“ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে, এমন দিন সবার আসে”

|

জয়ন্ত সরকার:

“এসো হে বৈশাখ এসো এসো”। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বাঙালির মনন ছোঁয়া ঐতিহাসিক এই সৃষ্টি সাত সকালে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সৌজন্যে ভেসে আসলেও এবারের মতো বিস্বাদ লাগেনি কখনও। মুখে অরুচি থাকলে অমৃতও যেন গরল সমান। বাংলা নববর্ষের আগমন বার্তা স্মরণ করিয়ে দিতে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার আপ্রাণ চেষ্টাও তাই হয়তো সাড়া জাগাতে পারলো না। এমন জৌলুসহীন বৈশাখ বাঙালি শেষ কবে উদযাপন করেছে সেটা জানতেও স্মৃতির মণিকোঠায় চড়ে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়। বাংলা নববর্ষ তাই এবার শুধু রঙ ছড়াতেই ব্যর্থ নয়, বরঞ্চ হাজির হয়েছে ভিন্ন ধরনের রুদ্ররূপে। কারণটাও স্পষ্ট। মাস্ক-গ্লাভস বন্দি প্রতিটি মানুষ করোনাভাইরাস তথা কোভিড-১৯ নামক অদৃশ্য শক্তির বিষাক্ত ছোবলে মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত। তাই বাংলা-১৪২৭ সাল পরবর্তীতে কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনবে কিনা সে প্রশ্ন তোলা থাক অনাগত আগামীর হাতে!

বাংলায় অতি প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে। দাঁত দিয়ে জিহ্বার বিশ্বাস নেই। সামান্য অসতর্কতাজনিত কারণে কামড় বসিয়ে দিতে পারে যেকোনো সময়। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনেকটা এরকমই। নিজ শরীরেরই একটি অঙ্গ দিয়ে আরেকটি অঙ্গের বিশ্বাস নেই। আমাদের কোনো এক বেখেয়ালি মুহূর্তে হয়তো বহন করছে প্রাণঘাতি কোভিড-১৯, ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা শরীরে, পৌঁছে দিচ্ছে মৃত্যুর দুয়ারে, ঝরে যাচ্ছে কতশত প্রাণোচ্ছ্বল জীবন; ভারি হচ্ছে পরিসংখ্যানের খেরোখাতা। এ এক নির্মম মৃত্যু! পৃথিবীর সব থেকে আপনজনেরও সুযোগ নেই শেষবারের মতো একটু ছুঁয়ে দেখার! ধরিত্রীর প্রতি মানুষের নির্মম অবিচারে প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর প্রতিশোধ এখন তাই মেনে নিতেই হবে, নিতে হবে শিক্ষাও। যদিও আমরা মানবজাতি বড়ই আজব! কিছুটা স্মৃতিভ্রষ্টও বটে!

