সায়মন: সাদা লম্বা খাঁটি বাংলাদেশি!

|

তৌহিদুল ইসলাম:

আমরা সবাই কমবেশি টেলিভিশন দেখি, ইউটিউব বা ফেসবুকে ভিডিও দেখি। যখনই অডিওতে ঝামেলা হয় তখন কমেন্ট করি, ‘শব্দ শোনা যায় না’ বা ‘সাউন্ডে ডির্স্টাব’। অর্থাৎ কী হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারি না। শব্দের এই সমস্যার পরও দর্শক যাতে ঘটনা (কনটেন্ট) বুঝতে সমস্যায় না পড়েন, তাই মিউট (শব্দ বন্ধ) করে টিভি দেখতেন সায়মন ড্রিং।

মানে হচ্ছে, কোনো কারণে কানে শোনায় ব্যত্যয় ঘটলেও দর্শক স্ক্রিন দেখেই বুঝতে পারবেন কী বলা হচ্ছে। তার শিষ্য সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ভাই কোনো কোনো রিপোর্ট দেখে বলতেন, শুরু হলো ভিজ্যুয়াল পত্রিকা রিপোর্টিং! মানে ছবি এবং রিপোর্টারের তথ্যে অমিল। পরে সায়মন ভাঙা ভাঙা বাংলায় বোঝালেন, যত ভালো কথাই বলা হোক, দর্শনীয় না হলে সেটা টেলিভিশন হয় না।

একুশে টেলিভিশনের পর বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফায় যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কাজ করেন সায়মন ড্রিং। একুশে’র অসমাপ্ত ইনিংসটাই যেন শেষ করার প্রবল আগ্রহ তার। আলাদাভাবে চেনাতে চান, সিগনেচার তৈরি করতে চান।

স্যুটেড-বুটেড থাকবেন রিপোর্টাররা, দেখলেই চেনা যাবে, যমুনা টেলিভিশন। নিউজ প্রেজেন্টেশনেও আলাদা কিছু না কিছু থাকবে; বারকো’র সামনে দাঁড়িয়ে ওয়েলকাম করবেন অ্যাঙ্কর। এসব পরিকল্পনার সময়ও সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা, প্রায় ১৪ ঘণ্টা অফিস করতেন সায়মন। মনে রাখতে হবে, তার বয়স কিন্তু তখন ৬৯।

বয়স ৬৯ হলে কী হবে, সায়মন তো ব্রিটিশ। ইউ বা তুমি বলেই সম্বোধন করে সবাই। তাই সিইও হয়ে ওঠে সবার সমবয়সী। সহজেই জমে হাসিঠাট্টা। অভিভাবক হিসেবে আবার খুব কঠিন। কোনো কিছুতে ছাড় দিতে চান না। একটা লাইভ করলে জিজ্ঞেস করেন, এটা করলে কেন? আবার না করলেও জিজ্ঞেস করেন, এটা করলে না কেন?

এখন টেলিভিশনগুলো ছোট ছোট ঘটনায় এত এত লাইভ করছে, এটা তিনি মন থেকে পছন্দ করতেন না। সায়মন চাইতেন ইনডেপথ স্টোরি। সবদিক কাভার করে এমন। সাথে অবশ্যই একটা পিটিসি (পিস টু ক্যামেরা)। এমনকি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক থেকে বাংলাদেশ রিলেটেড কোনো খবর হলে তাতেও রিপোর্টারের ইনভলভমেন্ট চাইতেন তিনি। বলতেন, একটা পিটিসি দিয়ে তথ্য সংযুক্ত করুক।

২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবর থেকে অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশিদের মরদেহ উদ্ধার হলো। সে খবর ডেইলি স্টার পত্রিকায় সেকেন্ড লিড হিসেবে ছাপা হয়। দৌড়ে নিউজ রুমে এসে আমাকে বলল, এই আইটেমের কী খবর? জানালাম, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক কাভার করছে। এখনও কোনো ‘সট’ (সাউন্ড অন ট্র্যাক) আসেনি, সবই টেক্সট। আমরা উভ (আউট অফ ভিশন) চালাচ্ছি। জানতে চাইলেন, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্ট মিশু কোথায়? বললাম, শুক্রবার ডে অফ। এমনকি হাতে সেকেন্ড অপশনও নেই। বোঝাতে চাইলাম, এই ইস্যুটা নিয়ে পরের দিন (শনিবার) কাজ করতে হবে। আমার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে রেগে গেলেন। সায়মন তার ক্ষোভ, পরামর্শ, নির্দেশনা সরাসরি বলতেন প্রধান বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমেদকে। তার অনুপস্থিতি আমাকে চরম অসহায় করে দিলো। এখন মনে হয়, ভালোই হয়েছিল। আমি ঘটনাটা ভুলিনি, শিক্ষা পেয়েছি।

আরেকবার একজন মুক্তিযোদ্ধার অসহায়ত্ব নিয়ে আমরা একটা রিপোর্ট করেছিলাম। মোটামুটি আবেগ তৈরি হওয়ার মতো। দেশের জন্য যিনি যুদ্ধ করেছেন, তার আজ এই অবস্থা! বুলেটিনে যাওয়ার পর সায়মন বিষয়টা নিয়ে কথা তুললেন। বোঝালেন, মুক্তিযোদ্ধার অসহায় অবস্থা দেশের জন্য অগৌরবের। এভাবে দেখালে মুক্তিযুদ্ধের সম্মান বাড়ে না। এর চেয়ে কেন তিনি অসহায়, এই অসহায়ত্ব ঘোচানো যায় কীভাবে, সেগুলো তুলে ধরা উচিত। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। একটু ভাবলে বোঝা যায়, এ দেশটাকে কীভাবে অনুভব করেছিলেন সাদা লম্বা মানুষটা!

সায়মন পৃথিবী ছেড়েছেন মাত্র ক’দিন। বাংলাদেশ থেকে চলে গেছেন আরও ৫/৬ বছর আগে। আমরা তার অনেক কিছুই ভুলে গেছি। আবার মনে রাখতেও বাধ্য হচ্ছি, অনেক কিছু। ভুলে যাওয়ার দায় আমাদের। যতটা মনে রাখবো, ততটা যোগ হবে অর্জনের খাতায়। গুরু, তোমায় সালাম।

লেখক: যুগ্ম প্রধান বার্তা সম্পাদক, যমুনা টেলিভিশন।









Leave a reply