথা ভেবে এসেছেন, আপনাদের যে কী বলে ধন্যবাদ দেবো…
ফখরুল : এটা তো আমাদের দায়িত্ব। আপনিও শক্ত হাতে সামলাচ্ছেন। তাই ভাবলাম, আমরা এ সময় সহযোগিতা না করলে ইতিহাস এটার প্রতিশোধ নেবে।
শেখ হাসিনা : ফখরুল ভাই, চা খাবেন তো? নিশ্চয়ই চিনি ছাড়া। আর সাথে কী বলেন? বোনের ঘরে এসেছেন, খালি মুখে যাবেন কীভাবে?
ফখরুল : খাবো তো বটেই। আপাতত চা-টাই। পরেরটা সব কথা শেষে।
শেখ হাসিনা : জানেন ভাই, এই মহামারিতে কত মানুষের কত কষ্ট হচ্ছে! খাবারের কষ্ট। প্রথমে আমরা সবাই মিলে এটা মোকাবেলা করবো ইনশাল্লাহ।
ফখরুল : অবশ্যই, এটা ভেবেই এখন শুধু চা ছাড়া আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না আপা। পরিস্থিতি ভালো হলে আর ম্যাডাম সুস্থ হলে আমরা একসাথে বসে লাঞ্চ করবো একদিন। যদি আপনার সময় হয়।
শেখ হাসিনা : কী যে বলেন না ভাই, সময় হবে না কেন? অবশ্যই হবে। রেহানাকেও থাকতে বলবো। ও সবাইকে নিয়ে খেতে খুব পছন্দ করে।

একটু থেমে বললেন, আমরা এক হয়েছি না? দুর্যোগ মোকাবেলা ভালোভাবেই করবো। সব হাত একসাথে হলে ঠেকায় কে?

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।









Leave a reply