সাহেদের অস্ত্রের নাম রিজেন্ট হসপিটাল

|

তৌহিদুল ইসলাম:

প্রায় তিন বছর আগের কথা। ১৭ জুলাই, ২০১৭। ‘একটি সত্য ঘটনা, সবাইকে পড়ার অনুরোধ রইলো’- এমন আকুতি জানিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মোহাম্মদ সাহেদ। বিষয়বস্তু মর্মস্পর্শী। সার কথা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা (জোনাল স্যাটেলমেন্ট অফিসার) অভুক্ত থেকে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু পথযাত্রী। দিনের পর দিন মসজিদের ইমামের খাবারের অংশ খেয়ে বেঁচে থাকলেও বিপত্তি বেঁধেছে কঠিন অসুস্থতায়। কথিত হতভাগ্য হামিদ সরকারের ত্রাণকর্তা হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন, মসজিদের ইমাম ও থানার ওসির আহ্বানে। তার কাছে আসার কারণ, উত্তরা রিজেন্ট হসপিটাল

‘আকাশ সমান উদার’ সাহেদ সাহেব সব দায়িত্ব নেন হামিদ সরকারের। যদিও তাতে পরাজয় মানেনি আজরাইল। ওই গল্পে আরও দুর্গতি অপেক্ষা করছে হামিদ সরকারের জন্য। সাহেদ লেখেন, মরহুমের তিন ছেলে বিত্তশালী। উত্তরায় বাড়ি ছিল, সেগুলো ছেলেদের লিখে দিয়েছেন। (পাঠকের সুবিধার জন্য স্ট্যাটাসের স্ক্রিন শট দেয়া হয়েছে)। মরদেহ বুঝে নিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে ফোন দেয়া হয় ব্যবসায়ী ছেলেকে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ব্যস্ত আছেন। লাশ যেন আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে দিয়ে দেয়া হয়।

মোহাম্মদ সাহেদের সেই স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশট

একথা শুনলে (পড়লে) যেকোনো বাঙালির মাথায় রক্ত ওঠতে পারে। সেটাই চেয়েছেন, সাহেদ। শেষে নসিহত করেছেন। প্রশ্ন করেছেন, এমন দানবতার, নিষ্ঠুরতার। কাজও হয়েছে। দেশের বেশ পরিচিত এবং পুরনো বেশ ক’টি দৈনিকের অনলাইনে এটি প্রকাশ হয়েছে নিউজ হিসেবে। ভাইরাল হওয়া আর ঠেকায় কে! আমি ‘নির্দয়’ সাংবাদিক সত্য যাচাইয়ের চেষ্টা শুরু করলাম। এক ধাপ, দু’ধাপ করে যেতে যেতে পেলাম, মি. সাহেদকে।

রিপোর্টার মনিরুল ইসলামকে বললাম, রিপোর্টটা কর। অভিযোগ সত্য হলে ওই ছেলেগুলোর চেহারা এবং ব্যাখ্যা জানানো দরকার মানুষকে। আর মিথ্যা হলে, যারা এত এত শেয়ার করছে, তাদের ভুলটা ভাঙবে। মনির খোঁজ শুরু করলো। ফাঁকে আবার জামালপুরের সহকর্মী শোয়েবকে ফোন করলাম যেহেতু সাহেদ সাহেব দাবি করেছেন ভুক্তভোগীর বাড়ি সেখানে। শোয়েব আমার কাছে শুনে বললেন, এমন হলে আমরা জানতাম। বললাম, আপনি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে জানান। পরদিনও ফোন করলাম, তার পরদিনও। শোয়েব শতভাগ নিশ্চিত, জামালপুরের কারও ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেনি।

ওদিকে, মনির মোহাম্মদ সাহেদের সাথে যোগাযোগ করছেন। তিনি ধরা দিয়েও দেন না। বোঝা যায়, ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যা’। ক্যামেরায় কথা বলবেন না। টেলিফোনেই শেষ কথা, ‘অনেক দিন আগের ঘটনা-ত, এখন আর ঠিক মনে নেই’। অথচ স্ট্যাটাস দিয়েছেন এক সপ্তাহও হয়নি!

এত কথা বলার কারণ, ওই ভাইরালে বায়বীয় তিন ছেলে যতটা ধিকৃত হয়েছে, তার চেয়ে হাজার গুণ মহৎ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সাহেদ। দাবি করেছেন, রিজেন্ট হসপিটালে হামিদ সরকারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজে নিয়েছেন। ইমামের উচ্ছিষ্ট খাওয়া সরকারি কর্মকর্তার খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। আহারে, কী দয়ালু! সিনেমার গল্প লেখকও হার মানবেন এমন প্লট তৈরিতে।

সাহেদকে তখন আমরা ক্যামেরার সামনে আনতে পারিনি। মনির চেষ্টা করেছে অনেক। এরমাঝেই আরেকটি ঘটনা ঘটে। এক মেয়ে বাবার বিরুদ্ধে কু-কথা রেকর্ড করে ভিডিও ছাড়ে। সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ, ভাইরাল। এবার মনির বাবার বক্তব্য পেলো, ভাগ্যক্রমে মেয়েটিরও। শেষে বাবা-মেয়ের ভাইরাল ঘটনাটি সামনে এনে রিপোর্ট প্রচার হয়েছিল যমুনা টেলিভিশনে। যেখানে আমরা বলেছিলাম, বাবার লাশ আঞ্জুমানে দেয়ার ভাইরাল বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়নি। সাহেদ যে নিজের স্বার্থে বাহবা কুড়াতে চেয়েছেন, সেই ইঙ্গিতও ছিল।

‘মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্প আমরা পড়েছিলাম, অনাথ শিশু মাতৃস্নেহের জন্য কেমন কাঙাল থাকে; কীভাবে মিথ্যা গল্প তৈরি করে। এখন দেখছি, অপকর্ম আর অবৈধ আয়ের জন্য কত মানবিক গল্প ফাঁদছে সাহেদ গং। সাহেদরা গলিতে গলিতে। মোড়ে মোড়ে।

লেখক: যুগ্ম প্রধান বার্তা সম্পাদক, যমুনা টেলিভিশন।
ইমেইল: [email protected]

অসত্য তথ্য দিয়ে ভাইরাল হওয়া বিষয়ক সেই প্রতিবেদন:

ফেসবুকে অনেকেই ছড়াচ্ছেন গুজবকেউ গল্প ফেঁদে চালিয়ে দিচ্ছেন সত্য ঘটনা বলেসবই চলছে সস্তা জনপ্রিয়তা আর নজরে আসার জন্যবিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ ব্যবহারকারী

Gepostet von Jamuna Television am Mittwoch, 26. Juli 2017









Leave a reply