জীবনে ফেরার গল্প: শত প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল ছেড়ে দিতে নেই

|

সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাণ। ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে এই ব-দ্বীপ অঞ্চল রক্ষার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ। শ্বাপদসংকুল এ অরণ্যের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে লাখ লাখ মানুষ। নিরন্তর সংগ্রাম করে চলা এই বনজীবীদের কাছে আতঙ্কের নাম একেকটি দস্যুবাহিনী। সুখের কথা, এই দস্যুবাহিনীগুলো একে একে আত্মসমর্পণ করছে, আইনের কাছে নিজেদের সোপর্দ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। আর এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়াটিতে মধ্যস্থতা করেছেন একজন সাংবাদিক। তিনি মোহসীন-উল হাকিম। ধারাবাহিকভাবে লেখছেন তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প। যমুনা অনলাইনের পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।

জীবনে ফেরার গল্প (১৭-তম কিস্তি)

যখন সুন্দরবনের জেলে ছিলেন, তখন সন্তানদের পড়াতে পারেননি তিনি। তারপর যখন দস্যু হয়েছেন, তখনও সন্তানদের পড়াতে পারেননি। দস্যুতা ছেড়ে এখন আবারও তিনি সুন্দরবনের জেলে। এতদিনে সন্তানদের পড়াশুনার বয়স পেরিয়ে গেছে। এখন স্বপ্ন দেখছেন ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিরা হয়তো পড়াশুনা করবে। সুন্দরবন ঘেঁষা জনপদের জেলে বাওয়ালীদের জীবনটাই এমন। কিছুতেই স্বাচ্ছন্দ ধরা দিতে চায় না এদের জীবনে।

কথাগুলো বলছিলেন সুন্দরবন লাগোয়া জনপদ কদমতলার খলিল গাজী। এক সময় জেলে জীবন কাটালেও সবশেষ সুন্দরবনের দস্যু ডন বাহিনীর সদস্য ছিলেন তিনি। আত্মসমর্পণ করে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। অস্ত্র ছেড়েছেন। আবারও হাতে নিয়েছেন মাছ ধরার জাল।

সেদিন সাতক্ষীরা অংশের সুন্দরবনের মালঞ্চ নদীতে দেখা খলিল গাজীর সঙ্গে। খবর পেয়ে নৌকা নিয়ে জোয়ার ঠেলে বাপ ছেলে বৈঠা বেয়ে ছুটে এসেছিলেন আমাদের কাছে। সেদিন সাবেক বনদস্যু খলিল গাজীর মুখে যে হাসি দেখেছিলাম, তার সঙ্গে দস্যু থাকাকালীন হাসির বিশাল ব্যাবধান। মালঞ্চ নদীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রলার থেকে হাত ধরে আমাকে নামিয়ে নিলেন নিজের নৌকায়। বললেন, চলেন মামা, কয়টা মাছ ধরে নিয়ে আসি।

খলিল গাজী, তার ছেলে নুর ইসলাম আর আমি। তিনজন ঢুকে পড়লাম পাশের একটা ছোট্ট খালে। খুব বেশি হলে ১৫ মিনিট। এর মধ্যেই মাছ যা উঠলো, তাতে অবাক হতেই হয়। সুন্দরবনের খাল নদীতে এত মাছ? তাহলে এই জেলেদের জীবনে এত দৈন্যতা কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর জানা আছে। আর সেই বিষয়ে কাজ করার আছে আমাদের সবার। সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি বুঝে কাজ করতে হবে। আর আমাদের অর্থাৎ সাংবাদিকদেরও জোরেসোরে কাজ করতে হবে। তাহলেও যুগ যুগ ধরে চলে আসা নানান প্রতিকূলতা কাটবে। জেলে বাওয়ালীরা সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করেই স্বচ্ছল হবে।

সেই স্বচ্ছলতার পথে এখন খলিল গাজী। দস্যুতার জীবন তার কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। তারপরও ঘুরে দাঁড়ানোর এই চেষ্টা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। সাবেক বনদস্যু খলিল গাজীর হাসিমুখ বন উপকূলের ত্রিশ লাখ মানুষের ভাগ্য ফিরিয়ে দিতে নতুন করে কাজ করার বিষয়ে উৎসাহ যুগিয়েছে।

আর খলিল গাজীর জীবনে ফেরার চেষ্টা আমাকে শিখিয়েছে, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল ছেড়ে দিতে নেই…

সুন্দরবনের দস্যুতা ছেড়ে নতুন কর্মজীবনে দস্যুরা

সুন্দরবনের দস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণের পর নতুন কর্মজীবনে দস্যুরা

Posted by Jamuna Television on Friday, June 8, 2018

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন
যমুনা অনলাইন: এমএইচ/টিএফ

আরও দেখুন:
জীবনে ফেরার গল্প: সফলতা এসেছে টিমওয়ার্কের কারণে
জীবনে ফেরার গল্প: জেলে নৌকার সহকারী থেকে দস্যুনেতা









Leave a reply