বলছিলাম অদৃশ্য শত্রু কোভিড-১৯ এর বিভীষিকার বৈশ্বিক শোকগাঁথা। এবার আসি দৃশ্যমান শত্রু তথা বাংলার আধুনিক মীর জাফর-ঘষেটি বেগমদের প্রসঙ্গে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বেদনাত্মক পরাজয়ের পেছনের কুশীলব মীরজাফর-ঘষেটি বেগমরা সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতার যুগেও যে আমাদের সমাজ-সংসারে নানারূপে বিরাজমান; সেটা আরো একবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে করোনাভাইরাস। অন্য সময়ের কথা বাদই দিলাম বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো জাতীয় দুর্যোগে এদেশের নেতা-কর্মী-জনপ্রতিনিধি-আমলাদের ত্রাণ আত্মসাতের মুখরোচক গল্পসমূহ দিয়ে রীতিমত মহাভারত রচনা সম্ভব। কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে যে কারো শরীরে করোনাভাইরাসের ভয়ঙ্কর ছোবলের সম্ভাব্যতা জেনেও, বৈশ্বিক এই ক্রান্তি লগ্নেও তথাকথিত জনসেবকরা দুর্নীতির করাল থাবায় জাতিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে; যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। বাংলাদেশে অনেকের শরীরে ইতোমধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। কিন্তু এইসব চাল-ডাল-তৈল খোর দুর্নীতিবাজরা কোভিড-১৯ রেজিস্ট্যান্ট কিনা খুব জানতে ইচ্ছে করছে! নয়তো দরিদ্র মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে এইসব মহাচোরেরা আপন সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে কিসের নেশায়? গরীবের ত্রাণ (চাল-ডাল-তৈল) কেন লুটোপুটি খাচ্ছে ঐসব তথাকথিত নেতাদের গুদামে, পুকুরে? কেন বন্ধ করতে হয়েছিলো বিশেষ ওএমএস? ঘটনা খতিয়ে দেখতে গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি, ফলাফলও অনুমেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, দিনে-আনা, দিনে-খাওয়া দরিদ্র-নিপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর জীবন ধারণের উপায় কী? কে শোনে কার কথা, কে ভাবে কার কথা! যদিও পরবর্তীতে পুনরায় বিশেষ ওএমএস চালুর নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। দরিদ্র জনসাধারণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না ভুক্তভোগীদের মাঝে। ফলে জনসাধারণের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। করোনায় মুত্যু ঝুঁকি উপেক্ষা করে রাস্তায় বেরিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনে বাধ্য হচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো। হিসাব স্পষ্ট, না খেয়ে মরার থেকে করোনায় মরবো, তবু বাইরে বেরিয়ে খাদ্য সংগ্রহের শেষ চেষ্টা করতে দোষ কী? এদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা নিয়ে রীতিমত ছেলেখেলা করেছে বিজিএমইএ-মালিকপক্ষ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীতে যদি কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা হয়তো কারো ভাবনাতেও আসছে না। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক বিবেচনা করলে বলা যায় মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে এই উদীয়মান অর্থনীতির দেশ, মুখ থুবড়ে পড়তে পারে অব্যাহত জিডিপি বৃদ্ধির হার।

লেকচার-পিকচার-ভাউচারের আধিপত্যের কারণেই আজ যত অন্যায়-অত্যাচার-অনাচার-অবিচার-ব্যাভিচার। তাই হয়তো সস্তা জনপ্রিয়তা বা দ্রুত প্রমোশনের প্রত্যাশায় পদ্স্থ সরকারি কর্মকর্তা বিধি-নিষেধ অমান্য করার ঠুনকো অজুহাতে প্রকাশ্যে বয়োঃবৃদ্ধকে কান ধরে উঠবস করিয়ে ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিজেকে ত্বরিতকর্মা হিসেবে তুলে ধরতেই হয়তো এই অপপ্রয়াস। সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-এমপি-মন্ত্রী-সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী-সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান তৈল মর্দনে ব্যতিব্যস্ত। আর এসকল সুযোগ-সন্ধানীরা জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েই সবরকম অপকর্মে লিপ্ত। ফলও পাচ্ছে হাতেনাতে। তাই এককালে যারা ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি পর্যন্ত বিকৃতভাবে উচ্চারণ করতো তারা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় মুজিব বন্দনার ঢেউ তুলছে আর গরীবের রক্ত চুষে খাচ্ছে। কখনো নিত্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে, কখনো চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি আবার কখনোবা ত্রাণ চুরি করে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ করোনাভাইরাসে ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন অনেক নামীদামী ব্যক্তিত্ব। বিশ্ব অঙ্গন থেকে করোনা কেড়ে নিয়েছে অনেক মেধাবী মুখ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চীনের কার্যক্রম সমর্থন করায় ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডব্লিউএইচও’র জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল স্থগিত করেছেন। করোনা থাবায় বিপর্যস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে চীনই কী তাহলে হতে চলেছে আগামী বিশ্বের সুপার পাওয়ার বা একক মোড়ল? ডব্লিউএইচও’র হঠাৎ রঙ বদল কিন্তু সন্দেহের পালে জোর হাওয়া দিচ্ছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও যেন সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। তাদের আচরণ অন্তত সেটাই প্রমাণ করে। লক্ষণীয়, এই প্রাণঘাতি ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশের লকডাউন উঠে গিয়েছে বেশ আগেই। সংক্রমণ-মৃত্যু বর্তমানে নেই বললেই চলে। অর্থাৎ সার্বিক পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক। কিন্তু বাকি বিশ্ব সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করোনার আঘাতে। প্রশ্ন এবং আশঙ্কা হচ্ছে, সমগ্র বিশ্বমণ্ডলের রিমোর্ট কন্ট্রোল কুক্ষিগত করতে, আগে থেকেই প্রতিষেধক হাতে নিয়ে নিজেদের একটি প্রদেশে এই মারণবানের পরীক্ষামূলক ধ্বংসলীলা চালিয়ে বিশ্বব্যাপী জীবাণুযুদ্ধ তথা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী শুরু করে দিলো চীন? যদি আশঙ্কা সত্য হয়, তাহলে বলতেই হচ্ছে কোনো বাক্য ব্যয় না করে, একটিও বুলেট খরচ না করে মানবতার অবক্ষয়ী এই যুদ্ধে যোজন-যোজন এগিয়ে আছে তারা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ওপর চালানো ভয়ঙ্কর তেজস্ক্রিয় বোমার পরিণতি এখনো বহন করতে হচ্ছে হিরোশিমা-নাগাসাকি অধিবাসীদের। একইভাবে এই জীবাণুযুদ্ধের পরিণতি কতদিন বিশ্ববাসীকে বহন করতে হবে তা সময়ই বলে দিবে।

