ভাঙা পা নিয়েই বাড়ি বাড়ি ছুটছেন গাছপাগল শাখাওয়াত

|

মামুনুর রশিদ:

ভাঙা পা; তবু অদম্য ইচ্ছে শক্তিতে ক্রাচে ভর দিয়েই বাড়ি বাড়ি ছুটে চলছেন তিনি। কোনো এক বাড়িতে গিয়ে বলছেন, চাচা আপনাদের বাড়িতে একটা গাছ লাগাবো। তবে গাছটার যত্ন নিতে হবে। খানিক পরেই হয়তো আরেক বাড়িতে গিয়ে বলতে দেখা যাচ্ছে, চাচি আপনাদের বাড়িতে একটা ঔষধি গাছ লাগায়ে দিয়ে যামু। কখনও হয়তো ছোট ভাইদের ডেকে বলছেন, ওই রাস্তাটাতো ফাঁকা, কাল ওখানে কিছু গাছ লাগাবো চলে আসিস। বলা হচ্ছে, নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গাছপাগল শাখাওয়াত উল্লাহর কথা।

শাখাওয়াতের এমন আহবানে সাড়াও মিলেছে বেশ। এর মধ্যেই নোয়াখালীর সুবর্ণচরে প্রায় ৭ হাজার গাছ লাগিয়েছেন শাখাওয়াত। গত তিন বছর ধরে এমন সবুজায়ন করে যাচ্ছেন তিনি।

সবুজায়নের প্রতি এমন ঝোঁক তৈরি হলো কীভাবে? জিজ্ঞেস করতেই জানা গেলো দুই প্রজন্ম ধরেই গাছের প্রতি এই মমত্ববোধ লালন করছেন শাখাওয়াতরা। বলেন, ছোটবেলায় অনেক বনাঞ্চল দেখেছি আমাদের এদিকে। উচ্ছেদ হতে হতে এখন কিছু্‌ই নেই। এখানে যে বনভূমি ছিলো সেটা এখন কেউ বিশ্বাস করে না। আমার বাবাকে ছোটবেলায় গাছ লাগাতে দেখতাম। তখন বাবাকে পাগল ভাবতাম। পরে আস্তে আস্তে অনুধাবন করি গাছের উপকারিতা। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মূলত আমি গাছ লাগাতে শুরু করি।

২০১৮ সাল থেকে গাছ লাগানো শুরু করেন শাখাওয়াত। সেবার ১০ হাজার গাছ লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও মাত্র ১০০ গাছ লাগাতে পেরেছিলেন। পরের বছর সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় দুইয়ের ঘরে। ২০২০ সালে এসে প্রায় ৬ হাজারের বেশি গাছ লাগাতে সক্ষম হন শাখাওয়াত। তবে, এই বছরই তার জীবনে ঘটে গেছে অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা। যার ফলে তার ঠাঁই হয়েছিল হাসপাতালের বেডে। কখনো উঠে দাঁড়াতে পারবেন কিনা সে শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।

করোনাকালীন সময়ে হোম অফিসের কল্যাণে চলে যান গ্রামের বাড়ি নোয়াখলীর সুবর্ণচরের চরবাটাতে। উদ্যোগ নেন করোনার এই সময়ে গ্রামে গাছ লাগাবেন। গাছের দাম বেশি থাকায় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বেশি পরিমাণে গাছ লাগাতে পারছিলেন না। এসময় এগিয়ে আসে একটি বেসরকারি সংস্থা, শাখাওয়াতকে ১০ হাজার গাছ দিতে চায় তারা। কিন্তু সেটির জন্য তাকে যেতে হবে চট্টগ্রামে।

সানন্দে সেখানে ছুটে যান এই গাছপ্রেমী। সবকিছুই পরিকল্পনা মতো চলছিলো। সকালে ট্রাক ভর্তি ১০ হাজার গাছ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন- ফিরছেন গ্রামে। কিন্তু পথিমধ্যে অ্যাকসিডেন্ট করে তার গাড়ি। ভেবেছিলেন পৃথিবীর এই সবুজ আর কখনো দেখা হবে না। হতাশ হয়েছিলেন, সবুজায়নের যে স্বপ্ন বুনছিলেন তা আর পূরণ হবে না।

এক মাস হাসপাতালে শুয়ে থাকার পর অবশেষে ফিরেছেন তিনি। সেই সময়টাতে বারবারই খোঁজ নিয়েছেন প্রিয় গাছগুলোর। আকুতি জানিয়েছেন, সেগুলো যেনো নষ্ট না হয়ে যায়। এরপর আরও কয়েকমাস তাকে বেড রেস্টে থাকতে হয়। ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটার অবস্থা হতেই আবারো নেমে পড়েন সবুজায়নের নেশায়। মনে যার প্রকৃতিপ্রেম, পাগলামি- পায়ের ব্যথা কি তাকে দমিয়ে রাখতে পারে? গাছ নিয়ে ঠিকই পৌঁছে গেছেন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে। ফাঁকা রাস্তাগুলো রাঙিয়েছেন কৃষ্ণচূড়ার রঙে।

শাখাওয়াতের স্বপ্নটা অনেক বড়। এই জীবনে ১ লাখের বেশি গাছ লাগানোর ইচ্ছে আছে তার। গড়ে তুলতে চান কয়েকটি লাইব্রেরিও। স্বপ্নের কথা বলার সময় জ্বলজ্বল করে ওঠে এই গাছপাগলের চোখ। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় এমন পাগলদেরই যে এখন বেশি বেশি দরকার।









Leave a reply