ইতোমধ্যে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। ডা. মঈনের মতো মহৎ চিকিৎসকও প্রাণ হারিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তা না করুন, হয়তো অপেক্ষা করছে আরো কতশত নাম। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রণোদনার আওতায় দেশের অন্যান্য অনেক খাত থাকলেও দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য সেখানে সংবাদকর্মীদের জন্য কোন বরাদ্দ নেই। অথচ দেশের এই মহাক্রান্তিকালের মাঝেও সংবাদকর্মীরা নিজের ও পরিবারের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে ছুটে চলেছেন দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে। সময়মতো সঠিক সংবাদ দেশবাসীর মাঝে পৌঁছে দিতে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে যথেষ্ট উদারতার পরিচয় দেবে বলে আশা রইলো।

বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্রকায় এই জনপদে কোভিড-১৯ কোনোভাবে মহামারিরূপে আবির্ভূত হলে লাশের মিছিল ঠেকানোর সক্ষমতা আমাদের কতটুকু সেটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই বিবেচনা করা অপরিহার্য। কারণ বিশ্বব্যাপী করোনার তাণ্ডবলীলা বেশ আগে থেকে শুরু হলেও এর সংক্রমণ প্রতিরোধে আমরা কিছুটা হলেও দেরিতে উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিরোধের বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়হীনতা এবং অব্যবস্থাপনা নিদারুণভাবে ফুটে উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআর’র মধ্যে তথ্যবিভ্রাট এবং সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে এসেছে। এছাড়া, আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ফুটে উঠেছে একাধিকবার।

করোনা মহামারি মোকাবেলার পাশাপাশি করোনাত্তোরকালের বিরূপ পরিস্থিতি নিয়েও এখন থেকেই উদ্যোগী হতে হবে। কারণ সেই সময়টা ছোট্ট এই জনপদের জন্য ভয়াবহ হতে বাধ্য। করোনাত্তোরকালে বাংলাদেশে বিশাল কর্মহীন জনগোষ্ঠী তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করাটাও অমূলক নয়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এই খাদ্যে বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে কতদিন ভরণপোষণ সম্ভব সেটাও বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত। পাশাপাশি আমাদের সর্বগ্রাসী সুযোগসন্ধানী মহল তো ওঁৎ পেতে আছেই সবকিছু গিলে খাওয়ার জন্য। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বেই ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ত্রাণ বিতরণে সফলতার উদাহরণ আছে। তাই বর্তমান সংকটময় মুহূর্তেও ত্রাণ তৎপরতায় বহু পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে যুক্ত করলে জনমনে আস্থা ফিরবে বলে আশা করা যায়। আসুন সকলে মিলে রক্ষা করি পারস্পরিক সামাজিক দূরত্ব, ঘরে থাকি, মেনে চলি সৌজন্যতা-শিষ্টাচার। তাহলেই সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে করোনার বিরুদ্ধে জয় আসবেই।

বাঙালি এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন একইসূত্রে গাঁথা। তাইতো সেই কবে তিনি আমাদের বলে গিয়েছেন–“সঙ্কটের কল্পনাতে/হোয়ো না ম্রিয়মাণ। মুক্ত করো ভয়/আপনা-মাঝে শক্তি ধরো/নিজেরে করো জয়”।। বিনাশ হোক সর্বগ্রাসী করোনার, জয় হোক মাটি ও মানুষের।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

 









Leave a reply